তিনি ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব নেই

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০১৬, ১০:২৬
৪৫ বছরের বেশি সময় ধরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে
 
নানাভাবে এঁকেছেন শিল্পী শাহাবুদ্দিন। প্যারিসে টেলিফোনে তার আঁকা
 
বঙ্গবন্ধু বিষয়ে ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে শিল্পীর সাক্ষাত্কার
 
নিয়েছেন— আশফাকুর রহমান
 
ইত্তেফাক: বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আপনার ছবি আঁকার বিষয়টি কীভাবে অনুভব করেন?
 
শাহাবুদ্দিন: বাংলাদেশ হওয়ার আগে থেকেই আমি বঙ্গবন্ধুর ছবি আঁকছি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, প্যারিসে যদি এত বড় ব্যক্তিত্বকে উপস্থাপন না করি তাহলে তো আমার অস্তিত্ব প্রকাশিত হচ্ছে না। ১৯৭৯ সালে প্যারিসে খুব বড় একটা পোট্রেট প্রদর্শনী হয়েছিল। তখন ভাবলাম, এই তো সুযোগ বঙ্গবন্ধুকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার। আমি যাকে ভালোবাসি, যাঁর জন্য বাংলাদেশ, যিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী, বঙ্গবন্ধু তো গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন থেকে নিয়েছিলেন— তো এই বঙ্গবন্ধুকে আমি যদি আধুনিক বিশ্বে পরিচয় করিয়ে না  দেই, তাহলে কে পরিচয় করিয়ে দিবে। এই চিন্তা থেকে ইউরোপে তাঁকে আমার মতো উপস্থাপন করতে গিয়ে ঠিক তাঁর পোট্রেট নয়, পোট্রেট তো অনেকেই ভালো আঁকতে পারে, আসলে অন্তরের ভালোবাসা, তাঁর যে ত্যাগ স্বীকার, আমাদের জন্য তিনি কী চিন্তা করেছিলেন— এটাকে আমি আঁকার চেষ্টার করেছিলাম। এটা আমাকে আজ  অনেক দূর নিয়ে এসেছে। আমার আজকের প্রতিষ্ঠার পেছনে প্যারিসে আমার আঁকা বঙ্গবন্ধুর সেই প্রতিকৃতির অনেক অবদান রয়েছে।
 
ইত্তেফাক: বঙ্গবন্ধুর আঁকা সেই প্রতিকৃতিটি দেখতে কেমন ছিল?
 
শাহাবুদ্দিন: বেশ বড় করে বঙ্গবন্ধুর সেই ছবিটি এঁকেছিলাম। আসলে কী জানো, একজন শিল্পী, কবি, সাহিত্যিকের কোনো কিছু অর্জনের জন্য কোথাও না কোথাও কোনো না কোনোভাবে দীর্ঘদিন লড়াই করতে হয়। অবশেষে সেই শক্তিটি বিরাট আকার ধারণ করে। বিশ্বাস করো, প্যারিসের ওই প্রদর্শনীতে ইউরোপের অনেক নামি-দামি শিল্পীর কাজ ছিল, কিন্তু আমার আঁকা সেই ছবিটি খুবই সমাদৃত হয়েছিল। এর ফলে  আমার আত্মবিশ্বাস আরো বাড়ল। প্রত্যেক শিল্পী যার যার নিজের দেশের প্রতিষ্ঠাতা এঁকেছেন। কেউ লেলিনকে এঁকেছেন, কেউ এঁকেছেন মাও সে তুং। কিন্তু পেইন্টিংয়ে ব্যাপারটা আনা, কারণ ব্যাপারটা কখনো কখনো পলিটিক্যাল হয়ে যায়— বেশ কঠিন কাজ। ধর, আমি আমার মাকে ভালোবাসি। মাদার অ্যান্ড চাইল্ড নিয়ে ছবি, একইভাবে আমি চিন্তা করেছি, তিনি তো আমার বাবার মতো। আমি তো তাঁকে ভালোবাসি। তাঁকে আমি কীভাবে আমার অস্তিত্ব থেকে বাদ দিয়ে  ছবি আঁকব? তিনি ছাড়াতো আমাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। এই যে আমার বাংলাদেশ, বাঙালি, বাঙালি চেতনা, স্বাধীনতা, আমার বাংলা ভাষা— তিনিই তো আমাদের এগুলো দিয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধুকে  বাদ দিয়ে এগুলো কিছু হতে পারে না।
 
ইত্তেফাক:প্যারিসে আপনার আঁকা বঙ্গবন্ধু নিয়ে ছবি প্রদর্শনীর আগে তো বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আঁকা আপনার ছবির প্রদর্শনী হয়েছে?
 
শাহাবুদ্দিন:হ্যাঁ। ১৯৭৬ সালে ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে আমার একক প্রদর্শনীতে জলরঙে আঁকা বঙ্গবন্ধু ছিল। সময়টা ছিল বেশ সংকটের। তবে কেউ ব্যাপারটা এত গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু ১৯৮৩ সালে আমি ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে আমার একক প্রদর্শনী করেছিলাম। ওখানে কিন্তু আমার আঁকা বঙ্গবন্ধুর ছবি প্রদর্শনীতে দিতে দেয়নি। বিরাট ইতিহাস। অবশেষে সেই সময়ে সেই ছবিটি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বাড়িতে নিয়ে যান।
 
ইত্তেফাক:বঙ্গবন্ধুকে আপনি অনেকভাবে এঁকেছেন। মার্চের ভাষণ থেকে শুরু করে ১৫ আগস্ট নিয়ে আছে আপনার আঁকা ছবি...
 
