সারাদেশে ‘টার্গেট কিলিং’য়ে জড়িত জঙ্গি সংগঠনের ‘স্লিপার সেলে’র ৩০ জন কিলারকে নজরদারির মধ্যে রেখেছে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম ইউনিট। এদের মধ্যে ১০ জন কিলারকে খুব কাছাকাছি থেকে নজরদারি করছে গোয়েন্দা পুলিশ। এসব সেলের সদস্যদের অধিকাংশের অবস্থান ঢাকার আশেপাশে। এছাড়া কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাজশাহী, পাবনা, নাটোর, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও বরিশাল এলাকায়ও এরা কার্যক্রম চালিয়েছে বলে গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে।
ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, জঙ্গি দমনে ‘স্লিপার সেল’ সদস্যদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন সদস্যকে আটকও করা হয়েছে। এরাই ‘টার্গেট কিলিং’ করছে বলে তিনি দাবি করেন।
সম্প্রতি জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া সুমন হোসেন পাটোয়ারি ওরফে শিহাব শুদ্ধস্বরের প্রকাশককে হত্যার চেষ্টা করেছিল। এছাড়া আরও দুইটি হামলার পরিকল্পনা ছিল তাদের। তবে শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদ রশিদ টুটুলকে হত্যা করতে ব্যর্থ হওয়ায় বাকি দুটি পরিকল্পনা তারা বাস্তবায়ন করতে পারেনি বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ২০১৫ সালের শুরুর দিকে সিহাব জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে যোগ দেয়। তাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘প্রটেকটেড আইডি’ খুলে দেওয়া হয় যোগাযোগের জন্য। আস্তে আস্তে তাকে হামলার জন্য প্রস্তুত করা হয়। সিহাব রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে তার বস শরীফের (মুকুল রানা) নাম বলেছে। সে আরো জানায়, শুদ্ধস্বর প্রতিষ্ঠানে হামলার সময় তাহসান, বাবর ও ইয়াহিয়াসহ পাঁচজন অংশ নেয়। এরা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ‘স্লিপার সেলে’র সদস্য। তাদের গ্রেফতারে চেষ্টা করছে পুলিশ। ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা বলেন, সুমন হোসেন পাটোয়ারি ওরফে শিহাবকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ‘স্লিপার সেলে’র বেশ কয়েকজন সদস্যের নাম উল্লেখ করেছে। এসব নামের মধ্যে তাহসান, বাবর, ইয়াহিয়া, হাদী-১, মাহবুব, মিরাজ, আকাশ, আলম, রাফি, ইউসুফ, মাহমুদ, সাব্বির, রানা, রসুল ও শোয়েব উল্লেখযোগ্য। তাদের ‘স্লিপার সেলে’র একজন সমন্বয়ক রয়েছেন যার নাম ইসতিয়াক। তিনি মিলিটারি ইন্সটিটিউট অব সাইন্স এন্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) শিক্ষক ছিলেন। হিযবুত তাহরীরের অন্যতম নেতা মেজর (চাকরিচ্যূত) জিয়ার সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। এর আগে মেজর জিয়ার সঙ্গে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) আধ্যাত্মিক নেতা জসীম উদ্দিন রাহমানীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল। এ হিসাবে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে হিযবুত তাহরীরের একটি যোগসূত্র রয়েছে বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, উইকিপিডিয়াতে ‘স্লিপার সেল’ সম্পর্কে বলা আছে, এমন একদল মানুষ; যারা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকে, কোন সন্ত্রাসী বা সহিংস কর্মকান্ড না করা পর্যন্ত যাদের জানা যায় না-তাদের ‘স্লিপার সেল’ বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও যুক্তরাজ্যে সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীতে ‘স্লিপার সেল’ গঠন করে অপারেশন চালানোর ঘটনা রয়েছে। এশিয়া মহাদেশে সর্বপ্রথম ভিয়েতনামে কোন সরকারের বিরুদ্ধে ‘স্লিপার সেল’ অপারেশন চালানো হয়। মধ্যপ্রাচ্যের আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়দায়ও এই কায়দায় হামলা চালায়। এরই ধারবাহিকতায় বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে ‘স্লিপার সেলে’র ধারণা চলে আসে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ‘স্লিপার সেলে’ কমপক্ষে ৫ থেকে সর্বোচ্চ সাত জন সদস্য থাকে। এর মধ্যে একজন দলনেতা থাকে। তাদের প্রত্যেককে একে অপরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় মূল পরিকল্পনাকারী। দলনেতাই প্রত্যেক সদস্যকে মিশনের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানিয়ে দেয়-কাকে, কীভাবে খুন করতে হবে। পরিকল্পনাকারী নিজেই সেলের সদস্যদের অস্ত্র সরবরাহ করে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, তারা বেশিরভাগ সময় ধারালো চাপাতিসহ ছোরা জাতীয় অস্ত্র ব্যবহার করে। কুপিয়ে ও গলাকেটে হত্যার পাশাপাশি বিশেষ ধরনের ইনজেকশনও ব্যবহার করে তারা।
র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে.কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, শিবির, জেএমবি ও হিযবুত তাহরীর এই তিনটি জঙ্গি সংগঠনের মধ্যে ‘স্লিপার সেল’ থাকার অস্তিত্ব পেয়েছে র্যাব। তবে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের যে ‘স্লিপার সেলে’র কথা বলা হচ্ছে, সেটিতে প্রকৃতপক্ষে শিবির ও হিযবুত তাহরীরের নেতা-কর্মীরাই প্রবেশ করেছে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, হিযবুত তাহরীরের জামিনে মুক্তি পাওয়া প্রায় চারশ’ নেতাকর্মী আত্মগোপন করে আছে। এরা তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোতে হাজিরাও দিচ্ছে না। সম্প্রতি মাদারীপুরে কলেজ শিক্ষককে হত্যা চেষ্টার সময় হাতেনাতে গ্রেফতার হওয়া ফাহিম হিযবুত তাহরীরের ‘স্লিপার সেলে’র সদস্য ছিল। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে ফাহিম রাজধানীর উত্তরায় র্যাবের হাতে আটক হয়েছিলো। ওই মামলায় ফাহিম জামিনপ্রাপ্ত আসামি ছিল বলে সূত্রটি দাবি করেছে।
