আজ ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র ৩৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দলটি এখন এর ইতিহাসের সবচেয়ে বন্ধুর পথ ও কঠিন সময় পার করছে। কয়েক মেয়াদে প্রায় ১৪ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা দলটি ক্ষমতার ভরকেন্দ্র থেকে ছিটকে পড়ে এখন বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। কেন্দ্র থেকে শুরু করে দলের প্রান্তিক নেতা-কর্মীদের অনেকে এমনটিই মনে করছেন। বিএনপির জন্মদিনের প্রাক্কালে দলটির বর্তমানে সক্রিয় ও প্রাক্তন নেতাদের কয়েকজন এবং রাজনীতির নিবিড় পর্যবেক্ষক-বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন ‘দেশের বৃহত্ দুটি রাজনৈতিক দলের একটি বিএনপি এখন সর্বত্র যেন ছন্নছাড়া, এলোমেলো।’
মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি গঠন করেন। তিনি ছিলেন দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। এরপর নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে ১৯৮৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বিএনপির হাল ধরেন তারই সহধর্মিণী খালেদা জিয়া। সেই থেকে টানা প্রায় ৩৩ বছর ধরে দলটির নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন তিনি।
জাগদল থেকে বিএনপি
১৯৭৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি জিয়াউর রহমান প্রথমে ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’ (জাগদল) গঠন করেন। তিনি নিজে দলটির দায়িত্বে না থেকে তত্কালীন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারকে এর চেয়ারম্যান নিযুক্ত করেন। তিনি ‘সমমনা’দের নিয়ে একটা বৃহত্তর রাজনৈতিক বলয় তৈরি করার লক্ষ্যে ’৭৮ এর ১ মে প্রতিষ্ঠা করেন ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’। এর চেয়ারম্যান হন জিয়াউর রহমান নিজে। রাজনৈতিক দল হিসেবে ’৭৮-এর ১ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করলেও বিএনপি সরকার পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৭টি আসন পায়। আওয়ামী লীগ ৩৯ আসন পেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ‘প্রথম সংসদীয় বিরোধী দল’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
এরশাদের আমলে বড় ধাক্কা খায় বিএনপি
জন্মের পর থেকে ভাঙা-গড়া আর নানা চড়াই-উত্রাইয়ের মধ্যে দিয়ে পথ চলছে বিএনপি। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান লে. জেনারেল এরশাদ যখন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন, এরপর বিএনপি বড় ধরনের ধাক্কা খায়। দলের অনেক শীর্ষ নেতা দল ছেড়ে এরশাদের সঙ্গে চলে যান। এর ফলে সংকটে পড়ে দলটি। জন্মের পর দলটি একাধিকবার ভাঙনের মুখে পড়ে।
এবারের সংকট শুরু ২০০৬ থেকে
১৯৯১ সাল থেকে দেশে দ্বি-দলীয় রাজনীতি মোটামুটি দাঁড়িয়ে যায়। পালা করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনা করছিল। এরপর বিএনপি নতুন করে সংকটে পড়ে ২০০৬ সালের শেষদিকে। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচন করতে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি এক-এগারোর থাবায় অনেকটা তছনছ হয়ে যায় দলটি। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে, আর মাত্র ৩০টি আসন নিয়ে বিরোধী দলের আসনে বসে বিএনপি।
ক্ষমতার বাইরে প্রায় ১০ বছর পার
২০১৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গভীর সংকটে পড়ে বিএনপি। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে অনড় থেকে শেষমেশ দলটি ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে। ওই নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েও তা না করতে পেরে আওয়ামী লীগকে তারা রীতিমতো ‘ওয়াকওভার’ দিয়ে দেয়।
মূলত তছনছ ১/১১’র থাবায়
