রপ্তানি বাড়াতে নতুন বাজার খুঁজে বের করুন :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৬, ০০:২১
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের রপ্তানি খাতকে সমৃদ্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কোন দেশে কোন পণ্যের চাহিদা রয়েছে তা ব্যবসায়ীদের খুঁজে বের করতে হবে। এজন্য পণ্যের বহুমুখীকরণও অপরিহার্য। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। গতকাল রবিবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত জাতীয় রপ্তানি ট্রফি বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে ২০১১-১২ ও ২০১২-১৩ অর্থবছরে রপ্তানি বাণিজ্যের বিকাশে             উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা পর্যায়ে ১১৩টি প্রতিষ্ঠানের মাঝে জাতীয় রপ্তানি ট্রফি প্রদান করেন। ২০১১-১২ এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরের জন্য সর্বমোট ৫২টি স্বর্ণ, ৩৭টি রৌপ্য এবং ২৪টি ব্রোঞ্জ ট্রফি ও সনদ প্রদান করা হয়।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন অনেক নতুন নতুন পণ্য বাংলাদেশ থেকে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। তবে এর পরিমাণ আরো বাড়াতে হবে। কারণ, বিশ্বের বহু দেশ এবং মানুষের চাহিদা দিন দিন পরিবর্তিত হচ্ছে। শেখ হাসিনা বলেন, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবেন। সরকার এখানে ব্যবসা করতে আসেনি। তবে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের সার্বিক অগ্রগতির মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার যাতে দ্রুত উন্নতি হয়, সেজন্য সরকার সব ধরনের সুযোগ সৃষ্টি করে দেবে। সীমিত পণ্যের উপর দেশের রপ্তানি নির্ভরতাকে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম দুর্বলতা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রপ্তানি বাণিজ্যের এ সমস্যা দূর করার জন্য আমরা পণ্য তালিকায় নতুন নতুন পণ্যের সংযোজন এবং কম অবদান রাখছে এমন পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী এ সময় সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা সারাদেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। ইতোমধ্যে ১০টির কাজ এগিয়ে চলছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় পণ্য ও বাজার বহুমুখী করার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অধিক মূল্য সংযোজিত পণ্য উত্পাদনে ও দেশজ কাঁচামাল নির্ভর রপ্তানি পণ্য উত্পাদনে আপনাদের মনোনিবেশ করার অনুরোধ জানাচ্ছি।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা জানেন বিশ্বের উন্নত দেশ এমনকি উন্নয়নশীল দেশে শ্রমশক্তির প্রকট অভাব। এজন্য আমরা শ্রমঘন শিল্প প্রতিষ্ঠার উপর গুরুত্ব প্রদান করেছি। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ফলে কেউ আর জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকবে না। তিনি বলেন, আমাদের রপ্তানি খাতের শ্লোগান হচ্ছে ‘ফ্রম শার্ট টু শিপ’।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রপ্তানি উন্নয়নে সম্ভাব্য সব খাতে ২০৪১ সালকে লক্ষ্য ধরে রোপম?্যাপ প্রণয়ন করা হচ্ছে। অনুষ্ঠানে ‘রূপকল্প ২০২১’ ঘোষণার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০০৯ সালে আমরা যখন দায়িত্ব নেই, তখন বিশ্বব্যাপী মন্দা চলছিল। তা সত্ত্বেও বিগত সাড়ে সাত বছরে মাথাপিছু আয় প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে এক হাজার ৪৬৬ মার্কিন ডলার হয়েছে। এ সময়ে রপ্তানি আয়ের গড় প্রবৃদ্ধি প্রায় ১২ দশমিক ৫২ থাকার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, পরিমাণগত দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৬.৯১ বিলিয়ন ইউনিট রপ্তানি করেছে, যা পূর্ববর্তী বছরে ছিল ২.৪৪ বিলিয়ন ইউনিট।
 
সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে এবং সিঙ্গাপুরে দুটি নতুন বাণিজ্য উইং খোলা হয়েছে। বাংলাদেশ ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছর সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ব্যবস্থাপনায় বিদেশে ১৯৬টি আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণ করেছে। ২০২১ সালে দেশের রপ্তানির লক্ষ?্যমাত্রা ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। শুধু তৈরি পোশাক খাতেই ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও রপ্তানি পণ্য প্রদর্শনীর জন্য চীনের সহায়তায় মুন্সিগঞ্জ জেলার বাউশিয়াতে প্রায় ৫৩১ একর জমির ওপর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্র নামে একটি অত্যাধুনিক গার্মেন্টস শিল্প পার্ক নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন থাকার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
 
ওষুধ রপ্তানিতে বাংলাদেশ অত্যন্ত সফল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওষুধ একটি বিশাল খাতে পরিণত হবে। ইতোমধ্যে ১২২টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ডব্লিউটিও ট্রিপস চুক্তির মেয়াদ ২০৩২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এতে ওষুধ রপ্তানি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে কোনো ব্যবসায়ী ঠিক মতো ব্যবসা করতে পারেননি। তারা ক্ষমতায় থাকতে কেবল স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে নিজেদের জন্য কাজ করেছে; কিন্তু আমরা দেশের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করি।
 
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. তাজুল ইসলাম চৌধুরী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েত উল্লাহ আল মামুন, এফবিসিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান মাফরুহা সুলতানা প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
 
জাতীয় রপ্তানি ট্রফি পেলো যেসব প্রতিষ্ঠান
 
২০১২-১৩ অর্থ বছরে সর্বোচ্চ রপ্তানির আয়ের স্বীকৃতি হিসেবে ২৬টি প্রতিষ্ঠানকে স্বর্ণ, ১৯টি প্রতিষ্ঠানকে রৌপ্য ও ১৫টি প্রতিষ্ঠানকে ব্রোঞ্জ ট্রফি দেয়া হয়েছে। এছাড়া ২০১১-১২ অর্থ বছরে রপ্তানির আয়ের জন্য ২৪টি প্রতিষ্ঠানকে স্বর্ণ, ১৮টি প্রতিষ্ঠানকে রৌপ্য ও ৯টি প্রতিষ্ঠানকে ব্রোঞ্জ ট্রফি প্রদান করা হয়েছে। পণ্যখাতে- ‘জাবের এন্ড জোবায়ের ফেব্রিক্স লি.’ সর্বোচ্চ রফতানি আয় অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১-১২ অর্থ বছরের স্বর্ণ ট্রফির জন্য মনোনীত হয়। প্রতিষ্ঠানের পক্ষে উপ-ব্যবস্থপনা পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ জাবের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে স্বর্ণপদক গ্রহণ করেন। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে ২৬টি পণ্য ও সেবাখাতের ২৬টি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানকে স্বর্ণ, ১৯টি পণ্য ও সেবাখাতে ১৯টি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানকে রৌপ্য এবং ১৫টি পণ্যখাতে ১৫টি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানকে ব্রোঞ্জ ট্রফি প্রদান করা হয়। ওই বছরের জন্য পণ্যখাতে সর্বোচ্চ রফতানির জন্যও ‘জাবের এন্ড জোবায়ের ফেব্রিক্স লি.’কে স্বর্ণ ট্রফি প্রদান করা হয়। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এস এম রফিকুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ট্রফি গ্রহণ করেন।
 
