মনের আলোয় বিদ্যা বিলান যিনি

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১১:৪০
কে বলবে তিনি চোখে দেখেন না! পথ চলেন একা একা। ঘর থেকে বের হয়ে বাজারসহ বিভিন্ন কাজ পর্যন্ত করেন। পথে পরিচিত কেউ কথা বললে ঠিকঠাক চিনেও ফেলেন। কিন্তু ফারুক আহম্মেদের আসল সাফল্য তার পেশায়। তিনি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা বড় বালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
 
নয়নে অচল কিন্তু মননে সচল ফারুক আহম্মেদের বাসা ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ভূল্লী বালিয়া এলাকায়। ৩৫ বছর বয়সী মানুষটি সব প্রতিবন্ধকতা জয়ের জীবন্ত এক উদাহরণ। এলাকার মানুষের প্রিয় মুখ ফারুক।
সদর উপজেলা ভুল্লী বালিয়া এলাকায় এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয় ফারুক আহম্মেদ। স্বাভাবিকভাবে জন্মগ্রহণ করলেও নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় (১৯৯৬ সালে) তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। সুচিকিৎসার অভাবে ধীরে ধীরে অন্ধ হয়ে যান।
 
দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর পরিবারের উৎকণ্ঠা ও হতাশার মাঝেই শুরু হয় ফারুকের পথ চলা। পাঁচ বছর পর ২০০১ সালে তিনি জানতে পারেন দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গেলেও পড়াশুনা করা যায়। তারপর একটু আশাতীত হয়ে জীবনটা নতুন করে সাজানোর স্বপ্ন দেখা শুরু করেন।
 
দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পড়াশোনা ব্যয়বহুল। অপরদিকে পারিবারিকভাবে তেমন স্বচ্ছলতা ছিল না। ফারুক নিজ উদ্যোগে দিনাজপুর জবলি স্কুল রির্সোস সেন্টারে মোহাম্মদ হাফিজ উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে পড়াশুনা শুরু করেন। এরপর ২০০৩ সালে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। পরবর্তীতে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ থেকে ২০০৫ সালে এইচএসসি পাস করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকর্ম বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করে ফারুক। এরপর ফারুক বালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। তারপর ৩৫ তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন।
 
চোখের আলো হারিয়ে যাওয়ায় প্রথাগত বৈষয়িক সাফল্য যার অধরা থেকে গেল সেই ফারুক কিন্তু নিজের জীবনকে অর্থহীন মনে করে থেমে যাননি। জ্ঞানের আলো ছড়ানোকেই করে নিলেন জীবনের ব্রত।
 
সরেজমিনে ওই বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, ক্লাশ চলাকালীন সকল শিক্ষার্থী মনোযোগ দিয়ে দৃষ্টিশক্তিহীন ফারুকের কথা শুনছেন। শিক্ষক ফারুক এমনভাবে শিক্ষার্থীদের বুঝাচ্ছেন যেন স্বাভাবিকভাবে শিক্ষাদান করছেন।
 
৩য় শ্রেণীর শিক্ষার্থী আম্বিয়া বলেন, ‘স্কুলের ফারুক স্যার আমাদের সকলের প্রিয়। উনার কারণে আমরা নিয়মিত স্কুলে আসি।’
 
দ্বিতীয় শ্রেণীর শামীম বলেন, ‘স্যার চোখে দেখতে পারে না। কিন্তু এত সুন্দর করে আমাদেরকে বুঝায় কেউ না দেখলে বুঝতেই পারবে না।’
 
বালিয়া এলাকার মিজানুর রহমান বলেন, ‘দৃষ্টিশক্তিহীন ফারুক এই এলাকার গর্ব। ইচ্ছে থাকলে সবকিছুই করা সম্ভব সেটা বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি। ফারুকের ইচ্ছে তিনি বিসিএস ক্যাডার হবেন। এই ইচ্ছেটা যেন তার পূরণ হয়।’
 
দৃষ্টিশক্তিহীন শিক্ষক ফারুক বলেন, ‘ইচ্ছে থাকলে সব কিছু করা সম্ভব সেটা প্রমাণ করার চেষ্টা করছি। শিক্ষার্থীরা আমার সন্তান। তাদেরকে সুনাগরিক করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। আমি ৩৫তম বিসিএস মৌখিক পরীক্ষায় ভালোই করেছিলাম। ভাইভা বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেছিলেন, কোনো সমস্যা নেই আপনি সকল প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। আমি একজন দৃষ্টপ্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও বিসিএসের সকল ধাপ পার করে ভাইবা বোর্ড থেকে এভাবে বিমুখ হয়ে গেলাম। আমি আমার অধিকার থেকে বঞ্চিত হলাম।’
 
তিনি আরো বলেন, ‘আমি ৩৭তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবো। পরবর্তীতে আবার প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারি কিনা শঙ্কা বোধ করছি।’
 
বড় বালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা জীবুন নেছা জানান, ফারুকের ক্লাস নেয়ার পদ্ধতি অবাক করার মত। তার কারণেই স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ৮০ ভাগ। ফারুক স্যার দৃষ্টিশক্তিহীন হলেও তার ইচ্ছে শক্তি প্রখর।
 
ইত্তেফাক/এএসএমইউ