দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলছে জঙ্গি তত্পরতা। নানা কৌশলে এই তত্পরতা চলছে। জঙ্গি অভিযানে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন আলামত থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত হয়েছে, জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িতদের বেশিরভাগই আগে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত ছিল।
বর্তমান সরকারের সময়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোণঠাসা হয়ে পড়ে শিবির। তাই তারা কৌশল পাল্টে বিভিন্ন ছাত্রকল্যাণ সমিতি, জেলা সমিতি, এনজিওসহ বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। আর এদের লক্ষ্য একটাই, যেকোনো মূল্যে বর্তমান সরকারকে উত্খাত করা।
গুলশান হামলার অন্যতম মাস্টার মাইন্ড মারজান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের ছাত্র ছিলেন। এই তথ্য জানার পর চট্টগ্রাম পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার নেতৃত্বে আরবি বিভাগে একটি জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে একটি কম্পিউটার উদ্ধার করা হয়। এটির পাসওয়ার্ড ছিল আরবিতে। এটা দেখে সন্দেহ হয় ওই কর্মকর্তার। পরে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ এনে এর পাসওয়ার্ড ভেঙে কম্পিউটারটি খোলা হয়। খোলার পর অনেকটা ‘থ’ বনে যান কর্মকর্তারা।
সেখানে দেখা গেছে, শিবিরের সারাদেশের নেতাদের ডাটাবেজ রয়েছে। এছাড়া তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং কর্মপরিকল্পনাও দেওয়া রয়েছে। এতে নেতা-কর্মীদের নাম-ঠিকানা, ই-মেইল আইডি এবং ফোন নম্বর রয়েছে। এতে দেওয়া নির্দেশনায় বলা আছে, বর্তমান সরকারের সময়ে নানা কৌশলে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। যেকোনভাবেই সরকারকে উত্খাত করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খ?ান কামাল জঙ্গিবাদে শিবিরের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে অনেক দিন থেকেই কথা বলে আসছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জঙ্গিগোষ্ঠীই বিভিন্ন নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের চেষ্টা করছে। জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িতদের প্রায় সবাই শিবির করতো। পরে একেক সময় এরা একেক নামে জঙ্গি তত্পরতা চালাচ্ছে।
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা নিশ্চিত হয়েছে, যারা জঙ্গিবাদে জড়িত তারা সবাই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অথবা যুক্ত রয়েছেন। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা তাদের প্রধান টার্গেট। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য তারা কৌশলে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এসব কার্যক্রম অনেক সময় কর্তৃপক্ষের নজরে আসে না।
এদিকে জঙ্গি তত্পরতা ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। সেই সঙ্গে ক্লাস রুমে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রয়েছে কঠোর অবস্থানে।
তরুণরা একদিন গড়ে তুলবে সোনার বাংলাদেশ। প্রত্যাশা তো ছিল এমনই। কিন্তু হঠাত্ই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। গুলশান, শোলাকিয়া কিংবা কল্যাণপুর। প্রমাণ মিলে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণদের সম্পৃক্ততা। এ অবস্থায় জঙ্গি তত্পরতা ঠেকাতে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়ানো হয় বিশেষ নজরদারি। নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরির পাশাপাশি নির্দেশনা দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির ব্যাপারে। যার প্রভাবও পড়েছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।
সরকারের এমন নির্দেশনা বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ক্লাসের পাশাপাশি হলেও বাড়ানো হয়েছে বাড়তি নজরদারি। শিক্ষাবিদরা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়লে, তা সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ক্লাসে পড়ালেখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সংস্কৃতি ও খেলাধুলা চর্চার প্রতি তাগিদ দেন বিশ্লেষকরা।
গুলশান হলি আর্টিজানে ঘটনার পর অধিকাংশ সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে থাকার বিষয়টি বেরিয়ে আসে। ইতোমধ্যে জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িত থাকায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্নি চিকিত্সক ডা. ইসতিনা আকতার ঐশি গ্রেফতার হন। সম্প্রতি ঢাকা শিশু হাসপাতালের চিকিত্সক ডা. রোকনউদ্দীন সপরিবারে জঙ্গিদের সহায়তায় বিদেশে পাড়ি জমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের কন্যা দীর্ঘদিন নিখোঁজ রয়েছেন।
এসব ঘটনার পর ধারণা করা হচ্ছে দেশের সরকারি-বেসরকারি সকল মেডিক্যাল কলেজ ও নার্সিং ইনস্টিটিউটে জেএমবি মতাদর্শী রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জিহাদি বই উদ্ধার করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, চলতি বছরে ভর্তির সময় খোঁজ-খবর নেওয়া হবে। যাতে করে জঙ্গি মতাদর্শীরা সুযোগ না পায়। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি সকল মেডিক্যাল কলেজ ও নার্সিং ইনস্টিটিউটে নজরদারি বাড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জঙ্গিবাদ ঠেকাতে সারাদেশে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কার্যক্রম থাকা দরকার। যাতে করে তারা সহজে এসব বিষয় মনিটর করতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশে এটা আছে। আমাদের দেশে এই ধরনের একটি ইউনিট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে। জঙ্গি কার্যক্রম নিয়ে একেক গোয়েন্দা সংস্থা একেক রকম তথ্য দেয়। তাদের মধ্যে সমন্বয়ের বড় ঘাটতি রয়েছে। এতে জঙ্গি কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে একাধিক কর্মকর্তা জানান। শুধু জঙ্গি নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করবে এমন দায়িত্ব একটি সংস্থাকে দেওয়া উচিত।
পুলিশের আইজি একেএম শহীদুল হক বলেন, আমরা দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খোঁজ-খবর নিচ্ছি। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নজরদারিতে রয়েছে।
