রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) বাদে দেশের বাকী এলাকার শ্রমিকদের জন্য ২০০৬ সালের (২০১৩ সালে সংশোধিত) শ্রম আইন রয়েছে। কিন্তু ইপিজেড এলাকার শ্রমিকদের জন্য নতুন একটি আইন করতে যাচ্ছে সরকার। আইনটি এখন মন্ত্রিসভা কমিটিতে রয়েছে। ইপিজেডের জন্য প্রস্তাবিত আইনের সঙ্গে দেশের বিদ্যমান শ্রম আইনের বেশকিছু অসঙ্গতি রয়েছে বলে মনে করছেন শ্রমিক নেতারা। তারা মনে করছেন, প্রস্তাবিত আইনে শ্রমিকদের অধিকার খর্ব করা হয়েছে। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে সংগঠনের হওয়ার সুযোগ খর্ব করা হয়েছে। চাকরি থেকে পদত্যাগ, বরখাস্ত করার ক্ষেত্রে শ্রমিকদের সার্ভিস বেনিফিট পাওয়ার কোন সুযোগও ইপিজেড শ্রম আইনে নেই। বেশকিছু ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত আইনে আইএলও’র (আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা) নীতিমালাও মানা হয় নি। এ ধরনের বেশকিছু অসঙ্গতি তুলে ধরে সমপ্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিল্স) মন্ত্রিসভা কমিটিতে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রিসভা কমিটি ইস্যুটি পর্যালোচনার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।
বিল্স এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ইপিজেডে শ্রমিকদের জন্য নতুন আইন করা হলে এটি হবে এক দেশে দুই আইন। ফলে ইপিজেড শ্রমিকরা বৈষম্যের শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে আইএলও’র নীতিমালাও মানা হচ্ছে না। অন্যদিকে আইনটি নিয়ে শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গেও কোন ধরনের আলোচনা করা হয় নি। এসব অসামঞ্জস্যতা আমরা মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে তুলে ধরেছি। আমরা মনে করি এক দেশে দুই আইন করার প্রয়োজন নেই। বিদ্যমান শ্রম আইন ইপিজেডে বাস্তবায়ন করা উচিত।
বিল্স এর পাঠানো ওই পর্যালোচনাপত্রে বলা হয়, দেশের বিদ্যমান শ্রম আইনের ১৭৬ ধারায় শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু ইপিজেডের শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রিতভাবে শ্রমিক কল্যাণ সমিতি করার কথা বলা হলেও সমিতি গঠন, গঠনতন্ত্র তৈরি, পরিচালনা, যৌথ দর কষাকষি করার ক্ষেত্রে ইপিজেড কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি গ্রহণের বাধ্যবাধকতা দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে ইপিজেড শ্রমিক কল্যাণ সমিতি জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনে অন্তর্ভূক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার কথা বলা হয়েছে।
অথচ আইএলও’র নীতিমালায় বলা হয়েছে, যে কোন পার্থক্য নির্বিশেষে শ্রমিক ও মালিকদের সংশ্লিষ্ট সংগঠনের বিধান অনুযায়ী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা ও পূর্ব অনুমোদন ব্যতিরেকে নিজেদের পছন্দমত সংগঠনের যোগদান করার অধিকার থাকবে। এছাড়া বিদ্যমান শ্রম আইনেও ট্রেড ইউনিয়ন সমূহের নিজস্ব গঠনতন্ত্র ও বিধিমালা প্রণয়ন, স্বাধীনভাবে নিজস্ব প্রতিনিধি নির্বাচন, সমিতির প্রশাসন ও কর্মতত্পরতা, সংগঠনের এবং কর্মসূচী প্রণয়নের অধিকার থাকবে।
এতে বলা হয়, ইপিজেড শ্রম আইনে শ্রমিক কল্যাণ সমিতি গঠনের যে অধিকার দেয়া হয়েছে, তা কখনোই ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারের সমকক্ষ নয়। কারণ, কল্যাণ সমিতি গঠনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, এখতিয়ার শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে পৃথক।
ওই পর্যালোচনায় ইপিজেড আইনের আরো কিছু অসঙ্গতিও তুলে ধরা হয়। শ্রমিকদের অসদাচরণের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটিতে শ্রমিক প্রতিনিধি অন্তর্ভূক্ত করার সুযোগ নেই। চাকরিচ্যুতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইপিজেড শ্রমিকদের আইনের আশ্রয় গ্রহণের সুযোগ সীমিত। অথচ বিদ্যমান শ্রম আইনে শ্রমিকদের এসব সুযোগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া শ্রম আইন বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষকে অগ্রাহ্য করে ইপিজেড কর্তৃপক্ষকে একচেটিয়া ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ইপিজেড শ্রমিকদের জন্য প্রস্তাবিত আইনে বেশকিছু অধিকার ও সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে। শ্রমিক কল্যাণ সমিতি করার যে সুযোগ রাখা হয়েছে তা প্রায় ট্রেড ইউনিয়নের মতই। অন্যদিকে তারা চাইলে ধর্মঘটও ডাকতে পারবেন।
শ্রম সচিব মিকাইল শিপার ইত্তেফাককে বলেন, ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ সরাসরি না থাকলেও ইপিজেড শ্রমিকরা কোন অধিকার থেকে বঞ্চিত নন। বরং বছরের পর বছর ধরে সেখানে শান্তিপূর্ণ উত্পাদন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তাদের সুযোগ-সুবিধা ক্ষেত্রবিশেষে বাইরের শ্রমিকদের চাইতে বেশি। তাদের বেতন-ভাতা নিয়েও সমস্যা নেই।
তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ইপিজেড এলাকায় বেশকিছু বিদেশী বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাদের এখানে বিনিয়োগের শর্ত হিসেবে ট্রেড ইউনিয়ন থাকবে না বরে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। এখন সেখানে অবাধ ট্রেড ইউনিয়নের সুযোগ দেয়া হলে সেখানকার বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। আর ইপিজেডের শ্রমিকদের পাওনা বা সুযোগ সুবিধা নিয়ে তো সমস্যাও হচ্ছে না।
