আসন্ন ঈদুল আজহাকে (কোরবানির ঈদ) সামনে রেখে অসাধু খামারিরা নিষিদ্ধ ডাইক্লোফেন ও স্টেরয়েড হরমোন প্রয়োগ করে পশু মোটাতাজা করছে। এতে একদিকে যেমন প্রাণীটির স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে, অন্যদিকে এ ধরনের মাংস মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দীর্ঘমেয়াদে শুধু পঙ্গুত্ব বরণই নয়, কিডনি, লিভার নষ্ট ও বন্ধ্যত্বসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে। ২০১৪ সালে পশুর শরীরে নিষিদ্ধ ওষুধ ব্যবহার করে মোটাতাজা করা হয়েছে কি না পরীক্ষায় ঢাকা মহানগরীর কোরবানির হাটে চিকিত্সক নিয়োগের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়েছিল। পরে সরকার কোরবানির পশুর হাটে চিকিত্সক নিয়োগ দেয়।
মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, কেউ নিষিদ্ধ ওষুধ ব্যবহার করে কোরবানির পশু মোটাতাজা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত বছর সুস্থ সবল পশু পরীক্ষায় সারাদেশে পশুর হাটে ৪৯৪টি মেডিক্যাল টিম কাজ করলেও এবার টিমের সংখ্যা বাড়িয়ে ১ হাজার করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনগুলোর পাশাপাশি জেলা-উপজেলার হাটগুলোতেও এসব মেডিক্যাল টিম কাজ করবে।
এ ছাড়া ঈদের আগে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পশু মোটাতাজাকরণসহ বিভিন্ন ক্ষতিকারক ওষুধ যেন প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি না হয় তাও নিশ্চিত করা হবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতর সূত্র জানিয়েছে, পশুসম্পদ আইন-২০১০-এ ডাইক্লোফেন ও স্টেরয়েড হরমোন জাতীয় ইনজেকশন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হলেও অধিক লাভের আশায় অসাধু খামারিরা তা ব্যবহার করছেন। দেশে গরুর খামারের কোনো নিবন্ধন না থাকায় কতটি খামার রয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। খামারগুলো কীভাবে গরু প্রতিপালন করছে তা যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে না। ডাইক্লোফেন ও স্টেরয়েড হরমোন প্রয়োগের মাত্র এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি পশুর ওজন ১৫ কেজির বেশি বাড়ে। ইনজেকশন দেওয়ার ফলে গরুর কিডনি ও যকৃতের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে গরুর শরীর থেকে পানি বের হতে পারে না। এই পানি সরাসরি গরুর মাংসে চলে যায়। এতে গরু ফুলে যায়। দেখে মোটাতাজা মনে হয়। ক্রেতারাও আকৃষ্ট হয়। ফলে বিক্রি হয় ভালো দামে।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতর জানিয়েছে চলতি বছর দেশে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর জোগান রয়েছে এক কোটি ৫ লাখ। এর মধ্যে গরু-মহিষ প্রায় ৩৩ লাখ, ছাগল-ভেড়া ৭২ লাখ।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সাধারণত দেশের মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, নোয়াখালী, ফরিদপুর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর, নীলফামারী, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, মাদারীপুর, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, সাতক্ষীরার কোনো কোনো খামারে নিষিদ্ধ ওষুধ দিয়ে গরু মোটাতাজা বেশি হয়। তবে তা আগের চেয়ে অনেক কমেছে।
চিকিত্সকরা জানিয়েছেন, ডাইক্লোফেন ও স্টেরয়েড হরমোন জাতীয় ইনজেকশন প্রয়োগ করে যেসব গরু মোটাতাজা করা হয় সেসব গরু অস্বাভাবিক মোটা হয়, সব সময় একটা নিস্তেজ ভাব থাকে। ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারে না। এমনকি খাবারও ঠিকমতো খেতে চায় না। এসব গরুর পেছনের দিকে উরুর পেশিবহুল জায়গায় আঙুল দিয়ে চাপ দিলে তা দেবে যাবে। কারণ বাইরে থেকে মাংস মনে হলেও মাংসের সঙ্গে ব্যাপক পরিমাণে পানি থাকে। কৃত্রিমভাবে মোটা করা এসব গরু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জবাই না করলে মারা যায়।
অন্যদিকে বৈজ্ঞানিকভাবে গরু মোটাতাজা করলে গরুর স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, মাথা উঁচু, শরীর টানটান, তীক্ষ থাকবে। তাই গরু কেনার সময় ওজনে ভারী, ফোলা ও চর্বি জাতীয় গরু না কেনার পরামর্শ দিয়েছেন পশু চিকিত্সকরা।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্যবান গরু উত্পাদনের জন্য বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত এবং কৃষি বিভাগ অনুমোদিত পদ্ধতি রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় গরু কাঙ্ক্ষিত মোটাতাজা বা হূষ্টপুষ্ট হতে তিন থেকে ছয় মাস সময় নেয়। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা গরুপ্রতি খাবারের খরচ ও সময় কমাতে গরুকে (ছাগলকেও বটে) অতিরিক্ত ইউরিয়া, সিপ্রোহেপ্টাডিন, স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ, অ্যানাবলিক স্টেরয়েড, হরমোন ইত্যাদি খাওয়ানো বা ইনজেকশন দেয়। এতে পশুর শরীরে পানি এবং জলীয় পদার্থ জমে যায়। সঙ্গে চর্বিও জমে। ফলে পশুটিকে দৃশ্যত মোটা দেখাতে থাকে। এটি মূলত পশুটির একটি রোগাবস্থা মাত্র। গরুর শরীরে জমাকৃত স্টেরয়েড খাবার হিসেবে মানব শরীরে প্রবেশ করায় মানব শরীরে বহু ধরনের ও মাত্রার সমস্যা তৈরি হয়। কিডনি, লিভার হূিপণ্ডসহ মানব শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। শরীরের রক্তচাপ বেড়ে যায় যা থেকে ব্রেন স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। তাই সরকারকে এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক অজয় কুমার রায় বলেন, দেশের কোথাও ক্ষতিকর ইনজেকশনের মাধ্যমে পশু মোটাতাজার খবর পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া দেশের সব সিটি করপোরেশনসহ জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পশুর হাটে এক হাজার মেডিক্যাল টিম থাকবে। কোরবানির পশুর শরীরে ক্ষতিকর উপাদান পরীক্ষায় তারা কাজ করবেন।
ইত্তেফাক/এএন
