দীর্ঘ ১২ ঘন্টার রুদ্ধশ্বাস সময়ের পর এক কমান্ডো অভিযানে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি নামের রেস্টুরেন্টে জিম্মি সঙ্কটের অবসান হয়েছে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বিমান, নৌ, পুলিশ, র্যাব, বিজিবির সমন্বয়ে গঠিত এই যৌথ বাহিনী গতকাল শনিবার সকালে অভিযান চালায়। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, ১৩ মিনিটের মধ্যেই কমান্ডোরা ৬ জঙ্গিকে হত্যা করতে সমক্ষ হয়। আর একজনকে আটক করে। অভিযানে একজন জাপানি, দু’জন শ্রীলংকান নাগরিকসহ মোট ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। অভিযানের পর আরো ২০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। শুক্রবার রাতেই জিম্মিকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে এই ২০ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে বলে দাবি করেছে আইএসপিআর। এর আগে শুক্রবার রাত ১০টার দিকে জিম্মি ঘটনার শুরুতেই জঙ্গিদের ছোড়া গ্রেনেডে দুইজন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। সব মিলিয়ে এই ঘটনায় ২৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। তবে আরো অনেককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা।
আইএসপিআরের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়নি। তবে অসমর্থিত একাধিক সূত্রের ভাষ্যমতে, নিহতদের মধ্যে ৯ জন ইতালির নাগরিক, তাদের অধিকাংশই গার্মেন্টসের বায়ার; পাঁচজন জাপানি, একজন ভারতীয়, একজন আর্জেন্টাইন ও চারজন বাংলাদেশি। বাংলাদেশি চারজন হলেন—ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের নাতি ফারাজ হোসেন, ঢাকার একটি আর্ট গ্যালারির সাবেক প্রধান ইশরাত আখন্দ, ল্যাভেন্ডার গ্রুপের মালিকের নাতনী অবিন্তা কবীর ও রেস্টুরেন্টের বাবুর্চি সমীর রায়।
সেনাবাহিনীর মিলিটারি অপারেশন্স-এর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাঈম আশফাক চৌধুরী গতকাল শনিবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, শুক্রবার রাতে বন্দুকধারীরা হামলা চালালে রাতভর রেস্টুরেন্টটি পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ঘিরে রাখার পর সকালে সামরিক বাহিনী যুক্ত হয়ে শুরু করে কমান্ডো অভিযান। ‘অপারেশন থান্ডার বোল্ট’ নামের সমন্বিত এই অভিযান সকালে ৭টা ৪০ মিনিটে শুরু হয়ে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে শেষ হয়। তবে প্রথম ১৩ মিনিটেই ছয় জঙ্গি নিহত হয় ও একজনকে আটক করা হয়।
এর আগে চরম উত্কণ্ঠার মধ্যে রাত পার করেন দেশবাসী। কখন অভিযান চালানো হবে, ভেতরে আটকে পড়াদের অবস্থাটাই বা কি— কিছুই জানা যাচ্ছিল না। অভিযান শেষ হলেও তাত্ক্ষণিকভাবে গণমাধ্যমকে কিছু বলা হয়নি। পরে বেলা ২টার দিকে প্রেস ব্রিফিংয়ে ২০ জনের মৃতদেহ উদ্ধারের কথা জানান ব্রিগেডিয়ার নাঈম।
তিনি বলেন, ‘প্যারা কমান্ডোরা ৭টা ৪০ মিনিটে অপারেশন শুরু করে, ১২ থেকে ১৩ মিনিটের মধ্যে সকল অপরাধীকে নির্মূল করে সকাল সাড়ে ৮টায় অভিযানের সফল সমাপ্তি ঘটে।’ এরপর তল্লাশি চালিয়ে ২০টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এদের সবাইকে রাতেই হত্যা করা হয়। ধারাল অস্ত্রের মাধ্যমে নৃশংসভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।’ প্রেস ব্রিফিংয়ে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত না করলেও তারা সবাই বিদেশি বলে জানান এই সেনা কর্মকর্তা। অবশ্য পরে আইএসপিআর জানায় নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকও আছে।
