এক সপ্তাহের মধ্যে গুলশান ও শোলাকিয়ায় দুটি হামলা করে ২০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করার মাধ্যমে জঙ্গিদের মূল লক্ষ্য ছিল সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। তদন্তসূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করা, বিশেষ করে জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর সম্ভাব্য ফাঁসি বাতিল করে তাকে মুক্ত করাই ছিল হামলাগুলোর উদ্দেশ্য।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, শত কোটি ডলারের মালিক মীর কাশেম ইতোমধ্যে আড়াই কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছেন আন্তর্জাতিক ভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের জন্য সমর্থন আদায় করতে। এছাড়া তার দল জামায়াত জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের সূতিকাগার হিসেবে কাজ করছে।
এ বিষয়ে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ফোনে ইত্তেফাককে বলেন, শোলাকিয়া হামলার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পেয়েছি আমরা। তবে এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। এ সময় আক্রমণকারীদের তিনটি উদ্দেশ্যের ব্যাপারে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পূর্বপরিকল্পিত এই আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল প্রথমত, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করা। বিশেষত শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলীর দণ্ডাদেশ কার্যকর প্রক্রিয়া ব্যাহত করা, দ্বিতীয়ত সরকারকে উত্খাত করা এবং তৃতীয়ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চলমান ‘ভিশন ২১’ ও ‘ভিশন ৪১’ এর উন্নয়নের ধারা বাধাগ্রস্ত করা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব নেই। তবে কথিত আইএস-এর নামে নিজেদের কার্যক্রম চালানোর জন্য দেশি জঙ্গি সংস্থা যেমন ইসলামী ছাত্র শিবির, জেএমবি, হরকাত উল জিহাদ এবং আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের মত জঙ্গি দলগুলো ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা সামাজিক মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে আইএসের সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং আইএসের তকমা লাগানোর চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, গুলশানে জঙ্গি হামলাকারীদের আসল উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসির রায়প্রাপ্ত মীর কাশেম আলীকে মুক্ত করা এবং সরকারকে অস্থিতিশীল করে তোলা। আমাদের মাটি থেকে এদের সমূলে উত্খাত করতে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।
এদিকে গুলশান আক্রমণের পরে একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদপত্র আনন্দবাজার জানায়, শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনকে ১৫০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে এবং আক্রমণের সময় করাচি ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে অজস্র ফোন কল বিনিময় হয়েছে।
এই জঙ্গি অর্থায়ন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বিদেশ থেকে জঙ্গিদের অর্থায়ন হচ্ছে এটা সত্য। কিন্তু আমরা জানতে পেরেছি বাংলাদেশ থেকে অর্থ বিদেশে যাচ্ছে এবং বিদেশ থেকে সেই অর্থ জঙ্গিদের অর্থায়নের জন্য প্রেরণ করা হচ্ছে বাংলাদেশে। এই অর্থায়ন ও জঙ্গিদের সহায়তার পেছনে যারা জড়িত তাদের খুঁজে পেয়েছি আমরা। আমাদের তদন্ত কার্যক্রমও প্রায় শেষের দিকে। আশা করছি অচিরেই জড়িতদের মুখোশ উন্মোচন করা হবে।
জঙ্গি অর্থায়নের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক: গুলশান ও শোলাকিয়ায় আক্রমণকারীদের সঙ্গে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর যোগসূত্র রয়েছে বলে সন্দেহ করছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। গতবছর পাকিস্তান দূতাবাসের দুজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগ আসার পরে তাদের প্রত্যাহার করা হয় যে, জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে আক্রমণকারীদের সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে বলেন, ‘পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ও পাকিস্তান অ্যাম্বেসি সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়।’
জামায়াতের আর্থিক ভিত্তি মীর কাশেম:মীর কাশেম জামায়াতে ইসলামের অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তি। সে জামায়াতের অর্থ বিভাগের দায়িত্ব নেয়ার পর বেশ দ্রুত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নতি করে জামায়াতে ইসলাম ও তার সহায়ক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। মীর কাশেম ব্যবসাকে সমপ্রসারণ করেন ব্যাংকিং খাত থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ও গণমাধ্যম ক্ষেত্রে। তিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (এনজিও) মাল্টিপারপাস ওয়েলফেয়ার এজেন্সির চেয়ারম্যান এবং ২০টি দেশের ব্যবসায়ীদের নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির ভাইস চেয়ারম্যান। তিনি ইসলামী ব্যাংকের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের সদস্য, সাবেক সৌদি অ্যাম্বাসেডর প্রতিষ্ঠিত সৌদ আল খতিব দাতব্য ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের মাত্র ৭ মাসের মাথায় ২০১০ সালে অক্টোবরে মীর কাশেম ২.৫ কোটি ডলার বা ১৯৬ কোটি ৮৯ লাখ ৯৮ হাজার ৭৫০ টাকা প্রদান করেন যুক্তরাষ্ট্রের লবিস্ট ফার্ম ক্যাসিডো অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস-কে। মূল লক্ষ্য ছিল মার্কিন সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কথা বলে তার (মীর কাশেমের) উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন। এ সময় ট্রাইব্যুনালের বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক আরো বিভিন্ন সংস্থাকে তিনি অর্থায়ন করেছেন। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশকিছু দেশ থেকে এই সাহায্য এসেছে। যার মূল লক্ষ্য ছিল মীর কাশেমসহ জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে বিচার বন্ধ করা।
