যাত্রাবাড়ীর ধলপুর কমিউনিটি সেন্টারের পেছনে বটতলা বাজার। এই বাজারে ঢোকার রাস্তার একপাশ জুড়ে আবর্জনা টানার গাড়ির সারি। সেই সারির পাশ দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের জার্সি পরে দশ কি এগার বছরের একটি শিশু আবর্জনা ভর্তি গাড়ি টেনে নিয়ে এলো। সে এতই ছোট যে সিটে বসে গাড়ির প্যাডেল ছুঁতে পারে না। কয়েকগজ হেঁটে গেলে চোখে পড়বে হোসেন ভান্ডারির দোকান। এই দোকানে আবর্জনা কুঁড়িয়ে হাড়, কনডেন্সড মিল্কের পরিত্যক্ত কৌটা বিক্রি করে মোঃ শাহিন, জয়, খোকন মিয়া, মারুফ। যাদের বয়স ১২ হতে ১৮ বছরের মধ্যে। এই পুরো এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে বর্জ্য থেকে কুঁড়ানো ভাঙ্গারির বেচাকেনার বাজার। এই বেচাকেনার একটি বড় অংশ (ভাঙ্গারি জড়ো করার কাজ) আট/দশ বছর থেকে ১৭ বছরের শিশুদের নিয়ন্ত্রণে। তাদের রয়েছে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি। তারা কেউ স্কুলেও যায় না। অথচ এটা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের অন্তর্ভুক্ত। দেশে শিশুশ্রম নিরসনে সরকারি, বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ এবং জাতিসংঘ সনদ স্বাক্ষরের দুইযুগ পেরিয়ে গেলেও শিশুশ্রম বন্ধ হয়নি।
ধলপুরে পঞ্চাশের অধিক ভাঙ্গারি দোকানে প্রায় শতাধিক শিশু কাজ করে। হাত-পা কেটে গেলে বা জ্বরে ভুগলেও কাজ থেকে বিরতি নেই এসব শিশুদের। ক্রমেই এরা আসক্ত হয় নেশায়। লিপ্ত হয় মোবাইল ছিনতাইসহ নানা প্রকার অসামাজিক কর্মকাণ্ডে। মোঃ শাহিন হাত-পায়ের বেশ বড় দুটি খত দেখিয়ে বলে, হাড় কুঁড়ানোর সময় কেটে গেলে এই খত হয়। কাজ বন্ধ করতে পারে না বলে এই খতেই বারবার আঘাত পায়, ফলে ঘা আর শুকায় না। মানিকনগরের ১৫ বছরের মারুফ জানায়, বাবা নেই, মা মানুষের বাড়িতে কাজ করে। সেই টাকায় সংসার চলে না বলে তাকে কাজ করতে হয়। কেন অন্য কাজ না করে এই কাজ কর প্রশ্ন করলেও তারা জানায়, এলাকার সবাই একাজ করে বলে তারাও করে।
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খান বলেন, এই সকল শিশুরা প্রতিনিয়তই ব্যথ্যা ও জ্বর জ্বর ভাবের জন্য এান্টিবায়োটিক খেয়ে থাকে। এতে তাদের কিডনি কিংবা হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে অকাল মৃত্যুর শিকার হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপে দেখা যায়, দেশে ১৭ লাখ শিশু শ্রমিক আছে, যাদের মধ্যে ১২ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে জড়িত। আইএলও কনভেনশন নং-১৮২ অণুস্বাক্ষরের অংশ হিসাবে শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ৩৮টি কাজের তালিকা করে বাংলাদেশ। এর মধ্যে আছে ভাঙ্গারি কুঁড়নোর কাজ। শিশু আইন ২০১৩, জাতীয় শিশু নীতি ২০১১, জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি ২০১০, গৃহশ্রমিক সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি ২০১৫, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১৪- গত ছয় বছরে এ ৫টি নীতি হয়েছে। এছাড়া রয়েছে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১২ ও ১৬। তারপরও সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কাজ করছে এমন কত শিশু তার হিসাব নেই বলেন, বিশ্বব্যাপী শিশুদের নিয়ে কাজ করা ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের এডভোকেসি ডিরেক্টর চন্দন গোমেজ। তিনি জানান, এইএলও’র সহায়তায় শ্রম মন্ত্রণালয়ে শিশুশ্রম মনিটরিং এর জন্য একটি মনিটরিং ইউনিট ছিল। ফান্ড বন্ধ হওয়ায় সেই কাজ বন্ধ আছে। কিন্তু এমন একটি মনিটরিং ইউনিট খুবই কার্যকর। তাছাড়া ২০১৬ সালে কর্মপরিকল্পনা মেয়াদ শেষ হবে, তা বাড়িয়ে নেয়ার জন্য বাজেটে বরাদ্দ নেই। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও বিভাগীয় শিশুশ্রম কল্যাণ পরিষদ সভাপতি হলালুদ্দীন আহমদ ইত্তেফাককে বলেন, শিশুশ্রমের ব্যাপারে ঈদের পরপরই সভা ডাকা হবে। তিনি বলেন, ঝঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধে ঢাকার বাইরে মোবাইল কোর্ট বেশ সক্রিয়। ঢাকায় মোবাইল কোর্ট করার কথাও তিনি বলেন।
এ বিষয়ে শিশু অধিকার ফোরামের নির্বাহী পরিচালক ইমরানুল হক চৌধুরী বলেন, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইনে বলা আছে, ছয় থেকে দশ বছরের শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত না করলে কোন এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসকারী অভিভাবকের ২০০ টাকা জরিমানা করা হবে। এই জরিমানা কে দেবে বা কে নেবে কারো জানা নেই। এর মূলে শিশু অধিকার রক্ষার সাথে জড়িত আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতাকে তিনি দায়ী করেন।
শ্রম আইন-২০১৩-১৪ সালের নীতিতে শিশুকে কাজে নিয়োগ দেয়া এবং ১৮ বছরের নিচে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু তা বস্তবায়নে সরকারে উদাসীনতা আছে কিনা বা কেন এর গতি মন্থর - এ নিয়ে প্রশ্ন করলে জাতীয় সংসদে শিশু অধিকার বিষয়ক ককাসের সভাপতি মীর শওকত আলী বাদশা এমপি বলেন, অনীহা নেই, তবে আইন বাস্তবায়ন ও প্রচারের ক্ষেত্রে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
