বঙ্গবন্ধু আজ যদি থাকতেন, আশা করি কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাস্তবায়িত হতো। তিনি সেই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনের শুরুতেই বুঝতে পেরেছিলেন জাতিকে সঠিক দিশা দেওয়ার জন্য অবশ্যই একটা সঠিক শিক্ষানীতি দরকার। তার আলোকেই তিনি বিজ্ঞানী কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে দ্রুত শিক্ষা কমিশন তৈরির প্রস্তাব দেন। তারা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা অনুযায়ী স্বল্পতম সময়ে এই রিপোর্ট পেশ করেন। ১৯৭৪ সালে সেই কমিশনের রিপোর্ট বঙ্গবন্ধু হাতে পেয়ে বলেছিলেন, ‘খুব দ্রুতই এর বাস্তবায়ন হবে।’ আমাদের আফসোস, তার আর সময় তিনি পাননি। এরপর থেকে কার্যত একটি শিক্ষানীতির জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ৩৫ বছর, তারই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালে আমাদের শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন। একটা জাতি কীভাবে এগোবে, যেখানে তার একটা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষানীতিই ছিল না! আমি নিশ্চিত বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে এভাবে চলতে দিতেন না। তিনি দশ বছরের মধ্যেই এর বাস্তবায়িত রূপ দিয়ে যেতে পারতেন জাতিকে। তাকে থামিয়ে দিয়ে মূলত তো এ জাতির অগ্রযাত্রাকে রোধ করে দেওয়া হলো।
বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার কিছুদিন পরপরই প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করে সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসেন। এর ফলে সবার জন্য অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত হয়। তিনি ছেলেমেয়ে সবার জন্য সেই শিক্ষার সমান সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন। সরকারি চাকরিতে মেয়েদের যথাযথ সুযোগ দানের লক্ষ্যে তিনি কোটার ব্যবস্থা করে দেন। যা কার্যত দেশে নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। পাশাপাশি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে তাদের কাজের স্বাধীনতা দেন, তিনি বলেছিলেন, ‘শিক্ষকদের জবাবদিহিতা থাকবে বিবেকের কাছে।’ দেশের প্রয়োজনে জাতির প্রয়োজনে তিনি একাধিক প্রকল্প হাতে নেন এবং সেই মাফিক অনেক নতুন বিভাগও খোলা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। উচ্চশিক্ষাকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি।
বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর রূপরেখা করেছিলেন। পাশাপাশি বিপুল জনসংখ্যার কথা ভেবে তিনি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রবর্তন করেন। কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে এর বিস্তৃতি দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে তিনি বিভিন্ন মহলে নির্দেশনা দেন। মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি বৃত্তির ব্যবস্থা করে উত্সাহ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি ভবিষ্যত্ প্রজন্মের বেড়ে ওঠায় যা দরকার তা চিন্তা করতেন, সেই মাফিক অভিজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে বিভিন্ন পরিকল্পনাও প্রণয়ন করতেন।
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আসলেই আমরা শিক্ষাক্ষেত্রসহ অনেক ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে পড়ি। বারবার চেষ্টা করা হয়েছে সেই অবস্থা থেকে উত্তরণের। বর্তমান সরকারও একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতির আলোকে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এখন আমরা আশা করছি, বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নের আলোকে নতুন শিক্ষানীতি অনুসরণ করে আমরা আগামীদিনে সমৃদ্ধ এক জাতি পাব। নতুন প্রজন্মের দিকেই সবাই চেয়ে থাকে, আমিও আশাবাদী—তারাই উপহার দেবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ।
লেখক : উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
