নেপথ্যে থেকে বাবাকে সাহায্য করতেন মা :শেখ হাসিনা

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০১৬, ১৭:৩৩
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতির পিতা ও বঙ্গমাতার অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে চাই। এ জন্য সবার সহযোগিতা কামনা করি। মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া বঙ্গবন্ধুর জীবনসঙ্গীনি হিসেবে নেপথ্যে থেকে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অবিস্মরণীয় অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, দেশের মানুষের জন্য নিভৃতে কাজ করতে জাতির পিতাকে সার্বক্ষণিক অনুপ্রেরণা দিতেন বঙ্গমাতা। এই মহীয়সী নারীর দূরদর্শিতা বাংলার স্বাধীনতার পথ খুলে দিয়েছিল। আওয়ামী লীগের তত্কালীন অনেক নেতার আপত্তি সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর সার্বক্ষণিক এই ছায়া সঙ্গী বেগম মুজিবই তাকে (বঙ্গবন্ধু) আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে পাক সামরিক বাহিনী সরকারের সঙ্গে বৈঠকে বসতে নিষেধ করে স্বাধীনতার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বৈঠকে বসলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আসতো না। তাই স্বাধীনতার জন্য বঙ্গমাতার ভূমিকা অবিস্মরণীয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসে বঙ্গমাতা চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন।
 
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছার ৮৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়েজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণেও আমার মা সহযোগিতা করতেন বাবাকে।
 
আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ একশটি ভাষণের অন্যতম বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ওই সময় নানা জনে নানা পরামর্শ দিচ্ছে। আম্মা বললেন, তোমার যা মনে আসে, তাই তুমি বলবে। তুমি রাজনীতি করেছো। কষ্ট সহ্য করেছো। তুমি জান কী বলতে হবে। কারও কথা শোনার দরকার নাই।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু তার জীবনে বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ে বহুবার জেলে গেছেন, জুলুম নির্যাতন সহ্য করেছেন। বাবাকে টানা ২ বছর কারাগারের বাইরে থাকতে দেখিনি। কিন্তু কোনদিন মাকে আক্ষেপ করতে দেখিনি। তিনি স্ত্রী হিসেবে বঞ্চিত ছিলেন। কিন্তু কোনো অভাব অভিযোগ দেখিনি। কোন হা-হুতাশ নেই। তার কাজ তিনি নীরবেই করে গেছেন। 
 
বেগম মুজিবের ধৈর্য, সহনশীলতা ও স্বামীর প্রতি কর্তব্যবোধের কথা তুলে ধরতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার ‘মা’ একাধারে সংসার সামলেছেন, আমাদের লেখাপড়া করিয়েছেন। আবার আদালতে দৌড়াদৌড়ি করে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে সংগঠনের নেতা-কর্মীদের জন্য টাকা জোগাড় করে সংগঠনটাও তাকেই সচল রাখতে হয়েছে। কিন্তু কোনরূপ প্রচারের মধ্যে ছিলেন না। অত্যন্ত প্রচারবিমুখ ছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে দলকে পেছন থেকে নির্দেশনা দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছেন। শেখ হাসিনা আরো বলেন, নিজের জন্য কখনো কিছু চাননি মা। অথচ সারাজীবন এই দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। এ দেশকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। আব্বার সঙ্গে থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন, এদেশের মানুষ ভালো থাকবে, সুখে-শান্তিতে বাস করবে। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাবার পাশে থেকে সে স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করেছেন। শেখ হাসিনা বলেন, আগস্ট মাস, শোকের মাস। আর এ মাসেই আমার ছোট ভাই শেখ রাসেলও জন্মগ্রহণ করেছিল। আবার এই মাসেই আমার পরিবারের সদস্যদের ঘাতকরা গুলি করে হত্যা করে।
 
বঙ্গবন্ধুর জেলে থাকা অবস্থায় ফজিলাতুন নেছা মুজিবের সংগঠন চালানোর কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বিশেষ করে ছাত্রলীগকে তিনি নিজের হাতেই গড়ে তুলতেন। ছাত্রলীগকে সবসময় পরামর্শ দেওয়া তাদের যা কিছু দরকার, তিনিই দেখতেন। সংগঠন চালানোর প্রয়োজনে গহনা থেকে শুরু করে ঘরের ফ্রিজ পর্যন্ত ফজিলাতুন নেছা বিক্রি করেছেন। তিনি বলেন, একটার পর একটা ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে, কিন্তু আমার মাকে কখনই আমি ভেঙে পড়তে দেখিনি। তার মায়ের ছয় দফার পক্ষে অবস্থানের কথা উল্লেখ কেরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মা বলেছিলেন, শুধু এটুকুই বুঝি ছয় দফাই হচ্ছে বাংলার মানুষের মুক্তির সনদ, এটা উনি (বঙ্গবন্ধু) বলে গেছেন, এর বাইরে কিছু মানি না।’ রাজনৈতিকভাবে তিনি যে কত ‘সচেতন’ ছিলেন সেটা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখানেও আমার মায়ের সেই দৃঢ়তা ছিল।
 
বঙ্গবন্ধু জেলে থাকার সময় সেখান থেকে দলের জন্য কিভাবে নির্দেশ নিয়ে আসতেন সে স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মায়ের স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ। আমরা মাঝে মাঝে বলতাম তুমি তো টেপ রেকর্ডার। আমাদের শিখিয়ে নিয়ে যেতেন কারাগারে গিয়ে কি করতে হবে। একটু হৈ চৈ করা, এর মাঝে বাইরের সমস্ত রিপোর্ট আব্বাকে দেওয়া এবং আব্বার নির্দেশটা নিয়ে আসা। এরপর সেটা ছাত্রদের জানানো। 
 
মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান সেলিনা হোসেন, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রেবেকা মোমেন এমপি, জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান অধ্যাপিকা মমতাজ বেগম, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়র সচিব নাসিমা বেগম এনডিসি প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ওপর নির্মিত একটি প্রামাণ্য চিত্র মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে প্রদর্শন করা হয়।
 
ইত্তেফাক/এ এন