অদক্ষ প্রসিকিউটরদের না সরানোয় অসন্তোষ আপিল বিভাগের

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৬, ০০:২৯
মৃত্যুদণ্ডের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে জামায়াতের মীর কাসেম আলীর রিভিউ পিটিশনের শুনানি শেষ হয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার এ বিষয়ে রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য রেখেছে আদালত। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ গতকাল রবিবার এই আদেশ দেন। এদিকে রিভিউ শুনানির এক পর্যায়ে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মীর কাসেমের মামলা পরিচালনাকারী অদক্ষ প্রসিকিউটরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে আপিল বিভাগ। আদালত বলেছেন, ‘এই মামলায় আপিল বিভাগের রায়ে আমরা ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের বিষয়ে কিছু ত্রুটি তুলে ধরেছিলাম। আশা করেছিলাম ওইসব প্রসিকিউটরদের সরিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু তা না করে দলভারি করা হয়েছে।’ তখন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এটি সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক যে প্রসিকিউটরদের অদক্ষতার জন্যই ১২ নম্বর অভিযোগ (রঞ্জিত ও টুন্টুকে ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন ও হত্যা) থেকে খালাস পেয়েছেন মীর কাসেম। তিনি বলেন, আদালতের এই মনোভাব আমি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব।
 
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আলবদর কমান্ডার ও জামায়াতের শুরা সদস্য মীর কাসেম আলীকে ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেয় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। চলতি বছরের ৮ মার্চ আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখে। রায়ে ১১ নম্বর অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ওই অভিযোগে বলা হয়েছে, ৭১ সালের ২৮ নভেম্বর মীর কাসেমের নির্দেশে আলবদররা মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে দিনভর নির্যাতন করে। নির্মম অত্যাচারে জসিম মারা যান। পরে নিহত আরও পাঁচজনের সঙ্গে জসিমের মরদেহ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে মৃত্যুদণ্ডের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে রিভিউ পিটিশন দায়ের করেন মীর কাসেম। বৃহস্পতিবার রিভিউ পিটিশনের ওপর শুনানি শুরুর পর রবিবার পর্যন্ত মুলতুবি করে আপিল বিভাগ। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মো. বজলুর রহমান।
 
গতকাল রিভিউর শুনানিতে আসামি পক্ষের প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের ছয়জন সাক্ষীর কেউই তার সাক্ষ্যে বলেনি যে মীর কাসেম সরাসরি জসিম হত্যাকান্ডের সময় উপস্থিত ছিল। যে অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে সেটি রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি। এ পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী অ্যাডভোকেট শফিউল আলম চট্টগ্রামের ডালিম হোটেলে নির্যাতন ও হত্যার ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দণ্ড দেয়। আর এই মামলায় মীর কাসেমের সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। যা সাক্ষীদের সাক্ষ্যে উঠে এসেছে। আর রায়ে এটি বলে দিয়েছি।’
 
পরে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। শুনানির শুরুতেই অ্যাটর্নি জেনারেলের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘মীর কাসেমের মামলা পরিচালনায় যারা অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? আইনমন্ত্রী তো ব্যবস্থা নেবেন বলে বক্তব্য দিয়েছিলেন। আমরা রায়ে বলে দিয়েছিলাম যে মীর কাসেমের মামলার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের ত্রুটি হলো তারা দুজন সমন্বয় করে যৌথভবে মামলাটি নিয়ে কাজ করেননি। দুই কৌঁসুলি খন্ডিতভাবে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করায় মামলা পরিচালনা প্রক্রিয়ায় পুরোপুরি মনোনিবেশ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আমরা মনে করি তাদের মধ্যে কোন সমন্বয় ছিলো না। এ মামলা পরিচালনার প্রক্রিয়াকে মঞ্চ নাটকের সাথে তুলনা করা যায়।’
 
প্রধান বিচারপতি আরো বলেন, এটা তারা (প্রসিকিউটর) মোটিভেটেডলিও করে থাকতে পারে। যারা এই মামলাটি পরিচালনা করেছেন তাদের ফৌজদারি মামলা করার দক্ষতা কতটুকু সেটা নিয়ে কি ভেবেছেন? প্রসিকিউটররা মামলা পরিচালনার নামে ‘মকারি’ করেছেন। এটা জাতির জানা দরকার। তিনি বলেন, যারা দক্ষ প্রসিকিউটর তাদেরকে কেন এখানে আনা হয়নি। এসময় অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, দক্ষ প্রসিকিউটর আছে। কিন্তু তাদের কেন এখানে আনা হলো না সেটি আমি অবগত নই। তবে আদালতের এই মনোভাব আমি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব।
 
শুনানি শেষে আপিল বিভাগ ৩০ আগষ্ট রায়ের জন্য দিন ধার্য করে দেয়। শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা এবং আসামি পক্ষে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহানও উপস্থিত ছিলেন।
 
 

ইত্তেফাক/এএন