প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাঙালি বীরের জাতি। এ জাতি আর রাজাকার-আলবদরদের ক্রীড়নক হয়ে থাকতে চায় না, থাকবেও না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর খুনিরা দম্ভোক্তি করেছিল, ‘কে আমাদের বিচার করবে? আমরা বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলেছি।’ কিন্তু আমরা তাদের বিচার করেছি।
গতকাল বুধবার রাজধানীর খামারবাড়িস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব স্মরণে ছাত্রলীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় গিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে তাদের নানাভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। একাত্তরে যারা স্বজন হারিয়েছেন, তারা যেন কিছুটা সান্ত্বনা ও স্বস্তি পান সেজন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছি, রায়ও কার্যকর হচ্ছে। যতই বাধা-বিপত্তি বা হুমকি-ধামকি আসুক না কেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অব্যাহত থাকবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দীর্ঘ ২১টি বছর জাতির পিতার নাম নিষিদ্ধ ছিল। পঁচাত্তরের পর একটি প্রজন্মকে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতেই দেওয়া হয়নি। বঙ্গবন্ধুর নাম ও তাঁর ভাষণ বাজানো নিষিদ্ধ ছিল। একটি প্রজন্ম যদি ক্রমাগতভাবে বিকৃত ইতিহাস শুনতে থাকে, এতে তাদের চরিত্রটাও বিকৃত হয়ে যায়। বর্তমানে যে সন্ত্রাস-জঙ্গবাদ তা সেই বিকৃত ইতিহাস থেকেই সৃষ্টি। দেশ ও জাতির জন্য যে কোন ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- যে কোনো মহত্ অর্জনে মহান আত্মত্যাগের প্রয়োজন। তাই দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে, তাদের কল্যাণ ও উন্নত জীবন দিতে আমিও যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখল এবং তখনকার পরিস্থিতি প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, পঁচাত্তরের পর দেশে ১৯টা ক্যু হয়েছে। প্রতি রাতে ছিল কারফিউ। অনেকে বলে জিয়া (জিয়াউর রহমান) নাকি গণতন্ত্র দিয়েছে। গণতন্ত্র নয়, জিয়া দিয়েছিল কারফিউ গণতন্ত্র। তখন (জিয়াউর রহমানের আমলে) স্বাধীনভাবে চলার কোনো সুযোগ ছিল না, কথা বলার কোনো সুযোগ ছিল না। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর আমলে ১১ হাজার যুদ্ধাপরাধী সাজাপ্রাপ্ত ছিল, ২২ হাজার মামলা হয়েছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে সব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দিলেন। গোলাম আযমকে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনেন। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার বন্ধ করে দিয়ে খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছিলেন এই জিয়াউর রহমান। সেসময় বিবিসিতে ইন্টারভিউতে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে আত্মস্বীকৃত খুনিরা বলেছিল- তাদের বিচার কেউ করতে পারবে না। তবে বঙ্গবন্ধুর খুনি এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আমরা করেছি। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনাকে ফিরিয়ে আনবো বলেই বাংলাদেশে রাজনীতি শুরু করি। স্বজন হারানোর ব্যাথা-বেদনা আমার চেয়ে কে বেশি জানে?
বঙ্গবন্ধুর মহান আত্মত্যাগ ও আদর্শ নিয়ে নিজেদের গড়ে তোলার পাশাপাশি বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আগামীতে দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি অর্জন, আন্দোলন-সংগ্রাম ও আত্মত্যাগে ছাত্রলীগই হলো অগ্রগামী নাম। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা এবং পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে এই ছাত্রলীগ। তাই ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতাকর্মীকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বুকে ধারণ করে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। নিজেদের উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। ছাত্রলীগের যে বিশাল ভূমিকা ও ইতিহাস রয়েছে তা ধরে রাখতে হবে।
ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি ছাত্রদের হাতে কাগজ-কলম তুলে দিয়েছি। আর জিয়াউর রহমান ছাত্রদের হাতে অর্থ-অস্ত্র ও ড্রাগ তুলে দিয়ে বিপথে নিয়ে গিয়েছিল। ছাত্র সমাজকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। তাই আমি চাই রাজনীতি করো, কিন্তু সবাইকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। কেননা তোমাদেরই আগামীতে দেশের নেতৃত্ব দিতে হবে। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী সবাইকে পাঠ করে জাতির পিতার আদর্শে নিজেদের গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে তাঁর সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে বাংলাদেশ এখন সবদিক থেকে এগিয়ে চলেছে। আমরা দেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধশালী করে গড়ে তুলবোই। এ জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে আমি প্রস্তুত।
আলোচনা শেষে ছাত্রলীগের নিয়মিত প্রকাশনা ‘মাতৃভূমি’র মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অংশ নেন সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক সৈয়দ বদরুল আহসান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন। অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ, মন্ত্রীসভার সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
ইত্তেফাক/এএন