এই জঙ্গি হামলার দায়িত্ব স্বীকারের বার্তায় আইএস ২৪ জনকে হত্যার কথা দাবি করেছে বলে সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক এই জঙ্গিগোষ্ঠীর বাংলাদেশে তত্পরতার খবর সরকার বরাবরই নাকচ করে আসছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘটনাটিকে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
হলি আর্টিজান বেকারি নামের যে রেস্টুরেন্টে শুক্রবার রাতে হামলা হয়েছিল, তা বিদেশিদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। গুলশানে লেকের পাড়ে এর খোলা লনে চাদর বিছিয়ে রোদ পোহাতে দেখা যেত অনেককে। সবুজ লনে শিশুরাও খেলার পর্যাপ্ত জায়গা পেয়ে ছোটাছুটি করত। শুক্রবার রাত ৯টার দিকে বন্দুকধারীরা গুলি ছুড়তে ছুড়তে এই রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়ে বলে জানান ব্রিগেডিয়ার নাঈম। তাদের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র থাকার কথাও জানান তিনি। তাদের কাছে ছিল চারটি পিস্তল, একটি ফোল্ডেড বাট একে-২২ রাইফেল, চারটি অবিস্ফোরিত আইইডি (বিষ্ফোরক) ও ধারালো অনেক অস্ত্র ছিল।
বন্দুকধারীরা হানা দেওয়ার পরপরই পুলিশের একটি দল ওই রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলেন। তখন জঙ্গিদের ছোড়া গুলি ও গ্রেনেডে নিহত হন ডিবির সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার ওসি সালাউদ্দিন। এরপর র্যাব গিয়ে এলাকাটি ঘিরে ফেলে। সকালে সেনা, নৌ, বিমান বাহিনীর সদস্যরা যাওয়ার পর শুরু হয় কমান্ডো অভিযান। ব্রিগেডিয়ার নাঈম বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকার প্রধান কর্তৃক সেনাবাহিনীকে অপারেশন পরিচালনার আদেশ দেয়া হলে সেই মোতাবেক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ‘অপারেশন থান্ডার বোল্ট’-এর পরিকল্পনা করে। সেনাসদরে এই সাংবাদিক সম্মেলনে তিন সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি র্যাব, বিজিবি, পুলিশের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
গুলশান ২-এর ৭৯ নম্বর সড়কের ওই রেস্টুরেন্টের কাছে একটি ভবন থেকে অভিযান দেখেছেন এমন এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সকাল সোয়া ৮টার পর দু’টি জলপাই রঙা সেনা সাঁজোয়া যান আর্টিজান বেকারির সীমানা দেয়াল ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। সাদা আরেকটি সাঁজোয়া যান ছিল রাস্তায়। পরে অভিযানে যুক্ত হয় আরও তিনটি জলপাই রঙের সাঁজোয়া যান। সাঁজোয়া যান রেস্টুরেন্টের কম্পাউন্ডে ঢোকার সময় এর বাইরের দিকে থাকা পিজা কর্নার এবং লাগোয়া লেক ভিউ ক্লিনিকের গাড়ি পার্কিংয়ে রাখা দুটি গাড়ি গুঁড়িয়ে যায়। তখন বিকট শব্দে গাড়ির অ্যালার্ট সিস্টেম বাজছিল। আশপাশের ভবনের ছাদে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল আর টেলিস্কোপ লাগানো স্নাইপার রাইফেল নিয়ে অবস্থান নেন কমান্ডোরা। আশপাশের বাসিন্দাদের নিরাপদে ঘরের মধ্যে রাখা হয়। সোয়া ৮টা থেকে একে একে কয়েকজনকে রেস্টুরেন্টটি থেকে উদ্ধার পেয়ে বেরিয়ে আসতে দেখা যায় নারী, পুরুষ ও শিশুদের। তাদের সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। কমান্ডো অভিযানের মধ্যেই ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (চ্যান্সেরি) জসিম উদ্দিন বলেন, ‘একজন একজন (জিম্মিদের) করে উদ্ধার করা হচ্ছে।’ সকাল ৯টার দিকে র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদকে সাদা পোশাকে বাইরে দেখা যায়।
