বৃক্ষরোপণ ও জীববৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দিতে হবে :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৬, ১৫:০০
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃক্ষ নিধন, জলাভূমি ভরাট, পাহাড় কাটা, নদী দূষণ ও কৃষি জমিতে রাসায়নিকের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধসহ পরিবেশ সুরক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, জাতি হিসেবে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব সবার। আর পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি জোরদার করার মাধ্যমে দেশের সবুজ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) বাস্তবায়ন, দূষণমুক্ত, পরিবেশবান্ধব সবুজ অর্থনীতি গড়তে হলে আমাদের পরিবেশ সংরক্ষণকে মূল ধারায় নিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে। এই পরিস্থিতিতে টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে সবুজ অর্থনীতি গড়ার কোনো বিকল্প নেই।
 
গতকাল রবিবার সকালে রাজধানীর ফার্মগেটস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে (কেআইবি) বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা ২০১৬ এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা ২০১৬ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি।
 
বন্যা দুর্গত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন,
 
সাম্প্রতিককালে একটু বন্যা শুরু হয়েছে। বন্যাটা এই সময়ে আমাদের দেশে স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। তবে মাঝে মাঝে বন্যা খুব বড় আকারে আসে। তিনি বন্যার ক্ষতির পাশাপাশি এর উপকারী দিক হিসেবে ভূগর্ভের পানির স্তর যে নীচে নেমে যায় তা রিচার্জ হয় বলে উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ একটি পলিবাহিত ব-দ্বীপ অঞ্চল। এখানে বন্যা আমাদের ভূমিও পুনর্গঠন করে। কিন্তু বন্যার ফলে মানুষের যে ক্ষতি, সেই ক্ষতিটা যাতে না হয় তার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ আমাদের নেওয়া প্রয়োজন। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই নদীগুলো ড্রেজিং, পানির ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নদীর প্রবাহ সচল রাখাসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে সরকার।
 
‘ট্যানারি মালিকরা অযথা দেরি করছেন’
 
ট্যানারি বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, হাজারীবাগ থেকে যাতে না সরতে হয় সেজন্য ট্যানারি মালিকরা নানা ছল-চাতুরী এবং অযথা দেরি করছেন। এটা ঠিক না। তাদের উচিত দ্রুত তাদের ট্যানারি সরকারের নির্ধারিত শিল্পনগরী সাভারে স্থানান্তর করা। তিনি বলেন, সাভারের হরিণধরা এলাকায় আমরা ট্যানারি শিল্প তৈরি করে দিয়েছি। সেখানে স্থানান্তর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে বারবার বলা সত্ত্বেও ট্যানারি মালিকরা কেন নানা ছলছুতার আশ্রয় নিয়েছেন? তারা (মালিকরা) দ্রুত ট্যানারি স্থানান্তর করলে এ জায়গাটা (হাজারীবাগ) পরিবেশ আবার ফিরে পাবে। প্রসঙ্গত দফায় দফায় সময় দিয়েও ঢাকার ট্যানারিগুলোকে সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে পাঠাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত গত ২৯ ফেব্রুয়ারি শিল্পমন্ত্রী ট্যানারি স্থানান্তরে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময় দিয়েছিলেন মালিকদের। ওই সময়ের পরে হাজারীবাগে কাঁচা চামড়ার প্রবেশ ঠেকাতে বসানো হয় পুলিশ প্রহরা। পরে হাজারীবাগে থাকা ১৫৪ ট্যানারি সেখান থেকে না সরানো পর্যন্ত পরিবেশ দূষণের ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রতিদিন ৫০ হাজার টাকা করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে গত ১৬ জুন নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। তবে ব্যবসায়ীদের এক আবেদনে হাই কোর্টের আদেশ ১৭ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করে চেম্বার আদালত। এরপর ১৮ জুলাই আপিল বিভাগ দৈনিক ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কমিয়ে ১০ হাজার টাকা করে।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে প্রচুর নদী-নালা ও খাল-বিল রয়েছে। বাংলাদেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ। এই দেশের পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, নদী দূষণের ক্ষেত্রে রাসায়নিক সার যেমন আছে, আছে বর্জ্য আর জলযানও। এসব থেকে নদী ব্যাপকভাবে দূষণ হয়ে থাকে। এ বিষয়ে সবার সতর্ক থাকতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বনভূমি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের ম্যানগ্রোভ বন তৈরি করতে হবে। নারকেল বাগান তৈরি করতে হবে। যার মাধ্যমে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। ফলদ, বনজ ও ভেষজ— এই তিন ধরনের গাছ লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আশা করি দেশের সব মানুষ বৃক্ষরোপণের প্রতি মনোযোগী হবেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে পরিবেশ রক্ষায় বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে বলে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের কাছে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পরমুখাপেক্ষী না থেকে নিজস্ব অর্থায়নে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হয় সেগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, তার সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গঠিত ট্রাস্টে ইতোমধ্যে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এই ট্রাস্ট ফান্ডের আওতায় এ পর্যন্ত ৪৩৪টি প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে গ্রীন ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করেছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ২০১৫ সালে ঐতিহাসিক প্যারিস চুক্তিতে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে। একইসঙ্গে রান্নায় জৈব জ্বালানি ব্যবহার অর্ধেকে নামিয়ে আনতে সারাদেশে বন্ধুচুলা ব্যবহার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
 
