মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দুইভাগে বিভক্ত। একটি প্রাইমারি এবং অপরটি চূড়ান্ত। এর সবগুলোই গুরুত্বপূর্ণ দুই দলের প্রার্থীদের কাছে। কিন্তু প্রাইমারি নির্বাচনে প্রাথমিক মনোনয়নের পর দলীয় সম্মেলনের আগে আরেকটি বিষয় প্রাধান্য পায়। তাহলো রানিংমেট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান দলের কেউই এখনো তাদের রানিংমেটের কথা ঘোষণা করেননি। ডেমোক্র্যাট দলে হিলারি ক্লিনটন কাকে নির্বাচন করবেন তা তার উপরই নির্ভর করছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করার সময় বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি নজর দেওয়া হয়। এজন্য বলতে গেলে গভীর অনুসন্ধান চালানো হয়। ভাইস প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক চরিত্র, তার পেশাগত কোনো দুর্বলতা আছে কিনা এবং প্রেসিডেন্ট কোন্ ইস্যুটি মানুষের সামনে আনতে চান ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে তা বিবেচনায় নিতে হয়।
রিপাবলিকান দল: ট্রাম্প যাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করবেন তা তিনিই জানেন। তবে তাকে নিয়ে এত বিতর্ক যে, তার রানিংমেট কেউ হতে রাজি হবেন কি না তা নিয়েই এখন সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে একটা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে। ইতোমধ্যে আইওয়া সিনেটর জোনি আর্নেস্ট এবং টেনেসিস সিনেটর বব কর্কার জানিয়ে দিয়েছেন তারা ট্রাম্পের রানিংমেট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট হবেন না। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এমন একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট খুঁজছেন যার পররাষ্ট্র নীতিতে ব্যাপক জ্ঞান রয়েছে এবং তাকে এক্ষেত্রে বিশ্বাস করা যায়, কংগ্রেসের ভেতর-বাইরের খবর রাখেন এবং যিনি তার এজেন্ডাকে আইনসভায় পাস করাতে সহায়তা করতে পারবেন। একজন পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ ট্রাম্পের রানিংমেট না হওয়ারও আগ্রহ প্রকাশ করতে পারেন। কারণ ট্রাম্পের নিজের রাজনীতিতে পূর্ব কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তিনি একজন ধনকুবের হিসেবেই মার্কিন সমাজে পরিচিত। তারপরও কিছু মানুষ তো ট্রাম্পের রানিংমেট হওয়ার তালিকায় আছেন। তারা হলেন—
মাইক পেন্স। ইন্ডিয়ানার বাসিন্দা। বয়স ৫৭ বছর। তিনি ইন্ডিয়ানার গভর্নর। তিনি প্রতিনিধি পরিষদে হুজিয়ার স্টেটের হয়ে ১২ বছর ধরে প্রতিনিধিত্ব করছেন। গত দুই বছর তিনি হাউস রিপাবলিকান কনফারেন্সের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তাকে পছন্দ করার কারণ হতে পারে— তিনি কংগ্রেসের ভেতর-বাহিরের খবর রাখেন যা ট্রাম্প চান। বিশ্বস্ত রক্ষণশীল হিসেবে পেন্সের সুনাম আছে। ফলে ট্রাম্প তাকে দিয়ে রক্ষণশীল নীতি বাস্তবায়ন করতে পারবেন। আবার তাকে অপছন্দ করারও কারণ আছে। তিনি ইন্ডিয়ানায় গভর্নর পদে ফের নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি যদি ট্রাম্পের সঙ্গে নির্বাচন করতে চান তাহলে ইন্ডিয়ানার আইন অনুযায়ী গভর্নর পদ তাকে প্রত্যাহার করতে হবে। আর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রচারণা চালানো তার দ্বারা অনেক বড় কঠিন কাজ হবে। প্রাইমারি নির্বাচনে তিনি ট্রাম্পের বদলে দলের অপর প্রার্থী টেড ক্রুজকে সমর্থন দিয়েছিলেন।