এর আগে ঘটনার পর থেকে গুলশানের চার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে পুলিশ ও র্যাব ঘেরাও করে রাখে। গুলশান-বনানী ও বারিধারা এলাকায় প্রবেশে সকল রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়। যেসব গাড়ি ভেতরে আটকে ছিল তাদের প্রত্যেকটি গাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে বাইরে বের হওয়ার সুযোগ দেয় র্যাব পুলিশ। তবে সাধারণ মানুষকে ওই ঢুকতে দেয়া হয়নি। সকল দোকান, মার্কেট, শপিংমল, রেস্টুরেন্ট সবকিছুই বন্ধ করে দেয়া হয়। অনেকেই আতঙ্কে দোকান পাট খোলেননি গতকাল বিকেল পর্যন্ত। আগের রাত থেকেই ৭৯ নম্বর সড়কের কোন বাসা থেকে বাসিন্দাদের বের হতে দেয়া হয়নি। ঘটনাস্থলে পুলিশ মাইকিং করে সকলকে বাসায় নিরাপদে থাকার পরামর্শ দেয়। গতকাল গুলশান এলাকার কোন স্কুল, কলেজও খোলা ছিল না। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সকাল সাড়ে ৭টার দিকে অভিযানের শুরুতে মুহুমুহু গুলি ও গ্রেনেডের শব্দে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়। সকাল ৯টা ২ মিনিটে বিকট একটি শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠে। তবে এ সময় রেস্টুরেন্টে থাকা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তাদের জায়গাতেই দেখা যায়। সাড়ে ৯টার দিকে র্যাবের গণমাধ্যম শাখার সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘অভিযান শেষ।’ সকাল ৯টা ৩৭ মিনিটে আরেকটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। অবস্থাদৃষ্টে তখন স্পষ্ট, বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। কারণ শব্দ হওয়ার আগেই সেনা সদস্যদের কানে আঙুল দিতে দেখা যায়। অভিযান শেষের পর রেস্টুরেন্টের পাশের বহুতল ভবনটির গ্যারেজে হাত পিছমোড়া করে বেঁধে কয়েকজন যুবককে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে শুইয়ে রাখতে দেখা যায়। তবে তারা কারা সে বিষয়ে কিছু জানা যায়নি। বেকারির শেফের পোশাক পরা একজনের সঙ্গে কয়েকজনকে একটি মাইক্রোবাসেও তুলতে দেখা যায়। পরে জানা গেছে, এদের অধিকাংশই রেস্টুরেন্টের কর্মচারী। তখনও বাইরে উত্কণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন জিম্মি থাকা ব্যক্তিদের স্বজনরা। ভেতর থেকে কিছুই জানা যাচ্ছিল না।
সামপ্রতিক সময়ে একের পর এক জঙ্গি কায়দায় হামলায় সামপ্রদায়িকতাবিরোধী লেখক, ব্লগার, প্রকাশক; ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ভিন্ন মতাবলম্বীরা নিহত হলেও কূটনৈতিক এলাকার কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে এ ধরনের হামলা ও জিম্মি সঙ্কট বাংলাদেশে এই প্রথম। হলি আর্টিজান বেকারি নামের ওই রেস্টুরেন্টের সড়কেই কাতার ও রাশিয়ার দূতাবাস; পরের রাস্তায় নর্ডিক ক্লাব। এর কাছেই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাসভবন।
