নির্বাচনী প্রশিক্ষণে ব্যয় বাড়লেও মান কমছে। নামেমাত্র চলছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (ইটিআই) প্রশিক্ষণ। ইসির সচিবালয়ের ঊধ্বর্তন ব্যক্তিদের আস্থায় রেখে এসব করছেন ইটিআই-সংশ্লিষ্টরা। ইসির অধীনস্থ ইটিআই-এর কার্যক্রমে নেই কোন জবাবদিহিতা। এজন্য সম্প্রতি স্বয়ং প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন লিখিতভাবে ইটিআইএর কাজে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে ইউও (আন অফিসিয়াল) নোট দেন। ইসি সচিব বরাবর লেখা ওই নোটে সিইসি ইটিআইএর কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
সচিবকে লেখা ইউও নোটে সিইসি বলেন, ‘ইটিআইয়ের প্রশিক্ষণের বর্তমান মান সন্তোষজনক নয়। প্রশিক্ষণের পরিমাণগত ও গুণগত উভয় ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে যা দ্রুত সময়ের মধ্যে উন্নত করে আন্তর্জাতিক মানে উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের কি কি বিষয়ে বর্তমানে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে এবং আরো কি কি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন তার বিশদ বর্ণনা করে একটি কার্যপত্র প্রস্তুত করা হোক। পাঠ্যক্রম এবং প্রশিক্ষকদের সক্ষমতা উন্নয়ন, অন্যান্য প্রশিক্ষণ সংস্থার সাথে যোগাযোগ এবং প্রদত্ত প্রশিক্ষণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এর সম্ভাবনার বিষয়েও কার্যপত্রে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন।’ সিইসি আরো বলেন, ‘কার্যপত্রটি দেশের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের কাছে প্রেরণ করে এ বিষয়ে তাদের সুপারিশ চাওয়া যায় এবং তারপর একটি ব্রেইন স্টর্মিং সভার আয়োজন করা যায়। এ বিষয়টি কমিশনারদের জানানো হয়েছে। তারাও সভায় উপস্থিত থাকবেন। সভাটি ঈদের ছুটির পর আয়োজন করা যেতে পারে।’ এর আগে সচিব, ডিজি, ইটিআই ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করে কার্যপত্রটি প্রস্তুত করতে বলা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (ইটিআই) মহাপরিচালক খোন্দকার মিজানুর রহমান ইত্তেফাককে জানান, কমিশনের অনুমতি নিয়ে ইটিআই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। আমরা যেহেতু আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন ভবনে যাব, সেজন্য সিইসি ইটিআইয়ের প্রশিক্ষণের মানোন্নয়নের তাগিদ দিয়েছেন। এবারের ইউপিতে মাঠপর্যায়ে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ বাবদ ৪৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে-যাতে ৭ লাখেরও বেশি মাঠ কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এখানে অনিয়মের কোন সুযোগ নেই বলে দাবি করেন তিনি। তার মতে, ইসি সচিবালয়ের যারা প্রশিক্ষণের সুযোগ পান না তারাই মূলত ইটিআই কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা করে যাচ্ছেন।
ইসি কর্মকর্তারা ইত্তেফাককে জানান, জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকারের প্রতিটি নির্বাচনের আগে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিটি কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এছাড়া ইসির নিজস্ব জনবলের সক্ষমতা বৃদ্ধির নামে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হচ্ছে। প্রতি বছর বিভিন্ন নির্বাচন আর প্রকল্পের মাধ্যমে নানা ধরনের প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হলেও কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি হচ্ছে না।
ইসির প্রশিক্ষণের ব্যয় প্রতি বছর বাড়ছে, কিন্তু প্রশিক্ষণের মান দিন দিন কমে যাচ্ছে। এবারের ইউপি নির্বাচনে প্রশিক্ষণ বাবদ ব্যয় হয়েছে অন্তত ৫০ কোটি টাকা। সিইসি বলছেন, ব্যয় বাড়লেও প্রশিক্ষণের পরিমাণগত ও গুণগত উভয় ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে।
মান না বাড়ার নেপথ্যে
দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাব এবং প্রশিক্ষণে কোন মনিটরিং মিস্টেম না থাকার কারণে ইসির প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে। প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীদের কোন ডাটা বেইজও করেনি ইটিআই। আবার নামে মাত্র প্রশিক্ষণের নামে টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে।
এবারের ইউপি নির্বাচনে ইসি সচিবালয়ের সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিবদের প্রশিক্ষণে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। নির্বাচনী কার্যক্রমের চেয়ে প্রশিক্ষণে অতি উত্সাহী ছিলেন সংশ্লিষ্টরা। কারণে হিসাবে জানা গেছে, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পর্যালোচনা করার জন্য ‘সুপারভাইজার ট্রেনি’ হিসাবে ইসি সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে ইটিআই। প্রতিটি আমন্ত্রণের জন্য ৪ হাজার টাকা করে সম্মানী দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্টদের।
ট্রেনিংয়ে ট্রেইনার হিসাবে যারা দক্ষ তাদেরকে না ডেকে অন্যদের আমন্ত্রণ জানানোর শত শত নজীর রয়েছে ইটিআইয়ে। ইসির অফিস সহকারী ট্রেনিং কার্যক্রমেও ইসি সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতনদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। যেখানে সচিবালয়ের উপ-সচিব থেকে সিনিয়র ও সহকারী সচিবদের ট্রেইনার হিসাবে থাকার কথা ছিল, সেখানে অন্যদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। দেখা গেছে, ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছেন ইসি সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তারা।
ইটিআই সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সব ধরনের বিষয়ের প্রশিক্ষণ হাতে গোনা কয়েকজন প্রশিক্ষকের মাধ্যমে নেয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষকদের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আবার একই ব্যক্তিকে বার বার প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। বেশিরভাগ প্রশিক্ষণার্থীই প্রশিক্ষণ না করে খাতায় স্বাক্ষর করে নির্দিষ্ট টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছেন।
সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন ভবনে ইটিআই
আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন ভবনে ইটিআইয়ের কার্যক্রম শুরু করতে চান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। সচিবকে লেখা ইটিআইয়ের নিজস্ব ভবন সম্পর্কে সিইসি বলেন, ইটিআইয়ের জন্য ভবন নির্মাণের কাজ সমাপ্ত পর্যায়ে রয়েছে। দ্রুত ভবনের কাজ সমাপ্ত করে ওই ভবনে ইটিআই’কে স্থানান্তর করা আশু প্রয়োজন।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ভবনের পাশে ইসির নিজস্ব ভবন নির্মাণ হচ্ছে। ইলেকশন রিসোর্স সেন্টার (ইআরসি) নামে দুটি অংশে নির্মাণাধীন ভবনের একটি অংশের ভবনে থাকবে নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশ (ইসিবি) এবং অন্য অংশের ভবনে থাকবে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ইটিআই)। নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ইটিআই) জানুয়ারি ১৯৯৫ হতে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের আওতাধীন একটি প্রকল্প হিসেবে কাজ শুরু করে। যার মূল লক্ষ্য ইসির জনবলকে নির্বাচনী আইন-কানুন সম্পর্কে দক্ষ করে গড়ে তোলা।