নিউয়েট গিনগ্রিজ। জর্জিয়ার এই বাসিন্দার বয়স ৭৩ বছর। তিনি মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক স্পিকার। ২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন। দীর্ঘদিন রক্ষণশীল দলটিতে আছেন। ১৯৯৪ সালে তিনি মার্কিন রাজনীতিতে আলোচনায় আসেন। ওই বছর ৪৮ বছর বয়সে তিনি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে প্রতিনিধি পরিষদে নিয়ন্ত্রণ আনেন। নৈতিক স্খলনের কারণে তিনি ১৯৯৮ সালে শীর্ষ পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। তার কারণে দল নির্বাচনে হারে। তাকে পছন্দ করার কারণ— তিনি ট্রাম্পের একজন বড় সমর্থক হয়ে উঠছেন। স্পিকারের দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা আছে তার। তিনি একজন দক্ষ বিতার্কিক। আর হিলারির সঙ্গে লড়তে কি প্রয়োজন সেই বিষয়ে তার ভালো ধারণা আছে। তবে তিনি নাও আসতে পারেন পছন্দের তালিকায়। কারণ ওয়াশিংটনের দুর্নীতিপরায়ণ ধনীদের বিরুদ্ধে আপনি যখন প্রচারণা চালাবেন তখন নিজেকে সত্ থাকতে হবে। কিন্তু তিনি সেটা পারেননি। ফলে তাকে নির্বাচন করাটা শুভবুদ্ধির হবে না। আর ৭০ বছরের ট্রাম্পের সঙ্গে ৭৩ বছরের গিনগ্রিজের সঙ্গ দেয়াটা মানানসই হবে না।
ক্রিস ক্রিস্টি। ৫৩ বছর বয়সী এই রাজনীতিকের বাড়ি নিউ জার্সিতে। তিনি নিউ জার্সির গভর্নর। ২০০৯ সালে গভর্নর নির্বাচিত হওয়ার আগে তাকে ডিস্ট্রিক্ট অব নিউ জার্সির অ্যাটর্নি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ। তিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হলেও গত ফেব্রুয়ারিতে সরে দাঁড়ান। ট্রাম্প তাকে পছন্দ করতে পারেন। কারণ তিনি গত মার্চে ট্রাম্পকে সমর্থন দেন। দলের শীর্ষ রাজনীতিকের মধ্যে তিনিই প্রথম ‘বিতর্কিত’ ট্রাম্পকে সমর্থন দেন। তার রুক্ষ আচরণ ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে যেতে পারে। আবার তিনি ট্রাম্পের পছন্দের তালিকায় নাও আসতে পারেন। নিউ জার্সি ডেমোক্র্যাট অধ্যুষিত রাজ্য। সেখানে তার জনপ্রিয়তা খুব বেশি নয়।
মাইকেল ফ্লাইন। রোড আইল্যান্ডের এই বাসিন্দার বয়স ৫৭ বছর। তিনি তালিকার শীর্ষে আছেন। গতকাল বার্তাসংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানায়। তিনি প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক পরিচালক। তিনি সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল ছিলেন। তিনি সেনাবাহিনীর যৌথ বিশেষ অভিযান বিষয়ক কমান্ডের সিনিয়র গোয়েন্দা কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ইরাক এবং আফগানিস্তানে ছিলেন। তবে তাকে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। কারণ ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে রাজনৈতিক নিয়োগ নিয়ে তিনি দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তিনি ‘দ্য ফিল্ড অব ফাইট: হাউ উই ক্যান উইন দ্য গ্লোবাল ওয়ার এগেইনস্ট র্যাডিক্যাল ইসলাম অ্যান্ড ইটস অ্যালাইস’। এই জুলাইয়ে বইটি বাজারে আসছে। ফলে ট্রাম্প তাকে পছন্দ করতে পারেন। আর গত বুধবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ১০ জনকে