পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষ আছেন যাদের মৃত্যু হয় না। তারা সর্বজনের স্মরণে ও শ্রদ্ধায় বেঁচে থাকেন। তাদের জন্য প্রতি বছর মৃত্যুদিবসে কেউ কাঁদেন না। শ্রদ্ধাভরে তাদের স্মরণ করেন। তার কীর্তি ও অবদান নিয়ে আলোচনা করেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর ৭৩ বছর পর তাঁর মৃত্যুদিবসে তাঁকে নিয়ে কেউ কি শোক করেন? কাঁদেন? না, এখন কালের অমোঘ নিয়মে শোক নেই, আছে শ্রদ্ধা ও স্মরণ। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরও ৪০ বছর কেটে গেছে। তার প্রিয় পরিজন এখনো তাঁর জন্য কাঁদবেন বৈকি! কিন্তু জাতি করবে তাঁকে সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ। রবীন্দ্রনাথের গানের ভাষায় বলবে,
“মুক্তিদাতা, তোমারও ক্ষমা, তোমারও দয়া
রবে চির পাথেয় চির যাত্রার।”
আমার মতে, (জানি না সুধীজন কি বলবেন?) পনেরোই আগস্টকে তাই জাতীয় শোক দিবস নয়, জাতীয় স্মরণ দিবস (national rememberance day) হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। আমরা যদি বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা বলি, তাহলে বুঝতে হবে, জাতির পিতার মৃত্যু হয় না। ইংল্যান্ডে রাজার মৃত্যু হলে বলা হয়— ‘King is dead, long live the King’ (রাজার মৃত্যু হয়েছে, রাজা দীর্ঘজীবী হোন)। আমরা বলব, শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু হয়েছে। জাতির পিতার মৃত্যু নেই। সুতরাং তার মৃত্যু দিবসও নেই। পনেরোই আগস্ট তাঁর স্মরণ দিবস। এই দিন জাতি তাঁকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে; তাঁর কর্ম ও সাধনার আলোচনা দ্বারা নতুন প্রজন্মকে তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা চালাবে।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন,
“মোর লাগি করিওনা শোক
আমার রয়েছে কর্ম
আমার রয়েছে বিশ্বলোক”
বিশ্বকবির মতো বঙ্গবন্ধুরও রয়েছে বিশাল কর্মযজ্ঞের সাফল্য। সে সাফল্য স্বাধীন বাংলাদেশ। তিনি বিশ্বের শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। তাই তাঁকে অভিহিত করা হয়েছিল বিশ্ববন্ধু হিসেবে। রবীন্দ্রনাথের মতো বঙ্গবন্ধু নিজের কর্ম সাধনার মধ্যেই বেঁচে আছেন। আমরা তাঁকে মৃত বলব কেন? আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে শহীদ বলারও পক্ষপাতী নই। তার একটিমাত্র অভিধাই হওয়া উচিত, চিরঞ্জীব মুজিব। এই ‘মৃত্যুহীন প্রাণের’ মৃত্যু নেই। মৃত্যু হয়নি। আমরা শোক করব কেন? আমরা তাকে স্মরণ করব। তাঁর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার লক্ষ্যে তাঁকে হৃদয়ে ধারণ করব।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের অকালমৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন “এসেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।” বঙ্গবন্ধু সম্পর্কেও এই একই কথাটি প্রযোজ্য। তিনিও সাথে করে এনেছিলেন মৃত্যুহীন প্রাণ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেই মৃত্যুহীন প্রাণই তিনি জাতিকে দান করে গেছেন। তা না হলে ১৫ আগস্টের মহাবিপর্যয়ের পর জাতি আবার শিরদাঁড়া খাড়া করে দাঁড়াতে পারত না। সামরিক অথবা স্বৈরাচারী শাসনের অক্টোপাসে এখনো বন্দী থাকত। তার গৃহবধূ-কন্যার নেতৃত্বে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি আবার ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারত না। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্র ধর্মান্ধতার অভ্যুত্থান ঠেকান যেত না। পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশ একটি অর্ধ তালেবান রাষ্ট্রে পরিণত হতো। নিত্য সংঘাত ও রক্তপাত অব্যাহত থাকত।
