তারা ধর্মের নামে নৃশংসতা শেখায়

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৬, ২৩:৩০
“তারা প্রশিক্ষণের নামে নৃশংসতা শিখায়। তা আমি মেনে নিতে পারিনি। ইসলাম ধর্ম কখনো মানুষ হত্যা সমর্থন করে না। এটা আমার বিবেকে নাড়া দেয়।” এ কথাগুলো বলেছেন জঙ্গি প্রশিক্ষণ থেকে দুই মাস পর ফিরে আসা রাজধানী বনানী থানা এলাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেধাবী ছাত্র। তিনি গণিত অলিম্পিয়াডেরও একজন সদস্য। এই মেধাবী ছাত্র একজন শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তার কাছে তাকে স্বাভাবিক জীবন থেকে জঙ্গি কার্যক্রমে নিয়ে যাওয়ার ও দুই মাস পর ফিরে আসার বর্ণনা এবং ওই কেন্দ্রে স্বচক্ষে মোটিভেশন ও প্রশিক্ষণের দৃশ্য তিনি দেখেছেন। তবে তিনি একা নন, তার একই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহপাঠীও ছিলেন সঙ্গে। এই সহপাঠীও জঙ্গি হেফাজত থেকে একইসঙ্গে ফেরত আসে। অপরদিকে গুলশান, বনানী ও এর আশেপাশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অনেক ছাত্র নিখোজ থাকার তথ্য প্রতিদিনই গোয়েন্দা সংস্থার কাছে আসছে। তিনটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলেন, আমাদের কাছে জঙ্গি তত্পরতার নিয়ে সবচেয়ে বেশি নজরদারিতে ছিলো মাদ্রাসার ছাত্ররা। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল তেমন নজরদারিতে ছিলো না। এই ব্যয়বহুল শিক্ষায় এলিট শ্রেনী বা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরাই পড়াশুনা করে থাকেন। এই সকল মেধাবী ছাত্র জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে এটা ধারণার বাইরে। তবে কোন কোন কর্মকর্তা বলছেন, আমরা গত কয়েকমাস ধরে বিষয়টি আচ করতে পেরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে মনিটরিং শুরু করা হয়।
 
জঙ্গি প্রশিক্ষণে মেধাবী ছাত্র যেভাবে গেলেন
 
গত মার্চ মাসে তিনিসহ তার অপর সহপাঠী জঙ্গি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গিয়েছিলেন। এর আগে ওয়েবসাইট কিংবা ফেসবুকসহ নানাভাবে দেখতে পান লিবিয়া, সিরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে মুসুলমানদের উপর নৃশংস ঘটনার ছবি। প্রায়দিনই এই ছাত্র এগুলো দেখতেন। তার এক পরিচিত বড় ভাই (জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িত) তার অপর সহপাঠীকে প্রায়ই লিবিয়া, সিরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে মসুলমানদের উপর হামলার ঘটনার কথা বলতেন। এছাড়া এসব দৃশ্যের ভিডিও দেখাতেন। এজন্য তাদেরকে প্রতিবাদ করার কথা বলতেন বড় ভাই। কিভাবে প্রতিবাদ করতে হবে সেটিও ওই বড়ভাই বলে দিতেন। বড় ভাইয়ের কথা অনুযায়ী একদিন দুই সহপাঠী জঙ্গি প্রশিক্ষণে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ওই বড়ভাই জঙ্গি কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে জড়িত এবং তিনি তাদেরকে জঙ্গি প্রশিক্ষণে যেতে বলেছেন সেটা তারা বুঝতে পারেননি। একটি কালো রংয়ের মাইক্রোবাসে বড়ভাইসহ তারা উঠেন। মাইক্রোবাসে উঠার পর তারা দেখেন যে ৫/৬ জন মুখোশপড়া লোক রয়েছেন। তাদের চেহারা দেখা যায় না। এই অবস্থায় মুখোশপড়া ব্যক্তিরা বলে উঠে তোমাদেরকে এক জায়গায় নিয়ে যাব। তোমরা যাওয়ার আগে কিছু দেখতে পারবে না। এই কথা বলে এই দুই সহপাঠীকে মুখোশ পড়িয়ে দেয়া হয়। ঘন্টাখানেক পর তাদের একটি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই ভবনের একটি কক্ষে তাদের রাখা হয়। ওই সময় তাদের মুখোশও খুলে দেয়া হয়। তারা জানতে পারে এটা একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ওই প্রশিক্ষণে যাওয়ার আগে তাদের মোটিভেশন কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। এখানে আরো বেশ কয়েকটি কক্ষে মোটিভেশন করার কথা তারা শুনতে পান। একেক কক্ষে ১/২ জনকে রেখে মুখোশপড়া ৪/৫ জন মোটিভেশন শুরু করে। এই ভবনে অবস্থানরত মোটিভেশন প্রদানকারী সকলেই ছিলেন মুখোশ পরিহিত। তাদের ২ জনকে দুই কক্ষে রেখে মুখোশ পরিহিত তরুণ বা মধ্য বয়সী ব্যক্তিরা মোটিভেশন করতে থাকে। নানা ধরনের হাদিস কোরআন শোনানো হয়। মসুলমানদের উপর হামলা হচ্ছে এবং নির্বিচারে হত্যার বিষয়ে তাদেরকে প্রতিবাদী হওয়ার জন্য বলা হয়। হামলাকারীদের কিংবা বিধর্মীদের কতল করতে হবে। এজন্য জেহাদী মনোভাব থাকতে হবে। আর এই রাস্তায় আসলে তোমরা সহজে জান্নাত পাবে। পরকালে তোমাদের মা-বাবাও জান্নাত পাবে এবং তাদের সাথে তোমাদের দেখা হবে।
 
