নথি এক জায়গায় পড়ে থাকলে আইন তৈরির কাজ এগোবে কীভাবে

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০১৬, ০৮:৪৪
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কর্তৃত্বে দোষ আমলে নিয়ে বিচারের ক্ষমতা প্রদান করে মোবাইল কোর্ট সংশোধিত আইন দীর্ঘ ১৩ মাসেও আলোর মুখ দেখেনি। গত বছরের ২২ জুন অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত সাপ্তাহিক সভায় মোবাইল কোর্ট আইন (সংশোধন)-২০১৫ চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। গতকাল সোমবার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত সাপ্তাহিক সভায় ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনাকালে প্রসঙ্গটি আসে। আলোচনায় জানানো হয় মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর বিষয়টি ভেটিং-এর জন্য লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিভাগে পাঠানো হলেও তা ফেরত না দেওয়ায় আইন সংশোধনের জন্য সংসদে উত্থাপনের পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি।
 
মন্ত্রিসভা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি জানান, নথিটি তাঁর টেবিলেই আছে। বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। সংশোধনীটি মাযদার হোসেন মামলার রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় কী না তা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা হবে বলে জানান আইনমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি আইন করতে দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এক জায়গায় এতদিন পড়ে থাকলে কাজ এগোবে কীভাবে। তিনি বলেন, মোবাইল কোর্ট ইভটিজিং বন্ধ, ভেজাল নিয়ন্ত্রণ, ফরমালিন নিয়ন্ত্রণসহ পরিবেশ দূষণমূলক কাজ নিয়ন্ত্রণে সাফল্য লাভ করেছে। তিনি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আইন-কানুন তৈরি সম্পর্কিত বিষয়াদি নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। সচিবালয়ে মন্ত্রিসভা কক্ষে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও সংশ্লিষ্ট সচিবেরা সভায় উপস্থিত ছিলেন। সূত্র জানায়, সভার শুরুটা হয় মূলত তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর দুঃখ প্রকাশ সংক্রান্ত লিখিত বিবৃতি বিলি করার মাধ্যমে। এতে তিনি মন্ত্রী-এমপিদের পেটে যায় টিআর-কাবিখার বরাদ্দ-এই মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। দেশে দুর্নীতি কমানো যাচ্ছে না বলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের মন্তব্যের জেরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি যে বলছেন দুর্নীতি কমছে না তা হলে এই যে এত উন্নয়ন হচ্ছে তা কীভাবে হচ্ছে’। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তীর ছেড়ে দিলে এবং মুখের কথা বেরিয়ে গেলে আর ফিরে আসে না।’
 
মন্ত্রিসভায় একজন যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়া যাতে দ্রুত হতে পারে সেদিকে সরকারি আইনজীবীদের তত্পরতা থাকা দরকার বলেও মন্তব্য করেন কেউ-কেউ। 
 
সংশোধিত মোবাইল কোর্ট আইনে যা থাকছে: সংশোধিত আইনে দোষ স্বীকার না করলেও চাক্ষুস প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিচার-বিবেচনা করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারবেন-এই  বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া অপরাধী পালিয়ে গেলেও তাকে আমলে নেওয়ার সুযোগ আছে এই আইনে। পালিয়ে যাওয়া কোনো অপরাধীর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করতে থানাকে আদেশ দিলে থানা সেটি আমলে নিতে বাধ্য থাকবে। এ ছাড়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক সাজা প্রাপ্ত কাউকে ৩০ দিনের মধ্যে আপীল করার সুযোগ থাকছে। প্রসঙ্গত, বিচার বিভাগ পৃথক হবার পর থেকে মাঠে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে গিয়ে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিলেন তারা। বিশেষ করে অপরাধ আমলে নিতে না পারা এবং দোষ স্বীকার না করলে শাস্তি দিতে না পারায় মোবাইল কোর্ট  কার্যত অনেকটাই বিফলে যাচ্ছিল। সংশোধনীর ফলে কার্যকর মোবাইল কোর্ট পরিচালনা সম্ভব হবে বলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের দাবি। তারা এও বলছেন এ আইন সংশোধনের ফলে মাযদার হোসেন মামলার রায়ের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না।   
 
মোবাইল কোর্টের আওতায় ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর ও বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করা যাবে। এছাড়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট পরিচালনায় বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে পারবেন বলে সংশোধিত খসড়ায় বলা আছে। সূত্র জানায়, ম্যাজিস্ট্রেটের চাহিদা মাফিক আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েনে বাধ্যবাধকতা থাকছে। ‘দ্য জুডিশিয়াল অফিসার্স প্রটেকশন অ্যাক্ট ১৮৫০’-এর আওতায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী ম্যাজিস্ট্রেটদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।
 

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোজাম্মেল হক খান গতকাল সোমবার ইত্তেফাককে বলেন, বিদ্যমান মোবাইল কোর্ট আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা যে সব সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। এদিকে গতকালের বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের জানান, চলতি বছর দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হার গত বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ বেড়েছে। চলতি বছর এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত মন্ত্রিসভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হার ৭০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। গত বছর একই সময়ে এই হার ছিল ৬৪ দশমিক ৭১ শতাংশ।