সপরিবারে পালিয়েছেন পরিকল্পনাকারী রাজ্জাক

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০১৬, ২৩:৩৮
১০ বছর আগে থেকেই দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে জঙ্গিবাদের বীজ বপনের কাজটি করেছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষক। ইসলাম ও ভূ-রাজনৈতিক ভিত্তিক বিভিন্ন সেমিনার অনুষ্ঠানের নামে শিক্ষার্থীদের উপস্থিত করে ‘মগজ ধোলাই’ করা হয়েছে। শিক্ষার নামে এই ‘মগজ ধোলাই’ করার কাজটির মূল পরিকল্পনাকারী ড. রেজাউর রাজ্জাক।
 
২০১৩ সাল পর্যন্ত ড. রেজাউর রাজ্জাক ছিলেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির এমবিএ প্রোগ্রামের সমন্বয়ক। জঙ্গিবাদের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগের বিষয়টি গোয়েন্দা সংস্থার নজরে এলে তিনি ওই ইউনিভার্সিটি থেকে লাপাত্তা হয়ে যান। গুলশানের হলি আর্টিজান, শোলাকিয়া জঙ্গি হামলা ও টার্গেট কিলিংয়ের তিনি অন্যতম পরিকল্পনাকারী বলে একটি গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। ২০১৪ সালে একটি গোয়েন্দা সংস্থা ড. রেজাউর রাজ্জাক জঙ্গি তত্পরতা এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের এই কার্যক্রমে উদ্ধুদ্ধ করার প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চার দফা প্রতিবেদন দাখিল করেছে। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এই বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। দেশব্যাপী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জঙ্গি তত্পরতা বৃদ্ধির পেছনে ড. রেজাউর রাজ্জাকের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি বলে গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে প্রমাণ মিলেছে। 
 
বর্তমানে ড. রেজাউর রাজ্জাক মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন বলে গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা। জানা গেছে, ড. রেজাউর রাজ্জাক ২০০১ সালে আমেরিকায় এফবিআইয়ের হাতে জঙ্গি সন্দেহে আটক হয়েছিলেন। সম্প্রতি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের কথা বলে দেশ ছাড়েন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. রেজাউর রাজ্জাক। সপরিবারে এ শিক্ষকের দেশ ছাড়ার প্রমাণ পেয়েছেন গোয়েন্দারা।
 
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের জন্যই মূলত দেশ ছেড়েছেন তিনি। অবশ্য গোয়েন্দা সূত্র বলছে, মালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির কথা বলে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নেন তিনি। অবশ্য সেখানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাননি।
 
এই রেজাউর রাজ্জাক ইসলামী ব্যাংকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আবদুর রাজ্জাক লস্করের ছেলে। তার বাসা ধানমন্ডির ৪ নম্বর রোডে। এই বাসার দুপাশে রাষ্ট্রের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অফিস রয়েছে। একপাশে একটি গোয়েন্দা সংস্থার অফিস। অন্যপাশে পুলিশ ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোর (পিআইবি) সদর দফতর। তার গ্রামের বাড়ি সিলেটে। ২৪ জুলাই তিনি দেশ ছেড়েছেন বলে গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছেন।
 
ইত্তেফাকের প্রতিনিধি তার ধানমন্ডির বাসায় গেলে ওই বাসার কেয়াটেকার আব্দুস সালাম বলেন, আমি এখানে এক বছর ধরে কাজ করছি। এটাই রেজাউর রাজ্জাক স্যারের বাসা। তবে ২/৩ সপ্তাহ ধরে স্যারকে দেখি না। তবে তিনি যে ২৪ জুলাই সপরিবারে দেশ ছেড়েছেন এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে।
 
তার পাসপোর্ট নম্বর পি০৬০৬৯৯৭। এটা ইস্যু করা হয় ২০০৮ সালে। সেই হিসেবে এটার মেয়াদ নেই। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, ড. রেজাউর রাজ্জাক দেশ ছাড়লেন কেমন করে? তাহলে নতুন নামে পাসপোর্ট করেছেন তিনি? নাকি দেশেই অবস্থান করছেন? জানা গেছে, সরকারের বিভিন্ন সংস্থায় তার ঘনিষ্ঠ লোকজন রয়েছে। তারাই তাকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
 
গোয়েন্দা তথ্য মতে, ’৯০ দশকের মাঝামাঝি পড়াশোনা শেষে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে রেজাউর ধানমণ্ডিতে চালু করেন রিসার্চ সেন্টার ফর ইউনিটি ডেভেলপমেন্ট (আরসিইউডি) নামে একটি এনজিও। এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আবদুর রশীদ চৌধুরী। ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশ থেকে আরসিইউডির অর্থ সংগ্রহ করা হতো। মূলত সেটাই ছিল তার জঙ্গি তত্পরতার মূল কেন্দ্র।
 
সন্ধ্যার পরে আরসিইউডি’র কার্যালয়ে নিয়মিত ‘হালাকা’ বা মজমা বসতো। সেখানে জঙ্গি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সেজাদ রউফ, তাজ-উল-ইসলাম রাশিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাহমিদ রহমান সাফি, ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির আরফান ইসলামসহ উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের মেধাবী সন্তান, হিযবুত তাহরীরের মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ জিয়াউল হক ও আনসার আল ইসলামের (আনসারুল্ল­াহ বাংলা টিম) প্রধান মুফতি জসিমুদ্দীন রাহামানীসহ কয়েকজন সদস্য এই মজমায় অংশ নিতেন। শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের জঙ্গিবাদে উত্সাহ দেয়াই মজমার মূল উদ্দেশ্য ছিল। এই প্রতিষ্ঠানটি জঙ্গি তৈরির অন্যতম কারখানা বলে গোয়েন্দাদের প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসে। ২০০২ সালে জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুসলেমিনের প্রতিষ্ঠাতাও ড. রেজাউর রাজ্জাক। এই সংগঠনের সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন শফিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই। 
 
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৫ সালে রেজাউর রাজ্জাক আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (এআইইউবি) ব্যবসা প্রশাসন বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এ সময় তিনি জঙ্গি সংগঠনের জন্য সদস্য সংগ্রহ, সমন্বয়, উদ্বুদ্ধকরণ প্রভৃতি কার্যক্রম চালান। সেখানে তিনি ছাত্রদের জঙ্গি মতবাদে উদ্বুদ্ধ করেন।
 
২০১০ সালের আগস্টে মালয়েশিয়ায় ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের কথা বলে তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। পরে মালয়েশিয়ায় না গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএর সান্ধ্যকালীন কোর্সের শিক্ষক হিসেবে যোগদানের তদবির চালান। সেখানেও ব্যর্থ হলে ২০১২ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস শাখায় সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। রেজাউর রাজ্জাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এন্টারপ্রিনারশিপের ডাইরেক্টর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। একইসঙ্গে তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেট ফোরামের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। তার আদর্শে উজ্জীবিত কিছু ছাত্রের সঙ্গে তিনি নিয়মিত গোপন বৈঠক করতেন বলে জানা গেছে।
 
 

ইত্তেফাক/এএন