জিয়াউর রহমান বিভিন্ন রাজনৈতিক মত-পথের অনুসারীদের এক মঞ্চে এনে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জন্মের তিন যুগেরও বেশি সময়ের মাথায় এসে দলটি বহুমতের সম্মিলন ঘটানোর সামর্থ্য তো হারিয়েছেই, পাশাপাশি দলের ঐক্য বা অভ্যন্তরীণ সংহতি এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে। এ অবস্থার জন্য কার্যত এক-এগারোর থাবাকে দায়ী করেন দলটির নেতারা।
আন্দোলনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে দলটির ভেতরে এখন প্রায় নির্জীব অবস্থা। এরপর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের একবছর পূর্তিতে গতবছরের শুরুতে টানা ৯৩ দিনের ফলশূন্য আন্দোলন দলটিকে আরও বেকায়দায় ফেলে দেয়। এরপর বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে মাঝে-মধ্যে আন্দোলনে নামার হাঁকডাক ছাড়া হলেও এখন আর সেটিও নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বিচারাধীন শত-শত মামলার খড়গ। বিদেশে অর্থ পাচারের মামলায় তারেক রহমানের ইতোমধ্যে সাত বছরের জেল দিয়েছে আদালত। দলের নেতা-কর্মীরা আশঙ্কা করছেন- দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে দেওয়া হতে পারে। এরপর বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা সক্রিয় হতে পারে। খালেদা জিয়া নিজেও সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার এমন আশঙ্কার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু সম্প্রতি ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন ‘বর্তমানে দেশের যে পরিস্থিতি, সরকারের যে নীতি তাতে রাজপথে আন্দোলন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এ রকম পরিস্থিতিতে থাকলে আওয়ামী লীগও আন্দোলন করতে পারতো না।’
এখন কিছুতেই নেই বিএনপি
আগাম নির্বাচন দাবি, আন্দোলন কিংবা দলকে গতিশীল করার এখন কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই বিএনপির। দলটির নেতারা বলছেন, এখন দল গোছানোর কাজ চলছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ১৯ মার্চ দলের জাতীয় সম্মেলনের পর দলের কমিটি ঘোষণা করা হলেও তা নিয়ে দলটির ভেতরে সৃষ্টি হয়েছে নতুন জটিলতা। কমিটি নিয়ে নেতাদের মধ্যে দলাদলি আরও বেড়েছে। ভেতরে-ভেতরে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বেশিরভাগ নেতা বিভক্ত হয়ে আছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির নতুন সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন ‘বিএনপি একটি বড় দল, ফলে এখানে নেতা অনেক, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা রয়েছে। এই প্রতিযোগিতা থাকাই স্বাভাবিক। তবে কমিটিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ ও নারীদের স্থান দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে যারা মনে করছেন তারা উপযুক্ত পদবি পাননি, সেটিও নিশ্চয়ই দলের হাইকমান্ড ভেবে দেখবে।’ তার মতে, ‘দেশের মানুষ বিএনপির সঙ্গে আছে, এটাই তো বড় শক্তি, বড় অর্জন।’
সোজা-ই হতে পারছে না
কাউন্সিলের পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন ‘বিএনপি ফিনিক্স পাখির মত ঘুরে দাঁড়াবে।’ কিন্তু কাউন্সিল ও কমিটি ঘোষণার পরেও বিএনপি দল গোছাতে পারেনি। ফিনিক্স পাখির মত ঘুরে দাঁড়ানো দূরের কথা, দলটি সোজা হয়েই দাঁড়াতে পারছে না।
অবশ্য দল গোছানোর বিষয়ে বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, দল সংগঠিত করার মত পরিবেশ বিএনপি পায়নি। সরকার নেতা-কর্মীদের ওপর যে পরিমাণে অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে, গুম, খুন করছে; ইচ্ছা থাকলেও দল সংগঠিত করা যাচ্ছে না।
এ পরিস্থিতিতে বিএনপির আবার ঘুরে দাঁড়ানো বা আন্দোলন কর্মসূচিতে যাওয়ার মত সাংগঠনিক অবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে সংশয় আছে। এ ব্যাপারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মন্তব্য ‘বিএনপি জনগণের দল, বিএনপি সমর্থক-নির্ভর দল। সুতরাং বিএনপি কখনও হারিয়ে যাওয়ার নয়। অন্ধকার কাটিয়ে আলো আসবেই।’
ইত্তেফাক/এএন