বঙ্গবন্ধু টুঙ্গিপাড়ার সমাধিতে শুয়ে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। নইলে পঁচাত্তরের বিপর্যয় থেকে আওয়ামী লীগের আবার উঠে দাঁড়াবার কথা ছিল না। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সকল পুরুষ সদস্য এবং চার জাতীয় নেতা মর্মান্তিক মৃত্যুবরণের পর জাতীয় নেতৃত্বে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, ওই পরিবারের এক গৃহবধূ-কন্যা সেই শূন্যতা দূর করতে পারতেন না। তিনি এতো ষড়যন্ত্র, নিত্য নব হত্যা প্রচেষ্টার মধ্যে বেঁচে থেকে বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের শাস্তি এবং ’৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের পালের গোদাদের জেলে ফাঁসির আসামির সেলে ঢোকাতে পারতেন না। আমেরিকার চোখ রাঙানি, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নিরন্তর চাপ, বিএনপি ও জামায়াতের কাঁধে চড়ে পাকিস্তানের আইএসআইয়ের অবিরাম চক্রান্ত, একটি সুশীল সমাজ, ইউনূস-শিবির এবং একশ্রেণির মিডিয়ায় অব্যাহত বিরোধিতার মুখে এক অসমসাহসী নারী নেতৃত্বের ক্ষমতায় থাকা এবং দেশকে অর্থনৈতিক উন্নতির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো না, যদি তার পেছনে সমাধিতে শুয়েও বঙ্গবন্ধু শক্তি, সাহস ও প্রেরণা না জোগাতেন। এককালে বলা হতো হিমালয় ভারতবর্ষের রক্ষাপ্রাচীর। আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যুগে হিমালয়ের গুরুত্ব কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশ সম্পর্কে যে অধুনা বলা হয় দেশটির অস্তিত্ব, স্বাধীনতা ও সমাজ সভ্যতার তিনটি রক্ষাপ্রাচীর তা সম্ভবত অত্যুক্তি নয়। এই তিনটি রক্ষা প্রাচীর হলো বাংলাদেশের হাজার বছরের লোকায়ত ভাষা ও সংস্কৃতি। রবীন্দ্রনাথ এবং শেখ মুজিব। এই তিনটি রক্ষা প্রাচীরে সাম্প্রদায়িকতা, মধ্যযুগীয় পশ্চাত্মুখী ধর্মান্ধতা এবং মৌলবাদী সন্ত্রাস বার বার আঘাত খাচ্ছে। পরাজিত হচ্ছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো মৌলবাদী সন্ত্রাস রক্ত ঝরাতে পারছে না।
দেশটির গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও সেখানে দাঁত বসানোর চেষ্টা করেও মৌলবাদ সফল হতে পারছে না। আমাদের তথাকথিত সুশীল সমাজ ও একশ্রেণির তথাকথিত নিরপেক্ষ মিডিয়ার এটা চোখে পড়ে না যে, পাকিস্তানে ও আফগানিস্তানে মৌলবাদী জঙ্গিদের দমন করার জন্য যেখানে আমেরিকার বর্বর ড্রোন হামলা ডেকে আনতে হয়েছে; সেখানে বাংলাদেশে হাসিনা সরকার শুধু নিজস্ব প্রশাসনিক শক্তির জোরে বিএনপি-জামায়াতের ছ’মাস ধরে চালানো একটানা ধ্বংসাত্মক সন্ত্রাস মোকাবিলা করেছে এবং দেশে এখন শান্তি বিরাজিত।
আগেই বলেছি, সময় ও কালের ব্যবধানে এই আগস্ট মাসেই তিনজন মৃত্যুঞ্জয় মানুষের তিরোধান দিবস। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও শেখ মুজিব তিনজনই ছিলেন বাঙালি। কিন্তু দেশ ও কালের গণ্ডি অতিক্রম করে তারা হয়েছেন বিশ্বমানব। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি; নজরুল বিদ্রোহী কবি এবং শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধু। বাঙালি পরিচয় বা একই মাসে মৃত্যু তাদের বড় যোগসূত্র নয়; তাদের মধ্যে বড় যোগসূত্র সৃষ্টি করেছিল বিশ্বমানবতা, স্বদেশ প্রেম ও স্বাধিকার- চেতনা।