‘জলাধারের ব্যবস্থা করতে হবে’
 
শেখ হাসিনা বলেন, যেখানে শিল্পাঞ্চল থাকবে, সেখানে জলাধারের ব্যবস্থা করতে হবে। যেখানে আবাসিক এলাকা তৈরি করা হবে, সেখ?ানেও জলাধারের ব্যবস্থা থাকতে হবে। যারা শিল্পাঞ্চল-আবাসিক এলাকা তৈরি করবেন, তাদেরই জলাধার তৈরি করতে হবে। পরিবেশ সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রতিটি এলাকায় জলাধার রাখা প্রয়োজন। তাছাড়া আগুন লাগলে পানি পাবো কোথায়, এজন্য আমাদের স্বার্থেই প্রতিটি এলাকা ও স্থাপনার পাশে জলাধার রাখতে হবে। আর ছাদে যে বৃষ্টির পানি পড়ে সেটা যাতে এই জলাধারে গিয়ে পড়ে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এটি নিশ্চিত করতে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে নজরদারি বৃদ্ধি করার পাশাপাশি তাদেরকে অব্যাহত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে রাজউকসহ সংশ্লিষ্টদের চাপ প্রয়োগেরও আহবান জানান প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব ভালভাবে নিরুপণ করে দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন তিনি। আওয়ামী লীগ কৃষক লীগকে সঙ্গে নিয়ে পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি যখন দেখা দিয়েছে, তখন আমরা বসে থাকিনি। নানামুখী কাজ করে যাচ্ছি। যেখানে আমাদের বনভূমি ৯ শতাংশ ছিল, সেটা এখন ১৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য দেশে ২৫ শতাংশ বনভূমি তৈরি করা। আর সেখানে যাওয়ার জন্য আমাদের কতগুলো পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপকভাবে বনায়ন সৃষ্টি করতে হবে। বিশেষ করে সমুদ্র উপকূল ও নদীর মোহনাগুলোয় কৃত্রিম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেসব এলাকায় বিদ্যুেকন্দ্র অথবা শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে সেখানেই বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সবুজ বেষ্টনি গড়ে তোলা হচ্ছে।
 
কক্সবাজারে যে ঝাউবন দেখা যায় সেটা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লাগিয়ে গেছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বঙ্গবন্ধু ওই ঝাউবন লাগিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে জীববৈচিত্র্য চ্যালেঞ্জের মুখে। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে আমাদের চুক্তি হবে। যার মাধ্যম জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন-২০১৬’ ইতিমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। আগামী সংসদের অধিবেশনে এটি পাস করা হবে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্লান-২১০০’ প্রণয়নের কাজ চলছে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গাজীপুরে ৩৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক এবং চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে শেখ রাসেল এভিয়ারি ও ইকোপার্ক স্থাপন করা হয়েছে। এ বছর বন বিভাগ প্রায় ৩ কোটি চারা উত্তোলন করেছে। ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর সুরক্ষায় পদক্ষেপের কথা জানিয়ে তিনি আরো বলেন, হাজারীবাগ ট্যানারি এলাকা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করেছি। নৌযান থেকে নদীতে তেল পড়েও ব্যাপক দূষণ হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। শেখ হাসিনা সামাজিক বনায়নের জন্য এ বছর পুরস্কারপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, এই পুরস্কার যেন আরো বেশি করে দেওয়া যায়, সেই ব্যবস্থা করা হবে। আসুন সবুজ-শ্যামল এই বাংলার মাটি কাজে লাগাই।
 
