তালিকাভুক্ত ১০ সন্দেহভাজন জঙ্গির একজন সাইফুল্লাহ ওজাকির পরিচয় পাওয়া গেছে। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার কড়ুইবাড়ি গ্রামে। তার আসল নাম সুজিত দেবনাথ। তার পিতার নাম জনার্ধন দেবনাথ। মুসলমান হওয়ার পর সে নাম পরিবর্তন করে সাইফুল্লাহ ওজাকি নাম নেয়।
গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর যে ১০ যুবকের তথ্য দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সম্প্রতি গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে, ওই তালিকায় সাইফুল্লাহ ওজাকির নাম ও ছবি রয়েছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, নিখোঁজ সাইফুল্লাহর বিরুদ্ধে বিদেশ থেকে জঙ্গিদের অর্থায়ন করার অভিযোগ রয়েছে। ওই তালিকায় থাকা সাইফুল্লাহ ওজাকির ছবি দেখে তাকে নিজের ছেলে সুজিত দেবনাথ বলে শনাক্ত করেছেন বাবা জনার্ধন দেবনাথ।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সাইফুল্লাহ খুবই মেধাবী ছাত্র ছিল। সে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে স্ট্যান্ড করে। পরে বৃত্তি পেয়ে জাপান চলে যায়। জাপান এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে। পরে জাপানের কিউতো ইউনিভার্সিটিতে লেকচারার হিসেবে যোগদান করে। অনার্স পরীক্ষার ফলাফলের পর সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের তত্কালীন মহাসচিব কফি আনান তাকে একটি মোটরসাইকেল উপহার দিয়েছিলেন। পরে সে একজন জাপানিকে বিয়ে করে। তারপর স্বামী-স্ত্রী দু’জনই মুসলমান হন। তাদের তিন পুত্র ও এক কন্যা সন্তান রয়েছে। তার পিতা একসময় এলাকায় ফেরি করে কাপড় বিক্রি করতেন। গত কয়েক বছর ধরে স্থানীয় জিনদপুর বাজারে দোকান নিয়ে কাপড়ের ব্যবসা করছে। সাইফুল্লাহ ওজাকির একটি ছোট বোন রয়েছে। সে-ও মাস্টার্স করেছে। তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়েছে।
গতকাল বুধবার সরেজমিনে তার গ্রামের বাড়িতে গেলে দেখা যায় তার মা অনিতা রানী দেবী ও বাবা জনার্ধন দেবনাথ গণমাধ্যমে তাদের পুত্রের সংবাদ পেয়ে খুবই কাতর হয়ে পড়েছেন। মা পুত্রের ছবি নিয়ে কান্নাকাটি করছেন। আর বাবা কারো সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছেন না। সারাদিন শুধু বিছানায় পড়ে থাকেন। তাদের সন্তান নিখোঁজ একথা তারা জানেনই না।
সাইফুল্লাহর আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাইফুল্লাহ মুসলমান হওয়ার আগে যখন বাড়িতে আসত তখন দাড়ি ছিল না। মুসলমান হওয়ার পর দাড়ি রাখা শুরু করে। ২০০৬ সালে ছোট বোন রীনা রানী দেবনাথের বিয়েতে এসেছিল। সর্বশেষ এসেছিল বছর খানেক পূর্বে। সে বাংলাদেশে আসলে ঢাকায় অবস্থান করত। গ্রামের বাড়িতে আসলেও থাকত না। ঢাকায় এসে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাশও নিত।
গ্রামের লোকজন জানান, সাইফুল্লাহ অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিল। নম্র ও ভদ্র স্বভাবের ছিল। কারো সঙ্গে কখনো ঝগড়া করত না। সে জঙ্গি কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারে তা তারা ভাবতেও পারেননি। জিনদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুর রউফ জানান, আমার ছেলের বন্ধু সাইফুল্লাহ ওজাকি। বছর খানেক পূর্বে সে গ্রামের বাড়িতে এসেছিল। আমার বাড়িতে এসে ১০ থেকে ১৫ মিনিট ছিল। মা-বাবার সাথে দেখা করলেও কিছুই খায়নি। সে খুবই ভাল ও ভদ্র ছেলে ছিল। সে জঙ্গি হতে পারে তা বিশ্বাস হয় না। তবে ৬ মাস পূর্বে তার ব্যাপারে জানতে পুলিশ বাড়িতে এসেছিল। টেলিফোনে জানতে চাইলে এ ব্যাপারে সে কিছুই জানে না বলে জানিয়েছে।
বাবা জনার্ধন দেবনাথ জানান, ২০০৬ সালে সাইফুল্লাহ অনার্সে প্রথম বিভাগে প্রথম হওয়ার পর একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আমাকে জাপান নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে আমি প্রায় ২২ দিন ছিলাম। বাংলাদেশে আসলে আমাদের সঙ্গে দেখা করে যেত। মাঝে মধ্যে ফোনে খোঁজ-খবর নিত। তবে গত ৬ মাস ধরে আর কোন খোঁজ-খবর নেয় না। আমি তার কাছে কিছু চাইতাম না। তার মাকে মাঝে মধ্যে টাকা পাঠাত। সে ভদ্র, শান্ত ও মেধাবী ছিল। সে কোন রকম সন্ত্রাসী কাজ করতে পারে না।
সাইফুল্লাহর মা অনিতা রানী দেবী কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ‘আমার সাথে তার সখ্য ছিল। বাবার সাথে তত ছিল না। আমাকে সব কথা বলত। ফোনে আমার সাথে কথা বলত। আমাকে টাকা পাঠাত। আমাকেও একবার জাপান নিয়ে গিয়েছিল। আমার ছেলে তো শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের। সে আমার ছেলে, আমি তাকে চিনি। সে এ কাজ কখনোই করতে পারে না।’
সাইফুল্লার শিক্ষক নবীনগর পাইলট হাই স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবদুল করিমও জানান, সে খুবই মেধাবী ছাত্র ছিল। এরকম ছাত্র কমই মিলে। হিন্দু ধর্মের প্রতি তার তো অগাধ বিশ্বাস ছিল। সে এরকম হবে তাতো বিশ্বাস হয় না।
নবীনগর থানার ওসি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানার সন্ত্রাস বিরোধী আইনে করা একটি মামলায় তার ব্যাপারে তদন্তের অনুরোধ এসেছিল। আমরা তদন্ত করে রিপোর্ট পাঠিয়ে দেই। এ ব্যাপারে তার আর কিছু জানা নেই।
