টেংরাটিলার বাতাসেও গ্যাসের ঝাঁঝালো গন্ধ

আপডেট : ১২ জুলাই ২০১৬, ০০:০৬
দু’দফা বিস্ফোরণের পর কেটে গেছে ১১ বছরের বেশি সময়। কিন্তু সুনামগঞ্জের ছাতকে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র ও পার্শ্ববর্তী এলাকার বাতাসে এখনও গ্যাসের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ। ক্ষেত্রটির আশপাশের বিভিন্ন এলাকার জলাশয় ও নলকূপ দিয়ে অবিরাম গ্যাসের বুদ্ বুদ্ বের হচ্ছে। এই গ্যাস উদিগরণ স্থায়ীভাবে বন্ধের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে একদিকে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ও অন্যদিকে স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
 
২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার ছাতক (টেংরাটিলা) গ্যাসক্ষেত্রে পর পর দুইটি বিস্ফোরণ ঘটে। এ বিস্ফোরণের জন্য ক্ষেত্রটির ইজারাদার ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কানাডার কোম্পানি নাইকো রিসোর্সকে দায়ী করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আদালতে আইনি লড়াই করছে পেট্রোবাংলা। ১৯৫৯ সালে আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রটির প্রাক্কলিত মজুদ ৪৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) গ্যাস থেকে উত্তোলন করা হয়েছে মাত্র ২৬ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ঘনফুট। এতে এখনও উত্তোলনযোগ্য ৪৪৭ বিসিএফ ঘনফুট গ্যাস থাকার কথা। কিন্তু বিস্ফোরণের সময় ও পরে ক্ষেত্রটিতে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে যাওয়ায় এবং উদগিরণের কারণে এতে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস নেই বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। একইসাথে ওই এলাকার পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও কৃষিক্ষেত্র দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির শিকার হয়েছে।
 
গত মার্চ ও এপ্রিলে টেংরাটিলা          গ্যাসক্ষেত্র এলাকায় একটি বিদেশি বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে সমীক্ষা চালিয়েছে পেট্রোবাংলা। পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন এ কর্মকর্তা ওই সমীক্ষা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলেন, স্বাভাবিকভাবে বাতাসে কোনো মিথেন থাকে না। কিন্তু গ্যাসক্ষেত্রটিতে বিস্ফোরণ এলাকায় ৩০ হাজার পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) মিথেনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এমনকি বিস্ফোরণস্থল থেকে আধা কিলোমিটার দূরেও বাতাসে ৫০ পিপিএম মিথেন পাওয়া যায়।
 
বিশেষজ্ঞরা জানান, মানুষের শরীর সর্বোচ্চ দেড় পিপিএম মাত্রার মিথেন গ্রহণ করতে পারে। তাই টেংরাটিলা ও এর আশপাশে বসবাসকারী ও চলাচলকারী সকলেই উচ্চমাত্রার মিথেন গ্রহণের কারণে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। বিস্ফোরণস্থল থেকে ৫০০ বর্গমিটার এলাকায় বসবাসরত অন্তত ২০টি পরিবার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে।
 
স্থানীয়রা জানান, টেংরাটিলা ও তার আশপাশের এলাকা অনেকটা বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়েছে। গ্যাসক্ষেত্র এলাকার গাছপালায় পাতা ধরলেও পরে মরে যাচ্ছে। ফসল ও ফলদ গাছ ঠিকমতো ফলন দিচ্ছে না। জলাশয়ে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যেও চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, চোখে কম দেখাসহ নানা রোগ-ব্যাধির প্রকোপ রয়েছে।
 
এ প্রসঙ্গে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ইসতিয়াক আহমেদ বলেন, টেংরাটিলা ক্ষেত্রটি থেকে এখনও গ্যাস উদগীরণ হচ্ছে। এটি রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। একই সাথে নাইকোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়েও মামলা চলমান রয়েছে।
 
‘গামলা গ্যাস’ এর ঝুঁকিপূর্ণ  ব্যবহার
 
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বিস্ফোরণের পর প্রায় এক যুগ কেটে গেলেও পরিত্যক্ত এই গ্যাসক্ষেত্র এলাকায়  নলকূপ, পুকুর, জলাশয় ও বাড়িঘরের ফাটল দিয়ে গ্যাসের বুঁদবুঁদ বের হচ্ছে। স্থানীয়রা এই উদগীরিত গ্যাসের নাম দিয়েছে ‘গামলা গ্যাস’। এই গ্যাসকে অনেকে আবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে রান্না-বান্নার কাজেও ব্যবহার করছেন। বালু সিমেন্টের তৈরি গামলা উপুড় করে রেখে গর্ত ও ফাটলে গ্যাস জড়ো করে প্ল­াষ্টিকের পাইপ দিয়ে চুলা পর্যন্ত সংযোগ দেয়া হয়। চুলা বন্ধ করার কোনো সুযোগ নেই। অনবরত গ্যাস পুড়তে থাকে। এ প্রসঙ্গে সুরমা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও টেংরাটিলা গ্রামের বাসিন্দা খন্দকার মামুনুর রশীদ বলেন, টেংরাটিলা গ্রামের প্রায় সকল পরিবারেই গামলা গ্যাসের ব্যবহার হচ্ছে। এভাবে না পোড়ালেও উদগীরিত গ্যাস বাতাসে ঘুরপাক খাচ্ছে। টেংরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ফরিদ উদ্দিন আহমদ জানান, বিপজ্জনকভাবে রান্নার কাজে গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি বলেন, এলাকার ক্ষতিগ্রস্তরা এখনো পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পায়নি। অন্য কোনো উপায় না থাকায় লোকজন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ওই এলাকার আশেপাশের গ্রামে বসবাস করছে।
 
যেভাবে বিস্ফোরণ
 
টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের দায়িত্ব পায় কানাডার কোম্পানি নাইকো। ২০০৫ সালে ৭ জানুয়ারি রাতে ক্ষেত্রটিতে একটি কূপ খননকালে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রথম দফা বিস্ফোরণের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে না উঠতেই দ্বিতীয় দফায় আবারো বিস্ফোরণ ঘটে একই বছরের ২৪ জুন রাতে। দু’দফা বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এলাকা  জুড়ে ভয়াবহ কম্পন সৃষ্টিসহ ২শ’ থেকে ৩শ’ ফুট উচ্চতায় আগুনের দাউ দাউ শিখা ওঠানামা করতে থাকে। অগ্নিকাণ্ডের পর গ্যাসক্ষেত্রটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় কোম্পানি বাপেক্স। 
 
বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ফলে গ্যাসকূপ এলাকার টেংরাটিলা, আজবপুর, গিরীশনগর, খৈয়াজুরি ও শান্তিপুর গ্রামের ঘরবাড়ি, গাছ-পালা, কৃষিসহ এলাকার পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়। বিস্ফোরণের কয়েক দিন পর নাইকো তাদের সরঞ্জামাদি নিয়ে গ্যাসক্ষেত্র থেকে চলে যায়।