‘পানি নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশের ধারাবাহিকতায়
 
আজকের পরিবেশ অধিদপ্তর’
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে ‘পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ’ জারি করেন। তখন পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়। এ অধ্যাদেশ ও প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি হয়েছে আজকের পরিবেশ অধিদপ্তর। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে অনুচ্ছেদ ১৮(ক) সংযুক্ত করেছে। এতে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যত্ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন’। তাই এটি সংরক্ষণ করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। শেখ হাসিনা বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকারের কার্যক্রমের স্বীকৃতি হিসাবে আমাকে গত বছর জাতিসংঘের সর্বোচ্চ পরিবেশ পদক ‘চ্যাম্পিয়ন’স অব দি আর্থ’ প্রদান করে। যা আমি দেশের মানুুষের জন্য উত্সর্গ করেছি। কারণ তারাই ভোট দিয়ে আমাদের নির্বাচিত করেছে এবং আমরা সেবা করার সুযোগ পেয়েছি, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করার সুযোগ পেয়েছি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন কৃষক লীগের পক্ষ থেকে ১৯৮৫ সাল থেকে ১ আষাঢ় সারাদেশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন উল্লেখ করে সবাইকে পুনরায় বর্ষা মৌসুমে অন্তত একটি করে হলেও ফলদ, বনজ ও ভেষজ গাছের চারা রোপণের আহবান জানান। তিনি বলেন, বিশ্বে জলবায়ু জনিত ক্ষতি যখন দেখা দিয়েছে তখন আমরা কারো জন্য অপেক্ষা করি নাই। আমরা নিজস্ব অর্থায়নে বিভিন্ন ফান্ড তৈরি করে এই পরিস্থিতি মোকাবিলার উদ্যোগ নেই। যাতে করে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা যায়। তিনি বলেন, আমরা এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছি বলেই আজ বিশ্ব কূটনিতিতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষে সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কনভেনশনের আওতায় গঠিত গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড বোর্ড, এ্যাডাপটেশন ফান্ড বোর্ড, এক্সিকিউটিভ কমিটি অন লস এন্ড ড্যামেজ, কনসালটেটিভ গ্রুপ অব এক্সপার্টস এন্ড মন্ট্রিল প্রোটোকল ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটির সদস্যপদ লাভ করেছে।
 