২০১১-১২ অর্থ বছরের জন্য স্বর্ণপদক প্রাপ্ত ২৪টি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- হামীম গ্রুপের রিফাত গার্মেন্টস, স্কয়ার ফ্যাশনস, স্কয়ার টেক্সটাইলস, নোমান উইভিং, জাবের অ্যান্ড জোবায়ের ফেব্রিক্স, এপেক্স ফুডস, পপুলার জুট এক্সচেঞ্জ, আকিজ জুট, এপেক্স ট্যানারি, পিকার্ড বাংলাদেশ, এফবি ফুটওয়্যার, এগ্রি কনসার্ন, প্রাণ এক্সপোর্টস, রাজধানী এন্টারপ্রাইজ, কারুপণ্য রংপুর, বেঙ্গল প্লাস্টিক, ফার সিরামিকস, ইউনিগ্লোরি সাইকেল, তানভীর পলিমার, বেক্সিমকো ফার্মা, সার্ভিস ইঞ্জিন, ইউনিভার্সেল জিন্স, শাশা ডেনিমস ও মন ট্রিমস। ওই অর্থ বছরে রৌপ্যপদক প্রাপ্ত ১৮টি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- অনন্ত অ্যাপারেলস, জিএমএস কম্পোজিট, মোশারফ কম্পোজিট, এনভয় টেক্সটাইল, সীমার্ক (বিডি), এফ আর জুট, জনতা জুট, এস এফ ইন্ডাস্ট্রিজ, আর এম এম লেদার, ফার্ম ফ্রেশ, প্রাণ এগ্রো, ক্যাপিটাল এন্টারপ্রাইজ, কোর দ্য জুট ওয়ার্কস, এভারব্রাইট প্লাস্টিক, ট্রান্সওয়ার্ল্ড বাইসাইকেল, আল-হাবিব এন্টারপ্রাইজ, গ্রাফিকস পিপল ও জিন্স-২০০০।
 
ব্রোঞ্জপদক প্রাপ্ত ৯টি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- সিনহা ইন্ডাস্ট্রিজ, ফোর এইচ ফ্যাশনস, ভিয়েলাটেক্স স্পিনিং, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, কুলিয়ারচর সি ফুডস, রেজা জুট, করিম জুট, আল-আজমী ট্রেড ও প্রাণ ফুডস। ২০১২-১৩ অর্থ বছরের জন্য স্বর্ণপদক পাপ্ত ২৬টি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- রিফাত গার্মেন্টস, জিএমএস কম্পোজিট, কামাল ইয়ার্ন, সাদ সান টেক্সটাইল, জাবের অ্যান্ড জোবায়ের, নোমান টেরিটাওয়েল, এপেক্স ফুডস, পপুলার জুট, আকিজ জুট, এপেক্স ট্যানারি, পিকার্ড বাংলাদেশ, এফ বি ফুটওয়্যার, আল আজমী ট্রেড, প্রাণ ডেইরি, রাজধানী এন্টারপ্রাইজ, কারুপণ্য রংপুর, বেঙ্গল প্লাস্টিক, ফার সিরামিকস, বিআরবি কেবল, মেরিন সেইফটি সিস্টেম, স্কয়ার ফার্মা, গ্রাফিক্স পিপল, ইউনিভার্সেল জিন্স, শাশা ডেনিমস, মুন ট্রিমস ও মীর টেলিকম। এই ২৬ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৩টি প্রতিষ্ঠান গত অর্থ বছরের জন্য পদক তালিকায় রয়েছে।
 
১৯টি রৌপ্যপদক প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- অনন্ত অ্যাপারেলস, স্কয়ার ফ্যাশনস, বাদশা টেক্সটাইল, এনভয় টেক্সটাইল, ইউনিলারেন্স টেক্সটাইল, সীমার্ক (বিডি), রেজা জুট, জনতা জুট, এসএফ ইন্ডাস্ট্রিজ, আর এম এম লেদার, লালমাই ফুটওয়্যার, মনসুর জেনারেল, প্রাণ এগ্রো, ক্যাপিটাল এন্টারপ্রাইজ, কোর দ্য জুট ওয়ার্কস, বেঙ্গল প্লাস্টিক, সার্ভিস ইঞ্জিন, প্যাসিফিক জিন্স ও জাবের অ্যান্ড জোবায়ের এক্সেসরিজ। ব্রোঞ্জপদক পাওয়া ১৫ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- অ্যাপারেল গ্যালারি, ইন্টারস্টফ অ্যাপারেলস, মোশারফ কম্পোজিট, তালহা ফেব্রিক, জালালাবাদ ফ্রোজেন ফুডস, উত্তরা জুট, সাদাত জুট, বেঙ্গল লেদার, এবিসি ফুটওয়্যার, ফুটবেড ফুটওয়্যার, এলিন ফুডস, প্রাণ ফুডস, হেলাল অ্যান্ড ব্রাদার্স, আরএফএল প্লাস্টিক ও ইউনিনেগ্নারি পেপারস অ্যান্ড প্যাকেজিং।
 
 

ইত্তেফাক/এএন