ফুটবল খেলে দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনে পুরস্কারের বদলে ওরা পেল তিরস্কার! ওরা ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর স্কুল এন্ড কলেজের ৯ কিশোরী ফুটবলার। সম্প্রতি এএফসি অনুর্ধ্ব-১৬ টুর্নামেন্টের বাছাইপর্বে দেশের নারী ফুটবল দলের হয়ে খেলেছে এই কিশোরীরা। তাদের অসাধারণ নৈপূণ্যে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে টুর্নামেন্টের চূড়ান্তপর্বে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। এই অসামান্য অবদানের জন্য কলসিন্দুরের মেয়েদের যেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রীসহ সারাদেশের মানুষ অভিনন্দন জানিয়েছেন, সেখানে নিজের এলাকাতেই নানা ভাবে তিরস্কার ও লাঞ্চনার শিকার হচ্ছে এই মেয়েরা।
জানা গেছে, স্কুলের পক্ষ থেকে এই ফুটবলার মেয়েদের সংবর্ধনা না দেওয়ায় সমালোচনা হলে বুধবার তাদের মিষ্টিমুখ করানোর উদ্যোগ নেয় কলসিন্দুর স্কুল কর্তৃপক্ষ। সেখানে আলোচনার এক পর্যায়ে কুমিল্লায় অনুষ্ঠিতব্য আন্তঃস্কুল ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে এই কিশোরী খেলোয়াড় ও তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে অসদাচরণ ও দুর্ব্যবহার করেন স্কুলের শরীরচর্চা শিক্ষক জবেদ আলী তালুকদার। তিনি খেলোয়াড়দের স্কুল থেকে টিসি দেওয়ারও হুমকি দেন। এ ঘটনার জের ধরে অনুর্ধ্ব-১৬ দলের গোলকিপার তাসলিমার বাবা সবুজ মিয়াকে শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে সবুজ মিয়া ধোবাউড়া থানায় মামলা করেছেন। পলাতক রয়েছেন অভিযুক্ত শিক্ষক। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) কর্মকর্তাদের অদূরদর্শীতার কারণে খেলা শেষে ঢাকা থেকে লোকাল বাসে বাড়ি ফেরার পথেও হেনস্থার শিকার হয়েছে দেশকে গর্বিত করা এই মেয়েরা।
ধোবাউড়া থানার ওসি শওকত আলম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, ঘটনার দিন কলসিন্দুর স্কুলের হয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লায় আন্তঃস্কুল ফুটবল টুর্নামেন্টে অনুর্ধ্ব ১৬ দলের খেলোয়াড়দের খেলতে বলেন শিক্ষক জবেদ আলী তালুকদার। কিন্তু ১৭ সেপ্টেম্বর খেলোয়াড়দের ঢাকায় সংবর্ধনা থাকায় এবং বাফুফে অনুমতি না দেওয়ায় স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্টে খেলতে তারা ও তাদের অভিভাবকগণ অসম্মতি প্রকাশ করে। এ নিয়ে প্রথমে বাক-বিতন্ডা হয়। এসময় শিক্ষক জবেদ আলী তালুকদার তাদের অভিভাবকদের ভয়ভীতি দেখান। এমন কি মেরে ফেলার হুমকি এবং টিসি দিয়ে সবাইকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেন বলে লাঞ্চিত সবুজ মিয়া অভিযোগ করেছেন।
ওসি আরো জানান, এ ঘটনার পর রাত সাড়ে ৮টার দিকে কলসিন্দুর প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক মফিজ উদ্দিনকে বিষয়টি জানান তাসলিমার পিতা সবুজ মিয়া। এ খবর পেয়ে কলসিন্দুর বাজারে মহিলা মার্কেটে ফরহাদ টেইলার্সের দোকানে সবুজ মিয়াকে কিল-ঘুসি ও লাথি মেরে শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করেন জবেদ আলী তালুকদার। খবর পেয়ে পুলিশ রাতেই ঘটনাস্থলে যায় এবং খেলোয়াড় ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তায় সব ধরণের ব্যবস্থা নেয়। এ ঘটনায় পরদিন বৃহস্পতিবার দুপুরে সবুজ মিয়া শিক্ষক জবেদ আলী তালুকদারকে আসামি করে মামলা করেন। আসামি ধরতে পুলিশী তত্পরতা অব্যাহত রয়েছে বলে ওসি জানান।