কিশোর বয়সে স্কুল-টিমের সাথে ফুটবল খেলতে গিয়ে মধুমতী নদীর তীরে বিশ্রাম গ্রহণের সময় দলের কোচ এবং স্কুল-শিক্ষকের কাছে বঙ্গবন্ধু “বাংলার মাটি, বাংলার জল” গানটি শোনেন এবং তাঁর মনে এই গান স্বদেশ প্রেমের অঙ্কুরোদ্গম ঘটায়। তাঁর মনে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চেতনাও সৃষ্টি করে রবীন্দ্রসঙ্গীত। ১৯৫৫ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে থাকার সময় বঙ্গবন্ধুর সাহচর্য পাই (তিনিও তখন কারাবন্দী)। তখন তাঁর মনে রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতার প্রতি অসীম অনুরাগ লক্ষ্য করি। পরবর্তী কালে তিনি নজরুলের কবিতা ও গান দ্বারাও প্রভাবিত হন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সংকট সন্ধিক্ষণে তিনি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের গান ও কবিতা থেকে সাহস ও অনুপ্রেরণা পেতেন বলে স্বীকার করেছেন।
আমার নিজের ধারণা, তাঁর রাজনৈতিক মানস রবীন্দ্র সাহিত্য ও সঙ্গীত দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল। ফলে অবিভক্ত ভারতের রাজনীতিতে সেই চরম সাম্প্রদায়িকতার দিনেও তিনি অসাম্প্রদায়িকতা ও সেক্যুলার জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকেছিলেন। প্রথম যৌবনে মুসলিম লীগ রাজনীতিতে যোগ দিলেও তিনি ছিলেন বঙ্গীয় মুসলিম লীগের প্রগতিশীল হাশিম-সোহরাওয়ার্দী গ্রুপে।
পাকিস্তান আমলে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি মওলানা ভাসানীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে মুসলিম শব্দটি বর্জন করে আওয়ামী লীগকে অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে অন্যতম রাষ্ট্রাদর্শ হিসেবে যুক্ত করেন। দেশটির ‘বাংলাদেশ’ নাম হারিয়ে গিয়েছিল। তিনি তার পুনর্জীবন ঘটান এবং রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করেন।
বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিলেন। এই সোনার বাংলা নামটিও রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে চয়ন। আসলে বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিলেন তা রবীন্দ্র ভাবিত বাংলাদেশ। এই ভাবনার রক্ষাপ্রাচীর এখনো বাংলাদেশের স্বাধীন গণতান্ত্রিক ভিত্তির মূল শক্তি। এই ভিত্তি সমূলে ভাঙা কোনো ধর্মান্ধ চক্রের পক্ষে সহজ নয়, সম্ভব নয়।
রবীন্দ্রনাথের পরিচয় পোয়েট অব ইউনিভার্স বা বিশ্বকবি। বঙ্গবন্ধুকে লন্ডনের একটি কাগজে বলা হয়েছে পোয়েট অব পলিটিক্স, রাজনীতির কবি। আমাদের স্বাধীনতার নেতা একজন রাজনৈতিক কবি ছিলেন এবং তাঁর সংগ্রাম ও সাধনার উত্স ছিল রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল এই দুই কবির কাব্য ও সঙ্গীত। প্রতি ১৫ আগস্টের স্মরণ দিবসে এই সত্যটি আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং গর্বভরে এই কথাটি উচ্চারিত হওয়া প্রয়োজন, আমাদের জাতির পিতা ছিলেন এ গ্রেট পোয়েট অব পলিটিক্স।
লেখক: বরেণ্য সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও ভাষাসংগ্রামী
