ব্যাংকে টাকা রেখে লোকসান গুনছেন ব্যবসায়ীরা

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০১৬, ০৪:২৬
 
ব্যাংকে টাকা রেখে আমানতকারীরা লাভবান হতে পারছেন না। বরং লোকসানে পড়ছেন। আমানতের বিপরীতে ব্যাংকগুলো বর্তমানে যে হারে সুদ দিচ্ছে তা মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম। তাই ব্যাংকে টাকা রাখলে আমানতকারীদের রিয়াল রেট অব রিটার্ন বা প্রকৃত প্রাপ্তি (সুদের হার থেকে মূল্যস্ফীতির হার বিয়োগ) ঋণাত্মক হয়ে পড়ছে। যার অর্থ হচ্ছে এক বছরে ব্যাংকে সঞ্চিত টাকার ক্রয়ক্ষমতা যতটুকু কমছে ততটুকু সুদ পাচ্ছেন না আমানতকারী।
 
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী (৩০ জুন) ব্যাংকিং খাতে আমানতের গড় সুদ হার ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অর্থাত্ দশ হাজার টাকা আমানত রাখলে আমানতকারী বছরশেষে সুদসহ পাবেন ১০ হাজার ৫৫৪ টাকা। গত এক বছরের গড় মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তাই আমানতকারী ব্যাংকে এক বছর টাকা রেখে সুদসহ যে ১০ হাজার ৫৫৪ টাকা পেলেন তা নিয়ে বাজারে গেলে তিনি আগে দশ হাজার টাকা দিয়ে যা কিনতে পারতেন এখন তা কিনতে পারবেন না। বরং তাকে পকেট থেকে আরো টাকা দিতে হবে। আমানতের সুদের উপর ধার্যকৃত কর বিবেচনায় নিলে লোকসানের অংকটা আরো বাড়বে। জানা গেছে, আমানতকারী যে সুদ পায় তা থেকে কর বাবদ ব্যাংকগুলো ১০ শতাংশ কেটে নেয়। আর ইটিআইএন (ইলেকট্রনিক ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার) না থাকলে কেটে নেয় ১৫ শতাংশ।
 
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে বিনিয়োগের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে পারছে না। ব্যাংকে প্রচুর অলস অর্থ পড়ে আছে। তাই তারা আমানত নিতে চাইছে না। এ অবস্থায় দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে না পারলে ব্যাংকিং খাতে ভয়ানক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে সঞ্চয়কারীরা ব্যাংক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। যা ব্যাংকিং খাতের জন্য নেতিবাচক দিক বয়ে আনবে। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পাল বলেন, ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের যে পরিমাণ ঋণ নেওয়ার কথা ছিল তা নেয়নি। তাছাড়া দেশে বিনিয়োগ বাড়লেও তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। ফলে ব্যাংক ব্যবস্থায় অতিরিক্ত তারল্য জমা হয়েছে। এজন্য ব্যাংকগুলো আমানত নিরুত্সাহিত করতে সুদ কমিয়ে দিয়েছে। এটা নতুন কিছু নয়, অর্থনীতিতে কখনও কখনও এটা হতে পারে। ব্যাংকে টাকা রেখে লোকসান হলেও আমানতকারীরা কেন ব্যাংকে টাকা রাখছেন এমন প্রশ্নের জবাবে ড. বিরূপাক্ষ পাল বলেন, আমাদের দেশের ৭০-৮০ ভাগ মানুষই রিয়াল রেট অব রিটার্ন সম্পর্কে জানেন না। তাই তারা ব্যাংকে টাকা রাখছেন। তাছাড়া অনেকে নিরাপত্তার জন্যও ব্যাংকে টাকা রাখেন।
 
লোকসান হলেও কেন ব্যাংকে টাকা রাখছেন তা জানতে চাইলে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের আমানতকারী বেলাল হোসেন বলেন, ব্যাংকে টাকা রাখলে বছরশেষে কিছু সুদ পাবো তা জানি। সুদ পেলেও টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় লোকসান হচ্ছে এ বিষয়ে কখনও ভাবিনি।
 
আমানতের বিপরীতে রিয়াল রেট অব রিটার্ন বা প্রকৃত প্রাপ্তি ঋণাত্মক হয়ে যাওয়ার বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি এম মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদ হার যেভাবে কমছে এভাবে চলতে থাকলে ব্যাংকে মানুষ টাকা রাখতে চাইবে না। বরং তারা পুঁজিবাজার বা অন্যদিকে দিকে ঝুকবে। ব্যাংকিং খাতের এ পরিস্থিতির সমাধান সম্পর্কে ড. মির্জ্জা আজিজ বলেন, দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হলে এমনিতেই আমানতের চাহিদা বাড়বে। তখন ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে বেশি সুদ দিতেও আগ্রহী হবে। তাই বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
 
উদ্যোক্তারা বলছেন, এমনিতেই দেশে অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। রাজনৈতিক দুশ্চিন্তাও শেষ হয়ে যায়নি। তার উপর সুদের হার  অনেক বেশি। এ বিষয়গুলো সমাধান করতে হবে। তবেই বিনিয়োগ বাড়বে। রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা লতিফ ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরিফ হোসেন বলেন, বাংলাদেশে অবকাঠামোগত সমস্যা দীর্ঘদিনের। এর মধ্যেই উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করছেন। তবে ঋণের উচ্চ সুদ হার গত কয়েক বছর বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতো সুদ দিয়ে ব্যবসা চালানো সম্ভব নয়। ব্যাংকগুলো আমানতের সুদ কমিয়েছে ঠিকই কিন্তু সেই হারে ঋণের সুদ কমায়নি।
 
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত আমানতের সুদ কমলে ধীরে ধীরে ঋণের সুদও কমে আসে। কিন্তু আমাদের দেশে যে হারে আমানতের সুদ কমানো হয়েছে সে হারে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ কমায়নি। তাই ২৫টি ব্যাংকের স্প্রেড (আমানতের সুদ ও ঋণের সুদের পার্থক্য) এখনও ৫ শতাংশের বেশি। এ ব্যাংকগুলোকে ঋণের সুদ কমানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে।
 
রিয়াল রেট অব রিটার্ন ঋণাত্মক হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)- এর চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান বলেন, এটা সত্য যে, আমানতকারীরা এখন ব্যাংকে টাকা রেখে লোকসানে পড়ছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি আরো কিছু দেশে হয়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর হাতে অনেক টাকা রয়েছে। তাই আমানতের সুদ কমে গেছে। এখন মানুষ শুধু ব্যাংকে টাকা না রেখে অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করতে পারে। এজন্য পুঁজিবাজার বা ডেরিভেটিভস মার্কেটকে স্থিতিশীল করতে হবে। তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশে এতোদিন আমানতের উপর যে উচ্চ সুদ ছিল তা অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি ছিল। তাই ঋণের সুদও বেশি রাখতে হতো। এখন আমানতের সাথে সাথে ঋণের সুদও কমানো হয়েছে। এরপরও অনেক ব্যাংকের স্প্রেড ৫ শতাংশের বেশি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের দেশে ৯-১০ শতাংশ হয় খেলাপি ঋণ। এই বোঝা কে বহন করবে। খেলাপি ঋণের কারণেই স্প্রেড কমানো যাচ্ছে না।