অপরদিকে এই দুই মেধাবী ছাত্রের পছন্দের জিনিসও সরবরাহ করা হয়। কোনভাবেই তাদেরকে জঙ্গি কাজে মটিভেশন করা সম্ভব হয়নি। সব চেষ্টা চালিয়ে মুখোশপড়া তরুণরা ব্যর্থ হয়। ওই ভবনেই দুই মাস তাদেরকে আটক রাখা হয়। এই সময়ের মধ্যে তারা দেখতে পায় অনেক তরুণ ও ছাত্রদেরকে এই ভবনে এনে জঙ্গি কাজে অংশগ্রহনের জন্য মোটিভেশন করা হয়। দুই মাস আটক থাকাবস্থায় জঙ্গিকাজে কিভাবে তরুণদের সম্পৃক্ত করছেন তা দেখতে পান। এই দুই তরুণকে মোটিভেশন করতে ব্যর্থ হওয়ার দুই মাস পর রাজধানীর উত্তরা এলাকায় কালো চশমা পরিয়ে মুখোশপড়া অবস্থায় তাদেরকে নামিয়ে দেয়া হয়। সতর্ক করে দেয়া হয় এই বিষয়টি যেন গোপন থাকে। প্রথমে তারা ভয়ে কাউকে কিছু বলেনি। মা-বাবার কাছে ফিরে আসায় তারা স্বস্তি প্রকাশ করেন।  নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা শুরু করে দেয়। ইতিমধ্যে গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর এই ছাত্র বিবেকের তাড়নায় এবং এই নৃশংস ঘটনার সঙ্গে যেন কোন ছাত্র সম্পৃক্ত না হয় সেই বিষয়টি প্রকাশ করতে তিনি গোয়েন্দা দফতরে হাজির হন। তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আগ থেকেই ওই ছাত্রের জঙ্গি দলের হেফাজতে থাকার বিষয়টি জানতেন এবং সনাক্তের জন্য অনুসন্ধান চলছিলো। এই ছাত্র আরো জানায় যে, মোটিভেশন করার পর তাদেরকে পরবর্তী প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়ে থাকে। মোটিভেশন হলো প্রশিক্ষণের আগের ধাপ বলে এই ছাত্র জানায়। এই মেধাবী ছাত্রের তথ্য ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অনুসন্ধানে জানা যায় যে, উত্তরা, মিরপুর, পল­বী, মোহাম্মদপুর, গুলশান, বনানী ও আশপাশের এলাকায় জঙ্গিদের মোটিভেশন ও প্রশিক্ষন কেন্দ্র রয়েছে। রাজধানীতে কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে জঙ্গিরা মেধাবী ছাত্রদেরকে নিয়ে মোটিভেশন করে থাকে এমন তথ্য গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে।