তাঁকে বাঁচাতে পারিনি

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০১৬, ১৪:২৬
 
১৫ আগস্ট সকাল ৬টার দিকে গণভবনের ফখরুল ইসলাম নামে এক নিরাপত্তা কর্মকর্তার কাছ থেকে একটি ফোন পাই। ওই সময় আমি রাষ্ট্রপতির এডিসি হিসেবে বঙ্গভবনে কাজ করি। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনি কি জানেন কী ঘটছে?’ আমি অজ্ঞতা প্রকাশ করলে তিনি বলেন, ‘গণভবনের সামনে দিয়ে মিরপুর ও ধানমন্ডি রোডের দিকে ট্যাংক বহর এগোচ্ছে। কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। দয়া করে একটু খবর নিন।’ এরপর আমি রাষ্ট্রপতির অপর এক সিকিউরিটি অফিসার মহসীনকে ফোন করি। তিনিও জানালেন, ‘বন্দুক যুদ্ধ, ট্যাংক চলা এবং রাইফেলের গোলাগুলির ভীষণ শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।’ ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে বলে তিনি আশঙ্কা করেন।
 
এসব শোনার পর বিচলিত হয়ে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব ব্রিগেডিয়ার মাশহুরুল হককে ফোন করি। তিনি আমাদের সঙ্গে বঙ্গভবনেই থাকতেন। আমি যা শুনেছি, তা তাঁকে জানাই এবং বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে কী ঘটছে, তা স্বচক্ষে দেখা আমাদের উচিত বলে জানালে তিনি তাত্ক্ষণিকভাবে রাজি হয়ে যান। পরবর্তীতে নৌবাহিনীর অপর এ.ডি.সি. লেফটেন্যান্ট গোলাম রব্বানী, যিনি আমার পাশের কক্ষেই থাকতেন, তাঁকেও ব্যাপারটা বলি। তিনিও বঙ্গবন্ধুুর বাসভবনে যাওয়ার ব্যাপারে উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। এর মধ্যে আমরা বেশ কয়েকবার বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ফোন করে সংযোগ স্থাপনে ব্যর্থ হই।
 
পরিবহন ছাউনি থেকে কিছুটা বিলম্বে হলেও একটি ভক্সওয়াগন গাড়ি সংগ্রহ করে বঙ্গবন্ধুর আবাসস্থল ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের উদ্দেশে আমরা রওয়ানা দিই। আমরা একটা ভিন্ন পথ অনুসরণ করে কিছুক্ষণের মধ্যেই সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় পৌঁছে যাই। আমরা ইচ্ছাকৃতভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ঘুরে যাই। যেখানে কয়েকঘণ্টা পরেই একটি অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর আসার কথা ছিল। উদ্দেশ্য ছিল সেখানে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না তা স্বচক্ষে দেখে যাওয়া।
 
বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে এগোতে থাকি। কিন্তু কিছুদূর যেতে না যেতেই ধানমন্ডির বর্তমান ২নং রোডের মাথায় কালো পোশাক পরিহিত কতগুলো লোকের দ্বারা আমরা বাধাপ্রাপ্ত হই। আমরা বেসামরিক পোশাকে থাকায় সেনাবাহিনীর কিছু জোয়ান আমাদের গাড়ি আটকে পরিচয় ও গন্তব্য জানতে চায়। নিজেদেরকে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত স্টাফ বলে পরিচয় দিলে তারা আমাদেরকে যেতে দেয়।
 
এরপর আমরা কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টার বরাবর পৌঁছামাত্রই কিছু উচ্ছৃঙ্খল সৈনিক আমাদেরকে প্রতিরোধ করে। আমাদের গাড়ি থামিয়ে তারা বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে অগ্রসর হতে নিষেধ করে এবং তারা যে ইতোমধ্যেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে তাও জানায়। তারা আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। পরবর্তীতে তাদের কেউ কেউ আমাদেরকে চিনতে পারে এবং অফিসার হিসেবে আমাদের পরিচয় নিশ্চিত হলে তারা যেতে দেয়।
 
সামান্য কিছু দূর যেতে না যেতেই কলাবাগান এলাকায় কালো পোশাক পরিহিত আরও কিছু সৈনিক আমাদেরকে আবার থামিয়ে দেয়। এ সময় তারা আরও বেশি উগ্র ও আক্রমণাত্মক ছিল। তারা আমাদেরকে গাড়ি থেকে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে ফেলে। পরিচয় দিলে তারা আমাদেরকে বিশ্বাসঘাতক, গাদ্দার বলে অভিহিত করে এবং আমাদেরকে তখনি হত্যা করা উচিত বলে জানায়। এরপর শুরু হয় আমাদের উপর লাঞ্ছনা। এরমধ্যে আমরা একটু খাবার পানি চাইলে তাদের মধ্যে একজন বলে ওঠে এদের পেশাব খাওয়াও। তারা আমাদের তিন জনকে এমন একটি দল হিসেবে চিহ্নিত করে, যারা নাকি বঙ্গবন্ধুকে রক্ষার জন্য এগিয়ে যাচ্ছিল। বঙ্গবন্ধুকে যে হত্যা করা হয়েছে, তার কিছুই যে আমরা তখনো জানি না বা শুনেও বিশ্বাস করিনি তা জেনে তারা দারুণভাবে বিস্মিত হয়। অবশ্য আমরা তাদের সঙ্গে থাকা রেডিও ট্রানজিস্টারে এক ঘোষণায় তখনই প্রথম শুনলাম, ‘আমি মেজর ডালিম বলছি, শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে’ ইত্যাদি। আমরা ওই ঘোষণা বিশ্বাস করতে পারিনি।
 
আমাদের গন্তব্যস্থল যখন বঙ্গবন্ধুর বাড়ির অতি নিকটে এবং সেখানে পৌঁছার জন্য যখন ব্যারিকেডটি উঠিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ এবং পীড়াপীড়ি করছিলাম, তখন ওই সেনারা বিরক্ত ও চরম উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং যখন তারা জানতে পারে যে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে পৌঁছার জন্য এটা ছিল আমাদের তৃতীয় প্রচেষ্টা, তখন তারা আমাদের চোখ বেঁধে ফেলে এবং কোমরে দড়ি দিয়ে হাত বেঁধে মাটিতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা শুইয়ে রাখে। ইতোমধ্যে কর্ণেল ফারুক রহমান, মেজর নূর চৌধুরী ও আরও কিছু সেনা অফিসার এদিক দিয়ে কয়েক বার যাতায়াত করেন এবং তাদেরকে আমাদের অবস্থান ও বঙ্গবন্ধুর বাসায় পৌঁছানোর চেষ্টার কথা জানানো হয়। সবকিছুতেই অসত্য কথন দিয়ে তাদের বোঝানো হচ্ছিল যে, আমরা তাদের প্রতিপক্ষ। আমার কাছে গুলি ভর্তি রিভলবার থাকায় তারা আমাকে এই দলের মূল হোতা বলে গণ্য করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। রিভলবারটি অবশ্য রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিবের ছিল এবং তা বঙ্গভবন থেকে আসার সময় আমার হাতে রাখতে বলা হয়েছিল। যাই হোক, এর মধ্যে তারা আমাদেরকে হত্যা করে পাশের লেকের পানিতে ফেলে দেওয়ার জন্য একাধিক উদ্যোগ নেয়। কিন্তু অলৌকিক কারণে সেই দিন আমাদের জীবন রক্ষা পায়। এ ঘটনার বিবরণ এন্থনি ম্যাসকারেনহাসের লিখিত ‘Bangladesh : A Legacy of Blood’ নামক বইয়ের ৭৭ পৃষ্ঠার তৃতীয় অনুচ্ছেদে এবং বাংলা অনুবাদ ‘বাংলাদেশ :রক্তের ঋণ’ বইয়ের ৯৪, ৯৫নং পাতায় এভাবে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের এক ভগ্নিপতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর শহীদউল্লাহ ওই দিন আমাদের এই করুণ অবস্থা স্বচক্ষে দেখেছিলেন।
 
আমাদের চোখ বাঁধা থাকায় একমাত্র আল্লাহই জানতেন তখন কী ঘটেছিল। এমন চোখ বাঁধা অবস্থায় আমাদেরকে একটা জিপে করে দুপুর ১টার দিকে গণভবনে পাঠানো হয় এবং সেখানে একটি কক্ষে বন্দি করে রাখা হয়। দিনটি ছিল শুক্রবার এবং সে কারণে গণভবনের মসজিদে নামাজ আদায় করার লক্ষ্যে প্রহরারত সৈনিকদের আমরা অনুরোধ করি। তারা আমাদের নামাজ পড়ার সুযোগ দেয়। এরপর সন্ধ্যার দিকে গণভবনের Comptroller, যিনি আমাদের পূর্ব পরিচিত ছিলেন, তিনি একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দেন। প্রহরারত ক্লান্ত গার্ডদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আমরা ওই গাড়িতে রাতের অন্ধকারে বঙ্গভবনে ফিরে আসি।
 