তালিকায় রেখেছেন যার মধ্যে দুইজন জেনারেল আছেন। এর মধ্যে একজন ফ্লাইন বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ফ্লাইন ট্রাম্পের পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। তিনি ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা নীতিরও বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি হতে পারেন। আর তিনি প্রেসিডেন্ট ওবামা এবং হিলারির কট্টর সমালোচক। কিন্তু তাকে অপছন্দ করারও কারণ আছে। সেনাবাহিনীর হওয়ায় ট্রাম্পের অনেক মতের সঙ্গে ফ্লাইনের মতে অমিল হতে পারে। ভাইস প্রেসিডেন্টে তালিকায় আরো আছেন আরকানসাসের সিনেটর টম কটন, আলাবামা সিনেটর জেফ সেশনস, ওকলাহোমা গভর্নর মেরি ফ্যালন, টেনেসিস রাজ্যের নারী কংগ্রেস সদস্য মার্শা ব্ল্যাকবার্ন, পেনসিলভানিয়া সিনেটর রিক স্যানটোরাম এবং ম্যাসাচুসেটসের সাবেক সিনেটর স্কট ব্রাউন।
ডেমোক্র্যাট দল: হিলারি তার ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। ট্রাম্পের মতো পরিস্থিতি তার নয়। হিলারি তালিকায় আছেন—
টিম কেইন (৫৮)। তিনি ভার্জিনিয়ার জুনিয়র সিনেটর। ২০১২ সালে কংগ্রেসম্যান নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি ভার্জিনিয়ার গভর্নর এবং রাজধানী রিচমন্ডের মেয়র ছিলেন। সিনেটর হওয়ায় তার পররাষ্ট্র নীতি এবং সামরিক বিষয়ে অভিজ্ঞতা আছে। তিনি ক্যাথলিক মিশনারীতে ছিলেন। ফলে তিনি ক্যাথলিকদের কাছে ভোট চাইতে পারবেন। এজন্য হিলারি তাকে পছন্দ করতে পারেন। কিন্তু রাজনীতির নক্ষত্র নন। ফলে তিনি সেখানে হিলারিকে খুব বেশি সাহায্য করতে পারবেন না। আর তিনি গর্ভপাতের বিরোধী যা দলের মতের বিরুদ্ধে। তাই তিনি নাও হতে পারেন।
টেক্সাসের নাগরিক জুলিয়ান কাস্ত্রো (৪১) আবাসন এবং নগর উন্নয়ন বিষয়ক সেক্রেটারি। তিনি দলের মধ্যে খুব পরিচিত। ২০০৯ সালে তিনি সান অ্যান্টোনিওর মেয়র ছিলেন। ২০১৪ সালে তিনি ওবামা প্রশাসনে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় নিয়োগ পান। তখন থেকেই ধারণা করা হয় তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন। তার অল্প বয়স এবং তিনি হিস্পানিক। ফলে হিস্পানিকদের ভোট টানতে সহায়ক হবেন তিনি। এদিক বিবেচনায় তিনি আসতে পারেন। আবার বয়স অল্প হওয়ায় তার অভিজ্ঞতা কম। তিনি জনগণের সামনে ভালো বক্তৃতা দিতে পারবে না। আর নগর উন্নয়নে তার খুব একটা সুনাম নেই।
এলিজাবেথ ওয়ারেন (৬৭) ম্যাসাচুসেটসের সিনিয়র সিনেটর। তিনি জনপ্রিয় বামপন্থি হিসেবে পরিচিত। তিনি ২০১০ সালে ওবামা প্রশাসনে কনজিউমার ফিন্যান্স প্রটেকশন সাহায্য করেছিলেন। তিনি হার্ভার্ডের অধ্যাপক। তাই হিলারি যদি মনে করেন, বার্নি স্যান্ডার্সের শূন্যস্থান পূরণ করা দরকার তাহলে ওয়ারেনই সেক্ষেত্রে যোগ্য। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোর মতো দক্ষতাও তার আছে। আবার ওয়ারেনকে নিলে দুইজনই নারী হয়ে যাবেন। সেক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারেন হিলারি। আর তাদের বয়সও প্রায় এক। তালিকায় আছেন নিউ জার্সির সিনেটর কোরি বুকার, ওহাইওর সিনেটর শ্রেয়ড ব্রাউন, মিনেসোটার সিনেটর আল ফ্রাঙ্কেন, লেবার সেক্রেটারি থমাস পেরেজ এবং ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান জাভিয়ার ব্যাকেরা।