এ ব্যাপারে অনুর্ধ্ব ১৬ জাতীয় নারী ফুটবল দলের গোলকিপার তাসলিমা জানায়, ‘স্কুলের ঘটনার জের ধরে আমার বাবাকে মারধর করেছেন ওই শিক্ষক।’ সবুজ মিয়া অভিযোগ করেন, ‘আমাকে মারধর করে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে।’
এ ঘটনায় অনুর্ধ্ব ১৬ দলের খেলোয়াড়, অভিভাবকসহ এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। খেলোয়াড়দের অভিভাবকরা গতকাল সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ধোবাউড়া থানায় অবস্থান করে এ ঘটনার বিচার দাবি করেন। ফুটবলার সানজিদার পিতা লিয়াকত আলীঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘স্কুলের শিক্ষকরা আমাদেরকে খারাপ ভাষায় গালি-গালাজ করে অপমান করেছেন। খেলোয়াড়দের অনেকেরই সামনে টেস্ট পরীক্ষা, এ সময় টিসি দেওয়ার হুমকি আমদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে। আমরা এর সুষ্ঠু ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’
এ ব্যাপারে কলসিন্দুর স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ জালাল উদ্দিন জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কলসিন্দুর স্কুল ও কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভায় অভিযুক্ত শিক্ষক জবেদ আলী তালুকদারকে সাময়িকভাবে বহিস্কার করা হয়েছে। তাকে ৪৮ ঘন্টা সময় দিয়ে কারণ দর্শনোর নোটিশ প্রদান করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সভায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় সহকারী শিক্ষক রতন মিয়াকে আহবায়ক করে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে রিপোর্ট প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে কমিটি।
এদিকে ঢাকা থেকে ধোবাউড়ায় ফেরার পথে মঙ্গলবার লোকাল বাসে (নিলয় পরিবহনে) অনুর্ধ্ব ১৬ দলের খেলোয়াড়দের হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে। জানা গেছে, ওই দিন বাসটি ত্রিশাল স্ট্যান্ডে পৌঁছার পর ফুটবলার নাজমা আক্তার গাড়ি থামিয়ে তার মামার সঙ্গে কথা বলতে গেলে যাত্রীরা বাধা দেন। এসময় কয়েকজন যাত্রী মেয়েদের নিয়ে কটুক্তি করে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ তাদের অভিভাবক ও ধোবাউড়াবাসী। তারা বলছেন, যাদের জন্য বাংলাদেশের এত সুনাম ছড়িয়ে পড়ল তাদেরকে বাফুফে কর্মকর্তারা লোকাল বাসে অভিভাবক ও কোন কর্মকর্তা ছাড়াই কীভাবে তুলে দিলেন?
প্রসঙ্গত, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে পরপর ৩ বার চ্যাম্পিয়ন হয়ে মেয়েদের ফুটবলে বিজয় যাত্রা শুরু করে কলসিন্দুর স্কুলের এই কিশোরী ফুটবলাররা। এক পর্যায়ে ২০১৪ সালে এএফসি অনুর্ধ্ব-১৪ ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলতে নেপালে পাড়ি জমায় বাংলাদেশের মেয়েরা। সেই দলে কলসিন্দুর স্কুল এন্ড কলেজের ১০ জন খেলে। চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের অভিনন্দন জানান। ধোবাউড়া-হালোয়াঘাট আসনের এমপি ও তত্কালীণ সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট প্রমোদ মানকিন তাদের নাগরিক সংবর্ধনা দেন। এরপর থেকে এশিয়া তথা বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের মেয়েদের তথা কলসিন্দুরের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। সর্বশেষ এএফসি অনুর্ধ্ব-১৬ টুর্নামেন্টের বাছাইপর্বে ৫ ম্যাচে অপরাজিত থেকে চূড়ান্তপর্বে জায়গা করে নেয় সানজিদা-মার্জিয়ারা।
ইত্তেফাক/এএন
