জন কেরির সফর আজ

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৬, ০০:২৬
সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্ক আরো এক ধাপ এগিয়ে নিতে আজ সোমবার ৯ ঘণ্টার সফরে ঢাকা আসছেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরি। পূর্বসূরি হিলারি ক্লিনটনের প্রতিষ্ঠিত অংশীদারিত্বের নতুন যুগের সূচনা করাই তার ঢাকা সফরের লক্ষ্য। তবে সকল ক্ষেত্র ছাপিয়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদ দমনই প্রধান ইস্যু হয়ে উঠছে তার সফরে। এ ছাড়া থাকছে গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও মানবাধিকার ইস্যু। সর্বোপরি কেরির সফর ঢাকা-ওয়াশিংটনের বন্ধন আরো মজবুত করবে বলেই আশা করা হচ্ছে।
 
পররাষ্ট্র মন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীর আমন্ত্রণে ঢাকা সফরে আসছেন জন কেরি। সুইজারল্যান্ডের জেনেভা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর বিশেষ বিমানযোগে আজ সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে এসে পৌঁছবেন তিনি। বিমান বন্দরের ভিভিআইপি টার্মিনালে তাকে স্বাগত জানাবেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাহমুদ আলী। উল্লেখ্য, ঢাকায় অবস্থানকালে তাকে ভিভিআইপি মর্যাদা দিয়ে এসএসএফ নিরাপত্তা দিচ্ছে সরকার।
 
কেরির ৯ ঘণ্টার ঢাকা সফর শুরু হবে বেলা সাড়ে ১১টায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে। এরপর দুপুর ১২টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাত্ করবেন তিনি। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাহমুদ আলী ও জন কেরি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন দুপুর ১টায়। সেখানে তার সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী। বেলা ৩টায় ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের ইএমকে সেন্টারে নাগরিক সমাজ ও তরুণ প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করবেন কেরি। এরপর ৪টায় মিরপুরের শেওড়াপাড়া এলাকায় একটি বস্ত্র শিল্প কারখানা পরিদর্শনে যাবেন জন কেরি। বিকাল ৫টায় মার্কিন দূতাবাস ও চ্যান্সারি কমপ্লেক্সে দূতাবাস কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে তার। তবে বিকাল ৪টার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও             বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে কেরির সাক্ষাতের সূচি নির্ধারিত হয়েছে বলে জানা যায়। দিনভর ঝটিকা কর্মসুচিতে অংশগ্রহণ শেষে সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে নয়াদিল্লির উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করবেন। পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক তাকে বিদায় জানাবেন।
 
ঢাকায় কেরির সফরসঙ্গী হিসেবে চিফ অব স্টাফ জন ফিনার, ডেপুটি মুখপাত্র মার্ক টোনারসহ কয়েকজন সহকর্মী আসছেন। সিএনএন, এপিসহ পাঁচটি মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরাও তার সঙ্গে থাকছেন।
 
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে জন কেরির এটি প্রথম ঢাকা সফর। তবে গত পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের এটি দ্বিতীয় ঢাকা সফর। সর্বশেষ ২০১২ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের তত্কালীন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারি ক্লিনটন দুই দিনের সফরে ঢাকায় এসেছিলেন। তখন ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে অংশীদারিত্বমূলক সংলাপ চালুর জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ভিত্তিতে প্রতিবছর দুই দেশের মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জন কেরির এই সফরের মধ্য দিয়ে সেই অংশীদারি সম্পর্কে নতুন যুগের সূচনা হবে।
 
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসী ও জঙ্গি হামলার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ দমনই এই সফরের মুখ্য ইস্যু। সন্ত্রাসবাদ দমনে বাংলাদেশকে সহযোগিতা দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে নতুন নতুন প্রস্তাব নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। গত ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন বর্বর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সন্ত্রাসী হামলায় বিদেশিসহ মোট ২২ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। এরপরই জন কেরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে টেলিফোন করে সমবেদনা জানান। একইসঙ্গে সন্ত্রাসবাদ দমনে বাংলাদেশের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। ওই ঘটনার সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্র মন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়ালকে ঢাকা পাঠান জন কেরি।
 
ঢাকা সফরকালে সরকারের সঙ্গে এই বিষয়টি নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করবেন বলে জানা যায়। এ ছাড়া জন কেরি বাংলাদেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ও সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে নিরাপত্তাসহ সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করবেন। পাশাপাশি সরকারের সঙ্গে আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক সকল ইস্যুতে আলোচনা করবেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত পাঠানোর ইস্যুটি তুলে ধরবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি সুবিধা পুনর্বহাল ও পণ্য রপ্তানিতে শুল্ক-কোটা সুবিধার দাবি জানাবে। এ ছাড়া জ্বালানি, বাণিজ্য-বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তন, শ্রম অধিকার ইস্যুতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হবে।
 
কেরির বর্ণাঢ্য
 
কর্মজীবন
 
পুরো নাম জন ফোর্বস কেরি। কলোরাডো অঙ্গরাজ্যে ১৯৪৩ সালে জন্মগ্রহণকারী কেরি যুক্তরাষ্ট্রের ৬৮তম পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস রাজ্যের সিনেটর এবং সিনেটে বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি ২০০৪ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য মনোনীত হন। তবে ওই সময় তিনি রিপাবলিকান জর্জ ডব্লিউ বুশের কাছে হেরে যান।
 
তিনি ম্যাসাচুসেটস এবং নিউ হ্যাম্পশায়ারের বোর্ডিং স্কুলে এবং ১৯৬৬ সালে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কূটনীতি বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। স্নাতক সম্পন্ন করার পর কেরি সেচ্ছাসেবক হিসেবে মার্কিন নৌবাহিনীতে যোগ দেন। তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধে সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে সিলবার স্টার, ব্রোনজ স্টার মেডেল, তিনটি পার্পল হার্ট পুরষ্কার লাভ করেন।
 
তিনি ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের প্রথম সমর্থক, কিন্তু পরবর্তীতে একজন শক্তিশালী ইরাক যুদ্ধবিরোধী হয়ে ওঠেন। কেরি ইরাক যুদ্ধবিরোধী মতবাদের উপর ভিত্তি করে ২০০৪ সালের রাষ্ট্রপতি পদের জন্য প্রচারণা চালান। কিন্তু তিনি হেরে যান। কেরি ২০০৯ সালে সিনেট ফরেন রিলেশনস কমিটির চেয়ারম্যান হন। হিলারি ক্লিনটনের বিদায়ের পর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাকে ৬৮তম পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত হন এবং ২০১৩ সালে ১ ফেব্রুয়ারি তিনি দায়িত্ব নেন।
 
 

ইত্তেফাক/এএন