শাহাবুদ্দিন:১৯৭৩ সালে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি জাদুঘরে আমি মোট ১৩টি ছবি দিয়েছিলাম। সেখানে বড় ছবিটি ছিল ৭ মার্চ নিয়ে। ছবিগুলো এখন সেখানে নেই বলে জানি। অনেক খোঁজাখুুঁজি করেছি। আশা করি ছবিগুলো একদিন পাওয়া যাবে।
 
ইত্তেফাক:বঙ্গবন্ধুর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি— তাঁর বহুমাত্রিক আচরণ— আপনি আপনার আঁকায় বিষয়টি নিয়ে নানাভাবে নিরীক্ষা করেছেন। আপনার এ কাজের প্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছু বলতে অনুরোধ করছি।
 
শাহাবুদ্দিন:বৃষ্টি ব্যাপারটি সার্বজনীন। কিন্তু পরিবেশের কারণে বৃষ্টিটা একেক জায়গায় একেক রকম মনে হয়। আমার বঙ্গবন্ধু, আমাদের বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে যে এক করেছিলেন— কিন্তু দেখ, এখন ব্যাপারটা ধরা পড়ছে— আমরা কিন্তু এখন আর এক হচ্ছি না। তিনি যে কীভাবে আমাদের সেই সময়ে এককাতারে এনেছিলেন, এটা আমার কাছে এখন অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। ১৫ আগস্ট নিয়ে আমার যে পেইন্টিংটা যেখানে তিনি শুয়ে আছেন বলে মনে হচ্ছে— এটা আসলে তিনি শুয়ে নেই— এটা হলো এত বড় বট গাছ বড় একটা ভূমিকম্পে পড়ে গেল। একটা বট গাছ তো এমনি এমনিই হয় না।
 
ইত্তেফাক: বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে যে ছবিটি আছে...                     
 
শাহাবুদ্দিন:ওই ছবিটি দেখলে মনে হয়, তিনি দেখতে আসলে শিশুর মতো। এত নির্দোষ চেহারা, না হলে এত বড় মানুষ কাঁদে কী করে? তোমাকে আরেকটা বিষয় বলে রাখি, তুমি ব্যাপারটি হয়ত জান। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি যখন মেলাঘরে ট্রেনিং নিই, তখন আমি চারকোল আর হারিকেনের সলতের কালো কালি দিয়ে চশমা পরা বঙ্গবন্ধুকে এঁকেছি।
 
ইত্তেফাক:আঁকতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর শরীরের অঙ্গভঙ্গির কোন বিষয়টি আপনার কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়?
 
শাহাবুদ্দিন:বিশেষ করে ওনার পোশাকটা। খুব হ্যান্ডসাম দেখতে তো। আর আছে পোশাকে কালো-সাদার ব্যাপারটা। বঙ্গবন্ধুর মোচটা খুব স্পেশাল— খুব চার্মিং। আবার চশমার ফাঁক দিয়ে ওনার যে চাহুনি— সাংঘাতিক।
 
ইত্তেফাক:৪৫ বছরের বেশি সময় ধরে আপনি বঙ্গবন্ধুকে আঁকছেন। তাঁর প্রেরণার ছাপও আছে আপনার কাজে। তাঁর প্রেরণাকে আজকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
 
শাহাবুদ্দিন:১৯৭৫-এ যে ঘটনা ঘটেছে, এমন একটি জিনিস ঘটেছে— বড় ভূমিকম্পের মতো। এতে অনেক জিনিস চুরমার করে দিয়েছে। একে আবার গড়ে তোলা— এই মুহূর্তে যা কিছু হচ্ছে— সবই কিছুই হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কারণে— এটা খারাপ বল বা ভালোই বল। তাঁর কারণেই সবকিছু হচ্ছে— একদল চেষ্টা করছে তাঁকে বাদ দিতে। আরেক দল আমরা যারা বেঁচে আছি। প্রকৃতি এখন আমাদের শাস্তি দিচ্ছে। আমরা বিরাট অন্যায় করে ফেলেছি। আসলে এগুলোর জন্য আমাদের আরো অনেক মূল্য দিতে হবে।
 
ইত্তেফাক: ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুর কোন চরিত্রটি আপনাকে খুব আকর্ষণ করে?
 
শাহাবুদ্দিন: সারাজীবন তিনি জেল খেটেছেন, কোনো দিন ছবি আঁকেননি, গানও গাননি— কিন্তু তিনি চিত্রকলা-সাহিত্য খুব ভালোবাসতেন। আমার জানা মতে, কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের এমন গুণ ছিল না—এত গভীরভাবে ভালোবাসেনি। তিনি বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন— এগুলো ছাড়া সভ্যতা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না।
 
ছবি সৌজন্য: আর্টকন