সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে তা ধর্মীয় কারণে ঘটছে না। ভিন্ন কোনো স্বার্থ উদ্ধারের জন্য এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে। রাজনীতির কারণে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি বন্ধ করা প্রয়োজন। গতকাল রবিবার বিকালে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর ছেলে অভিজিত্ মুখার্জী ‘দৈনিক ইত্তেফাক’কে দেওয়া সাক্ষাত্কারে এ কথা বলেন।
অভিজিত্ মুখার্জী বলেন, এ ধরনের দুর্ঘটনায় ভয় পেলে চলবে না। কিছু পক্ষ রয়েছে যারা অস্থিরতা ছড়াতে থাকবে। এসব বন্ধে সামগ্রিক উন্নয়নের বিকল্প নেই। সেই উন্নয়নের জন্য দুই দেশকে একযোগে কাজ করতে হবে। সমৃদ্ধ বাংলাদেশ মানেই সমৃদ্ধ ভারত। তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে একটি ভালো সরকার মানুষের আস্থা অর্জনে সচেষ্ট হয়। অপরাধীরা যাতে দ্রুত ধরা পড়ে সে বিষয়ে তত্পরতা জোরদার করে। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। বাংলাদেশ সরকারও নিশ্চয়ই সেই চেষ্টা করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে শনিবার দেখা করেছি। এ নিয়ে তাকে বেশ চিন্তিত দেখলাম। নিশ্চয়ই তিনি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।
অভিজিত্ বলেন, ধর্মীয় নামধারী উগ্রবাদিতার নামে সন্ত্রাসী আগ্রাসন বিশ্বজুড়েই চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও হত্যাকাণ্ড ঘটছে। বাংলাদেশে দেখছি একজন, দুজন করে হত্যা করা হচ্ছে, ওখানে তো ৫০ জন, ৬০ জন করে। সেখানেও তো থামানো যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতি ঘটবার আগে তো তা জানবার উপায় নেই। এ নিয়ে দেশের পরিস্থিতি খারাপ— এমন ঢালাও মন্তব্যেরও কোনো ভিত্তি নেই। বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ে ইস্যু করা হয়। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবি তিস্তা চুক্তি ঝুলে রয়েছে। এ চুক্তি বিষয়ে তিনি বলেন, তিস্তা চুক্তি হবে। কেন্দ্রীয় সরকার এবং মমতা ব্যানার্জী এ চুক্তির ব্যাপারে আন্তরিক।
গতকাল আলাপচারিতায় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন তিনি। ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে পরিচিত। তার ছেলে অভিজিত্ মুখার্জী ভারতের লোকসভার সদস্য। দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশে এলেন। ব্যক্তিগত সফরে এলেও বাংলাদেশ সরকার তাকে রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদা দিয়েছে।
তিনি বললেন, বাংলাদেশে এসে মনে হচ্ছে না বিদেশে এসেছি। আমার মায়ের বড়ি তো এই বাংলাদেশেই। মায়ের টান ছিল বাংলাদেশের প্রতি। মৃত্যুর আগে মা বলেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রেখ। আমার বাবার সঙ্গেও বাংলাদেশের মানুষের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমিও মায়ের কথা মান্য করেই চলতে চাই।
বাংলাদেশে এসে অবকাঠামো উন্নয়ন বেশ চোখে পড়ছে। দামি গাড়ি, মানুষের স্বাস্থ্যবান চেহারা দেখছি। এটা ভালো লাগল। মানুষের আপ্যায়ন উপভোগ করছি। জানি যে, এটা আমার বাবার সম্মানে।
বাংলাদেশে এসে ভারতীয় ভিসার হয়রানির কথা শুনছি। যে কোনো উপায়ে এই প্রক্রিয়াকে সহজ করা কথা বলেন অভিজিত্ মুখার্জী। বলেন, ভিসা প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। মানুষকে এত সন্দেহের কী রয়েছে। সহজভাবে সবাইকে ভিসা দেওয়া উচিত। মানুষে-মানুষে যাতায়াত যত বাড়বে ততই দু দেশের মানুষের মাঝ থেকে সন্দেহ, অবিশ্বাস দূর হয়ে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হবে। তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সাব-কন্টিনেন্টাল ইউনিয়ন করা প্রয়োজন। অভিজিত্ মুখার্জী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের সংস্কৃতি, ভাষা, ও আচার-আচরণ এক। দু দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের আরো প্রসার হলে এর মাধ্যমে দু দেশের মানুষের সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটবে। তিনি বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের সীমান্ত এলাকায় আরো বেশিসংখ্যক ‘বর্ডার হাট’ চালু এবং একই সাথে সীমান্তবর্তী এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের উপর গুরুত্বারোপ করেন।
অভিজিত্ মুখার্জী বলেন, দুই দেশের ভাষা-সংস্কৃতি এবং আচার-আচরণ এক। তাছাড়া বিশ্বেও এককভাবে সর্বাধিক সংখ্যক লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে। এটা গৌরবের এবং অহংকারের। বাংলাদেশের প্রচেষ্টার ফলে বাংলা আন্তর্জাতিক ভাষার মর্যাদা লাভ করেছে। এজন্য বাংলাদেশের সাথে আমরাও গৌরাবান্বিত।
অভিজিত্ মুখার্জীকে সংবর্ধনা দিল বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সমিতি
অভিজিত্ মুখার্জীকে সংবর্ধনা দিল বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সমিতি। গতকাল বিকালে ইস্কাটনে সমিতির কার্যালয়ে তার সম্মানে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ও ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়। প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খান এমপি। সমিতির সভাপতি প্রফেসর ইমেরিটাস ড. একে আজাদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম, মোজাফফর হোসেন পল্টু প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন মৈত্রী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুবীর কুশারী। আরো উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য মাহজাবীন খালেদ, সুভাষ সিংহ রায়, সুজিত রায় নন্দী, রেহানা পারভীন, সঙ্গীতা চৌধুরী প্রমুখ।
অভিজিত্ মুখার্জী বলেন, যে আতিথেয়তা আমি পেলাম এটা আমার বাবার সম্মানে, তা বেশ বুঝতে পারছি। সে জন্য আমি কৃতজ্ঞ। রাজনীতিতে নতুন এসেছি। আমার প্রত্যাশা, বাবার মতই আমার সঙ্গেও আপনাদের সম্পর্ক ও হূদ্যতা একইরকম থাকবে।
ফারুক খান বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আর বাংলাদেশ-প্রণব মুখার্জী সম্পর্ক সমানভাবে সচল। মোজাফফর হোসেন পল্টু বলেন, ভারত বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু। ভবিষ্যতে এই প্রতিবেশীমূলক বন্ধুত্ব আরো দৃঢ় হবে।