শিল্প বর্জ্য অপসারণে তার সরকারের গৃহীত থ্রি আর (হ্রাস, পুনঃব্যবহার ও পুনঃচক্রায়ণ) কর্মকৌশল গ্রহণের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শূন্য বর্জ্য পদ্ধতি অবলম্বনে উদ্যোক্তাদের উত্সাহিত করছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ৩৯টি সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করেছে। বন অধিদপ্তর ইতোমধ্যে ৭১,০২২ হেক্টর ভূমিতে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে বাগান তৈরি করেছে। তিনি বলেন, এ সকল রক্ষিত এলাকায় সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করে স্থানীয় জনগণের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করেছে। গড়ে তোলা বাগান থেকে ২৫,৩৪৫ হেক্টর ব্লক বাগান এবং ১১,৯২৬ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান কেটে পুনঃবনায়ন করা হয়েছে। এখান থেকে আয় করা ২৬৪ কোটি ৯২ লাখ ২১ হাজার ৬৮৮ টাকার প্রায় সব অর্থ সামাজিক বনায়নে সম্পৃক্ত ১ লাখ ২০ হাজার ৪১৩ জনের মধ্যে বিতরণ করেছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা গড়াই নদী খনন করেছি। সুন্দরবনে বাঘের ব্রিডিং পয়েন্ট বৃদ্ধির মাধ্যমে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য ব্যবস্থা নিয়েছি। কিছু কিছু বনজ সম্পদের আহরণ সীমিত করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর সিলেট ও মৌলভীবাজার এলাকায় ইকোপার্ক সৃষ্টি করা হয়।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবুজ বেষ্টনী প্রকল্প প্রাকৃতিক দুর্যোগ এর কবল থেকে উপকূলীয় জনগণের জানমালের হেফাজত করছে। রাজধানী ঢাকার পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদীকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করে তা ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হচ্ছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরে মনিটরিং এন্ড এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম জোরদার করার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের দূষণমুক্ত উন্নত প্রযুক্তির ইটভাটা প্রচলনের কার্যক্রম গ্রহণের কথাও উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী দেশের সামুদ্রিক সম্পদকে কাজে লাগানোর জন্য সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে বলেন, ভারত ও মায়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা মীমাংসার ফলে বঙ্গোপসাগরে প্রাপ্ত ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকার সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষার কার্যক্রম গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে। তিনি দেশকে সবুজে সবুজে ভরে তোলা এবং সবুজ অর্থনীতি নির্ভর ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে সবাইকে এগিয়ে যাওয়ার আহবান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ, বাঁচায় প্রকৃতি, বাঁচায় দেশ।’ আর আমাদের জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা ২০১৬’র প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘জীবিকার জন্য গাছ, জীবনের জন্য গাছ।’ উভয় প্রতিপাদ্য যথার্থ হয়েছে বলে আমি মনে করি। সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গিকার পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। বক্তৃতা শেষে প্রধানমন্ত্রী কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন চত্বরে একটি তেঁতুল গাছের চারা রোপণ করেন এবং বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পাশে পরিবেশ মেলা ও বৃক্ষমেলা ২০১৬’র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এবং মেলা ঘুরে দেখেন।
 
পরিবেশ রক্ষায় সব মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে
 
কাজ করছে : আনোয়ার হোসেন মঞ্জু
 
সভাপতির বক্তব্যে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, বৃক্ষরোপণ একটি সামাজিক আন্দোলন হলেও এখন এটি দেশের মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তবতা। সরকারি পর্যায়ে বনায়নের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে বিশেষ করে ব্যক্তি পর্যায়ে যে বনায়ন হচ্ছে তা উল্লেখ করার দাবি রাখে। এক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগীদের কথাও আমি উল্লেখ করতে চাই। বৃক্ষরোপণের জন্য বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যে আমাদের ৩৬০ কোটি মার্কিন ডলার দিয়েছে। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে সংস্থাটি আরো ১ হাজার ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার দেবে বলে অঙ্গীকার করেছে। ইতিমধ্যে বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় উপকূলীয় এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্পটি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে। পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় সব মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এছাড়া উপকূলের মানুষকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করতে সবুজ বেষ্টনী নির্মাণের জন্য সরকার ইতিমধ্যে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, কর্মসূচিটি বাস্তবায়িত হলে বনায়নের যে ধারা বাংলাদেশে চলছে তা আরো বেগবান হবে।
 
পরিবেশ ও বন মন্ত্রী বলেন, প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে সবাই একত্রে মিলে কাজ করবে বলে জাতিসংঘ প্রত্যাশা করেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের আমন্ত্রণে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্বনেতারা একটি বিশেষ বৈঠকে মিলিত হবেন। চুক্তিটি বাস্তবায়নে কোন দেশ কি কি পদক্ষেপ নিচ্ছে তা জানতে চাওয়া হবে এ বৈঠকে। যেসব দেশ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি, তারা ২০১৬ সালের মধ্যে চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারবে। কোনো একক দেশ যাতে প্যারিস চুক্তির বাইরে না থাকে সে প্রচেষ্টাও চালাচ্ছে জাতিসংঘ। চুক্তিটিতে ইতোমধ্যে ১৭৫টি দেশের প্রতিনিধিরা স্বাক্ষর করেছেন। পরিবেশ ও বন মন্ত্রী বলেন, আমরা যেন এই সিক্ত সবুজ পৃথিবীকে বসবাসের অযোগ্য করে না তুলি সেলক্ষ্যে কাজ করতে হবে। বিশ্ব পরিবেশ ও জলবায়ুর ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। মানব সভ্যতার জন্য এটি অবশ্যই হতাশার কারণ। আমরা যদি এ হতাশা থেকে বের হতে না পারি তাহলে অচিরেই আমরা এই ধরীত্রিতে বিপর্যয় দেখতে পাবো। এক্ষেত্রে তিনি আফ্রিকার একটি প্রবাদ উল্লেখ করে বলেন, ‘যদি আমরা তাড়াহুড়ো করে চলতে চাই, তাহলে আমাদের একাই লড়তে হবে। আর যদি বহুদূর যেতে চাই, তাহলে সকলে মিলেই এক সাথে যেতে হবে। বিশ্ব নেতৃত্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আগামীতে বাংলাদেশের মানুষ একটি পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ পাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
 