বঙ্গভবনে এসে দেখি আমাদের পদে নতুন অফিসারদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং অফিসারগণ দায়িত্ব বুঝেও নিয়েছেন। নবগঠিত সরকারের লোকজন তখন আমাদেরকে প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। এক সপ্তাহের মধ্যেই আমরা নতুন পোস্টিং অর্ডার পাই এবং আমরা যখন নতুন পদে যোগদানের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, ঠিক তখনি অভ্যুত্থানকারীদের তরফ থেকে জানানো হয় যে, আমাদের নতুন পদায়ন পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। বঙ্গভবনের বিশেষ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলো সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য বিশেষ ধরনের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়, যা কিনা নতুন এসব অফিসারদের ছিল না। এসব অনুষ্ঠানাদি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য তারা আমাদের পোস্টিং অর্ডার স্থগিত করে। তবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর জনাব আবু সাদত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলে আমরা আমাদের স্বাভাবিক দায়িত্ব পুনঃগ্রহণ করতে পারলেও এর পূর্বের আড়াই মাস বঙ্গভবনের কোনো অনুষ্ঠান বা সভাস্থলে আমাদের আগের মতো অবাধ প্রবেশ ও উপস্থিতি একেবারে নিষিদ্ধ ছিল।
 
ওই কালো দিনটিতে কর্নেল জামিল ছাড়াও আমরা রাষ্ট্রপতির আরও তিনজন ব্যক্তিগত স্টাফ সর্বপ্রকার ভয়ভীতি ও দ্বিধার ঊর্ধ্বে থেকে কর্তব্যের ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম। আমরা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর কাছে পৌঁছানোর জন্য বারবার চেষ্টা করেও অসম শক্তির মহড়ায় ব্যর্থ হই। শুধু ভাগ্যের লিখন ও অলৌকিক কারণে ওই দিন আমরা বেঁচে গিয়েছিলাম।
 
আমাদের মধ্যে তিনজন বঙ্গভবন থেকে এবং কর্নেল জামিল গণভবন থেকে আসছিলেন। যদি আমরা খুব ভোরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি পৌঁছাতে পারতাম, তা হলেও আমরা বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে পারতাম না, কারণ আমরা অস্ত্রহীন ছিলাম। উল্লেখ্য যে, ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের নামে কোনো অস্ত্র বরাদ্দ থাকে না।
 
একটা ব্যাপার নিশ্চিত ছিল যে, বঙ্গবন্ধু যদি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বঙ্গভবন বা গণভবনে থাকতেন, তাহলে সামরিক অভ্যুত্থান কৃতকার্য হওয়া কষ্টসাধ্য হতো। ৩২নং বাড়ির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট ঢিলেঢালা ছিল। বছরের পর বছর (১৯৭২-১৯৭৫) এদিকে নজর না দেওয়া অবশ্যই আমাদের ব্যর্থতা ছিল। যদিও তখন প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তথাপি আমার যতদূর মনে পড়ে তাদেরকে ৩২নং রোডে নিয়োজিত করা হয়নি। বাড়িটি তখনো সামরিক অভ্যুত্থানে জড়িত ২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারির প্রহরাধীন ছিল। বিচিত্র! অবাক হওয়ার মতো একটি বিষয়। আর আমরা কিছুই আঁচ করতে পারলাম না।
 
যেহেতু সেনাবাহিনী এই সামরিক অভ্যুত্থানে জড়িত ছিল না, সেহেতু পুরো সেনাবাহিনী ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে পড়েছিল। বরং সেনাবাহিনী আড়াই মাস সময়ের মধ্যে অভ্যুত্থানকারীদের স্থানচ্যুতি করে দিয়েছিল। সুতরাং সেনাবাহিনীকে কোনোভাবেই উক্ত সামরিক অভ্যুত্থানের জন্য দায়ী করা যাবে না। কিন্তু সেনাবাহিনীর সিনিয়র কমান্ড কর্তৃক ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড ঘটার পর, ঘটনাস্থলে যাওয়া সকলেরই আকাঙ্ক্ষিত ছিল। ঘটনার পর, স্থানীয় সেনা অধিনায়ক ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং সেনাবাহিনী পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছিল। যেকোনো বিবেচনায়ই এটা ছিল একটি চরম ব্যর্থতা।
 
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা