আগস্ট মাস আসলেই এক অজানা আতঙ্ক কাজ করে মনে। কেন জানি এ মাসেই বারবার মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিগুলো রাবণের রূপ ধারণ করে। আগস্টের ১৫, ১৭, ২১ তারিখগুলো সেই নৃশংসতারই চিত্র বহন করে। আবার ১৯৯৬ সালে জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর থেকে বেগম জিয়া যা চর্চা শুরু করেন তা আমাদেরকে প্রচণ্ডভাবে ব্যথিত করে। যে শোকাবহ ঘটনাকে ব্যঙ্গ করতে জন্ম তারিখের এই ভুয়া বিবর্তন, পরিমাপের দিক থেকে তা কারবালার ঘটনাকেও হার মানায়। কারবালাতে আর যাই হোক ছয় বছরের নিষ্পাপ শিশু কিংবা নয় মাসের গর্ভবতী নারীকে বেয়োনেট চার্জ করে হত্যা করা হয়নি।
১৯৭৫ সালেরও এক যুগ পরের প্রজন্ম হিসেবে যত দিনে বুঝতে শিখেছি ততদিনে ৩০টি বছর পেরিয়ে গেছে। বুঝতে শিখলাম বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটিকে আমরা হারিয়েছি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পেলাম আমাদের কপালে পিতা হত্যার কলঙ্কের কালো দাগ, কেননা তখনও পিতা হত্যার বিচার আমরা করতে পারিনি। তখনও বঙ্গবন্ধুর আত্ম স্বীকৃত হত্যাকারীরা বিলাসী জীবন-যাপন করছে বিদেশের মাটিতে। বেগম জিয়া রাষ্ট্র ক্ষমতায় তাই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হবে এই স্বপ্ন দেখারও সাধ্য ছিল না।
সমর্পিত কিশোর বেলার নানা রঙের দিনগুলো যখন বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে কাটানোর কথা তখন আমি থমকে গেছি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু কন্যা, শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টায় নিক্ষিপ্ত হায়না গ্রেনেডের গর্জনে। টেলিভিশনের পর্দায় দেখলাম চারিদিকে লাশ ও হতাহতদের স্তূপ,আমার প্রাণের নেত্রীকে ঘিরে রাখা কিছু রক্তাক্ত নেতা ও কর্মী, রক্ত মাখা ভ্যানিটি ব্যাগ,অবিস্ফোরিত গ্রেনেড,ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নারী-পুরুষের জুতা, ভাঙা কাঁচের চুড়ি, রাজপথে ও ফুটপাথে উপুড় হয়ে পড়ে আছে বাঙ্গালি, এ যেন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে মানবতা।
আইভি রহমান, আদা চাচাদের নিথর দেহ যেন অভিশাপ দিচ্ছিল এই অসভ্যতাকে। শুধু গ্রেনেড নিক্ষেপ করেই ক্ষান্ত হয়নি হায়নার দল। শেখ হাসিনার মৃত্যু নিশ্চিত করতে মুহুর্মুহু গুলি ছুঁড়েছিল তারা। কিন্তু মহান সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে ও দলীয় নেতা-কর্মীদের মানব-বর্ম ভেদ করে ঘাতক বুলেট আমার প্রাণের নেত্রীকে আঘাত করতে পারেনি। তবে তিনি বাম কানের শ্রবণ শক্তি হারিয়েছেন এই হামলায়। যে মহান রাষ্ট্রনায়ক তাঁর সারাটি জীবন এদেশের মানুষের মুক্তির জন্য উৎসর্গ করে গেছেন সেই পিতার কন্যাকে হত্যা করার জন্য এত চেষ্টা! প্রায় ১৯ বার চেষ্টা করা হয়েছে বাঙালির আদরের কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য। সেদিন আমার ক্লাসের খাতায় লিখেছিলাম-
আজ মুষড়ে পড়েছে সমাজ ও মানবতা,
মানবিকতা আজ বিলুপ্ত আর উদ্ধত পাশবিকতা।
না! এ বাংলাদেশ চাইনি আমি।
মৌলবাদ,জঙ্গিবাদ,সন্ত্রাসবাদ,উগ্রবাদ,
সকল 'বাদ'-ই আছে এখানে,নেই শুধু মানবতাবাদ।
বছর ঘুরে আরেক আগস্ট, ২০০৫। মুন্সিগঞ্জ ব্যতীত দেশের সব জেলায় পাঁচ শতাধিক বোমা হামলা। দুই জন নিহত আর দুই শতাধিক আহত। আমার বাংলা মায়ের বুকের উপরে বসে রক্তের হোলিখেলা শুরু করেছিল সরকার মদদপুষ্ট জঙ্গিরা। ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল চট্টগ্রামের সিইউএফএল জেটিঘাটে আটক হওয়া দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান এই জঙ্গিবাদেরই পূর্ব-আলামত।
বহুমুখী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তকে পরাভূত করে শেখ হাসিনা ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় লাভ করে যেদিন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি সচেতন একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার তরুণ প্রাণে আশার সঞ্চার হয়েছিল, মনে হয়েছিল এবার পিতা হত্যা বিচার হবেই হবে। অবশেষে পেলাম পিতা হত্যার বিচার। বাঙালির কপাল থেকে মুছে গেলো কলঙ্কের কালো দাগ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে আমার আদর্শের বাতিঘর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে প্রথম যেদিন গিয়েছিলাম সেদিন আমার হৃদয় জুড়ে চেপে বসেছিল এক বিষাদের পাহাড়, আমার রক্ত শীতল হয়ে আসছিল বঙ্গবন্ধু বিহীন বাড়িটিতে জুড়ে থাকা মহাজাগতিক শূন্যতায়। সেখানে বঙ্গবন্ধুর সাদামাটা জীবন-যাপনের সচিত্র আমার সামনে প্রতীয়মান হয়। অনাড়ম্বর চেয়ার, স্যান্ডেল, বাসন-পত্র আমাকে একজন রাষ্ট্রপতির নয় বরং একজন দুখী বাঙালির সংগ্রামী নেতার কথা বলেছে।
খুব সন্তর্পণে কান পেতে শুনলে শোনা যায় সেই রক্তাক্ত সিঁড়িগুলোর আর্তনাদ,যারা বঙ্গবন্ধুর রক্তের ভার বহন করতে করতে আজ বড়ই ক্লান্ত। বেগম মুজিবের শুভ্র শাড়ি ও পানের বাটা এই ছায়া সুনিবিড় বাড়িটিকে আজও আগলে রেখেছে পরম মমতায়। ছোট্ট রাসেলের কালো কোট,ছাই রঙের জামা,জুতো জোড়া,খেলার ডিউস বল সবই যেন এখনো শিশু রাসেলের জন্য পথ চেয়ে আছে।
শেখ কামালের পিয়ানো,সেতারা আজও সুর খুঁজে বেড়ায় এই লাল-সবুজের বাংলাদেশে। আর শেখ কামালের নবপরিণীতা বঁধু বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র সুলতানা কামালের হাতের মেহেদীর গন্ধ যেন মৌ মৌ করছে শেখ কামালের ঘর জুড়ে। ষাটের দশক থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অ্যাথলেটিক ট্র্যাক দাপিয়ে বেড়ানো সুলতানা কামালের এই নীরব প্রস্থান মেনে নিতে পারে না কোন জাগ্রত বিবেক।
কাঁচের ভেতরে পরম যতনে গুছিয়ে রাখা শেখ জামালের সেনা পোশাক,সে যেন বিপ্লবী বাংলার বিপ্লবী পতাকা। জন্মের পর গোলাপের মত সুশ্রী বলে বঙ্গবন্ধুই যার নাম রেখেছিলেন রোজী,সতের বছর বয়েসে তাঁর বিয়ে হয়েছিল মামাত ভাই শেখ জামালের সাথে। মাত্র ত্রিশ দিনের বিবাহিত জীবন অতঃপর দোতলায় বঙ্গবন্ধুর শোবার ঘরে স্বামী শেখ জামালের সামনেই ঘাতক বুলেটের আঘাতে প্রাণ ত্যাগ। খুব জানতে ইচ্ছে করে প্রাণ ত্যাগের আগে শেষ বারের মত কী স্ত্রী রোজীকে বুকে চেপে ধরে কাঁদতে পেরেছিলেন শেখ জামাল? পারভীন জামাল রোজীর লাল শাড়ী আজও কাঁচের আলমারিতে সাজানো আছে। তবে নব বঁধু রোজীর আবেশ এখনো মাখানো সেই শাড়ীতে।
ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরের বাড়িটির সামনে প্রায়ই যাওয়া হয় নানা প্রয়োজনে। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে কান পাতলে পাখিদের যে ডাক শোনা যায়, সে ডাকে আমি এখনও স্বজন হারানো বেদনার সুর পাই।
সব শেষে তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুরোধ,আসুন এই শোকাবহ আগস্টে শপথ গ্রহণ করি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক দার্শনিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অন্তত ৫ টি গুণকে আমরা প্রত্যেকে ধারণ ও চর্চা করবো। ফলে একটি বঙ্গবন্ধুময় সমাজ পাবো। যে সমাজ হবে বিশ্ববাসীর জন্য অনুসরনীয় ও অনুকরণীয়। বঙ্গবন্ধু একটি আলো, এই আলো প্রত্যেকের হৃদয়ে প্রজ্বলিত হোক, অহর্নিশ এই প্রত্যাশাই করি।
লেখক : শেখ ফয়সল আমীন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।