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের উপ-মন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব এমপি, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোঃ রইছউল আলম মণ্ডল, বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মোঃ ইউনুছ আলী প্রমুখ। অনুষ্ঠানে পরিবেশ ও বন বিষয়ক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন ক্বারী মোঃ ইমদাদুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ড লাইফ কনজার্ভেশন-২০১৬, জাতীয় পরিবেশ অ্যাওয়ার্ড ২০১৬ বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার-২০১৫ ও সামাজিক বনায়নের লভ্যাংশের চেক প্রদান করেন।
 
পরিবেশবান্ধব দেশ গড়তে আমরা
 
বদ্ধপরিকর: জ্যাকব
 
উপ-মন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব এমপি পরিবেশ রক্ষায় মন্ত্রালয়ের গৃহীত পদক্ষেপ তুলে ধরে বলেন, দূষণমুক্ত, বাসযোগ্য, সুখী, সুন্দর পরিবেশবান্ধব দেশ গড়তে আমরা বদ্ধপরিকর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব উদ্যোগে ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেছেন এবং কার্যকরী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছেন। এর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে বাংলাদেশ রক্ষা পাচ্ছে।
 
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে উল্লেখ করে বলেন, বন্যপ্রাণী ও অনুকূল পরিবেশ আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। বৃক্ষ ছাড়া পৃথিবীতে বাঁচার চিন্তাই করতে পারি না। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির সফলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, উপকূলীয় এলাকায় বিশাল বনায়নের প্রয়োজন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী উপকূলীয় এলাকায় সবুজ বেষ্টনী স্থাপন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে বনায়ন করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এ জন্য আলোচনা চলছে।
 
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোঃ রইছউল আলম মণ্ডল বলেন, বাংলাদেশ অধিক জনসংখ্যার দেশ। পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ছে। তাই টেকসই পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো পরিবেশবান্ধব করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। প্রধান বন সংরক্ষক মোঃ ইউনুছ আলী বলেন, পরিবেশের ক্ষেত্রে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে দখল হওয়া ভূমি পুনরুদ্ধার করতে হবে। একই সঙ্গে পাহাড় কাটা, প্রাকৃতিক সম্পদের মাত্রাতিরিক্ত আহরণ ও জলাভূমি ভরাট বন্ধ করা প্রয়োজন।
 
‘বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন’
 
পুরস্কার পেয়েছেন তিনজন
 

এ বছর তিনজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ‘বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন’ পুরস্কার পেয়েছেন। পুরস্কারপ্রাপ্ত তিন জনের মধ্যে প্রথম হয়েছেন বন্যপ্রাণী অঞ্চলের প্রাক্তন বন সংরক্ষক তপন কুমার দে। দ্বিতীয় হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ড. নূর জাহান সরকার। তৃতীয় পুরস্কার পেয়েছেন নওগাঁর জীববৈচিত্র্য, বন, বন্যপ্রাণী ও নদী সংরক্ষণ কমিটি (জীবন)’র প্রতিষ্ঠাতা মোঃ ইউনুছার রহমান (হেবজুল)। উল্লেখ্য, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, শিক্ষা ও গবেষণা কাজকে উত্সাহিত করার লক্ষ্যে ২০১০ সাল থেকে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ‘বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন’ চালু করে।