শেষ পর্যন্ত মারা গেল সেই স্কুলছাত্রী রিশা

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৬, ০০:২৮
দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে আহত স্কুলছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশা (১৪) না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছে। পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গতকাল রবিবার সকালে সে হেরে গেছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) তার মৃত্যু হয়। রিশা রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। এর আগে ২৪ আগস্ট দুপুরে কাকরাইল ফুটওভার ব্রিজের ওপর দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে রিশা গুরুতর আহত হয়। চিকিত্সকরা বলছেন, রিশার পেটের বাম পাশে ও বাম হাতে ছুরিকাঘাত করা হয়েছিল।
 
এদিকে রিশার মৃত্যুর সংবাদে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা ক্লাস বর্জন করে স্কুলের সামনের রাস্তায় নেমে আসে। সেখানে একটি মানববন্ধন করে। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা কাকরাইল মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। রিশা নিহতের ঘটনায় জড়িতদের বিচারের দাবিতে বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত রাস্তায় অবস্থান নেয়। এতে কাকরাইলসহ আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। রিশার হত্যার বিচার দাবিসহ আজ সোমবারের ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দেয় ওই স্কুলের শিক্ষার্থীরা।
 
পরে স্কুলের অধ্যক্ষ আবুল হোসেন ঘটনাস্থলে গিয়ে পতাকা অর্ধনমিত রাখা ও ক্লাস বন্ধের ঘোষণা দিলে শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নেয়। আন্দোলনরত রিশার সহপাঠী পিয়ালী সাহা বলেন, রিশাকে যে হত্যা করেছে তাকে দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে। হত্যাকারীকে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। রিশার অপর সহপাঠী আশা বলেন, রিশা মেধাবী ছাত্রী ছিল। সব সময় হাসি-খুশি থাকত। ক্লাসের সবাইকে মাতিয়ে রাখত। তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করায় আমরা হতবাক এবং মর্মাহত হয়েছি। আমরা রিশার হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে স্কুলে ফেরত পাঠানো হয়েছে জানিয়ে পুলিশের রমনা বিভাগের ডিসি মারুফ হোসেন সরদার বলেন, মূল আসামি ওবায়দুলকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।  ‘আমি এখন কী করমু, কই যামু, এত বড় একটা ছেলে (বৈশাখী টেইলার্সের কাটিং মাস্টার ওবায়দুল) কেমনে আমার মেয়েটাকে মারল। আমি এখন কাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করব। আমাকে রেখে গেলি ক্যান, আমাকে সঙ্গে নিয়ে যা।’ এসব বলে বারবার সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ছিলেন রিশার বাবা রমজান হোসেন। নিহতের চাচা নিজাম উদ্দিন বলেন, রিশা চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে ছিল। সব সময় হাসি-খুশি ছিল। এলাকার সবাই তাকে আদর করত।
 
নিহতের মামা কামাল উদ্দিন মুন্না জানান, রিশার বাবা রমজান আলী একজন কেবল ব্যবসায়ী এবং মা তানিয়া হোসেন গৃহিণী। ওই দম্পতির তিন সন্তান রয়েছে। তারা বংশালের সিদ্দিকবাজার এলাকায় ১০৪ নম্বর বাড়ির ৪র্থ তলায় থাকেন। নিহত রিশা সবার বড় ছিল। এ ছাড়া ওই দম্পতির দুই সন্তান রবি (৯) ও খুকু (৫)। এদের মধ্যে রবি তৃতীয় শ্রেণি এবং খুকু কেজিতে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে পড়ছে। তিনি বলেন, গত দুই সপ্তাহ আগে ওবায়দুল ডিশ লাইনের কথা বলে বাসায় ফোন করে রিশার বাবার মোবাইল নম্বর নেয়। এক সপ্তাহ আগে রমজানকে ফোন করে সে জানায়, আমি আপনার মেয়েকে ভালোবাসি। আমার সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে। নইলে আপনার মেয়েকে হত্যা করা হবে। কিন্তু পরিচয় দিয়ে ফোন না দেওয়ার রমজান গুরুত্ব দেয়নি।
 
২৪ আগস্ট দুপুরে পরীক্ষা শেষে স্কুল থেকে বেরিয়ে রিশা কাকরাইল ফুটওভার ব্রিজের ওপর ওঠে। ব্রিজের মাঝামাঝি যেতেই এক দুর্বৃত্ত তাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। রিশার চিত্কারে স্কুলের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ছুটে আসে। পরে গুরুতর অবস্থায় তাকে প্রথমে কাকরাইল ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসাপাতালে এবং পরে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিত্সাধীন অবস্থায় গতকাল সকালে রিশা মারা যায়। ঘটনার দিন রাতে রিশার মা তানিয়া হোসেন বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে রমনা মডেল থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় ওবায়দুল নামে এক যুবককে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ তাকে এখনো ধরতে পারেনি।
 
মামলায় উল্লে­খ করা হয়েছে, প্রায় ৬ মাস আগে মায়ের সঙ্গে ওই ছাত্রী ইস্টার্ন মল্লিকার শপিং কমপে­ক্সের বৈশাখী টেইলার্সে যায়। সেখানে একটি ড্রেস সেলাই করতে দেয়। দোকানের রিসিটে বাসার ঠিকানা ও তার মায়ের মোবাইল নম্বর দেওয়া ছিল। সেই রিসিট থেকে মোবাইল নম্বর নিয়ে ওই টেইলার্সের কাটিং মাস্টার ওবায়দুল ফোনে উত্ত্যক্ত করত রিশাকে। পরে ফোন নম্বরটি বন্ধ করে দিলে ওই যুবক স্কুলে যাওয়ার পথে ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করতে থাকে। প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় রিশাকে ছুরিকাঘাত করে ওবায়দুল— এমনই ধারণা পরিবারের।
 
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রমনা মডেল থানার এসআই মোশাররফ হোসেন বলেন, ঘটনার পর থেকেই ওবায়দুল পলাতক রয়েছেন। তার গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁও। বৈশাখী টেইলার্স মালিকের দাবি অনুযায়ী, ওবায়দুল আড়াই মাস আগে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু এরপর কোথাও চাকরি বা অন্য কিছু করত কি না তা জানা যায়নি। মোবাইল ট্র্যাকিং এবং বিভিন্ন তথ্য উপাত্তের মাধ্যমে তার অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। শিগগিরই তাকে ধরতে পারা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
 
নিহতের মামা কামাল উদ্দিন মুন্না জানান, গতকাল স্কুলছাত্রী রিশার লাশ ঢামেক মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে জানাজার জন্য নেওয়া হয়। সেখানে রিশার সহপাঠী, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের কান্নায় স্কুলের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। বাদ আসর জানাজা শেষে তার লাশ নেওয়া হয় বংশাল আলাউদ্দিন রোডের ঘাট সাহেব মসজিদে। সেখানে আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসী শেষবারের মতো রিশার লাশ দেখতে ভিড় করে। সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বাদ মাগরিব দ্বিতীয় জানাজা শেষে তার লাশ আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
 
মহিলা পরিষদের নিন্দা                            
 
উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের মেধাবী ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশাকে হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা, গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। এক লিখিত বিবৃতিতে মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম এবং সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু এ ঘটনায় জড়িতকে দ্রুত গ্রেফতার, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতকরণসহ নির্যাতনের শিকার পরিবারের নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছেন।
 
 

ইত্তেফাক/এএন