ফারা জেরিন খান মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে তার বাবাকে খুঁজছিলেন। ভিড়ের মধ্যে এক অভিভাবক তার গায়ে হাত দেন। প্রচণ্ড ঘৃণা আর ক্ষোভে অস্বস্তির এই অভিজ্ঞতা নিজের বাবাকে বলতে পারেননি তিনি। আজও তার মনে পড়ে অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনাটি। অবশ্যই অভিভাবকটির মেয়ে কিংবা ছেলেটিও ঐ পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। তিনি কিভাবে একাজটি করতে পারলেন। ফারা এখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ বর্ষের ছাত্রী। তারপর থেকে তিনি ভিড় এড়িয়ে চলেন, প্রতিদিন দুই’শ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে ক্লাসে আসেন।
রহিমা জান্নাত মীম হেজাব পরেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠান শেষে তাকে একদিন একটু রাত করেই বাড়ি ফিরতে হয়। সঙ্গে তার বাবাও ছিলেন। বাবার হাত ধরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর ভিড় এড়িয়ে রিকশা খুঁজছিলেন তারা। হঠাত্ বজ্রপাতের মতো স্পর্শ, আচমকা বাবাকে আরো শক্ত করে ধরা। মেয়ের মুখের অভিব্যক্তি আর পারিপার্শ্বিক অবস্থা মিলিয়ে বিষয়টি তার বাবাও বুঝতে পারেন। তারপরও চুপচাপ সামনে এগিয়ে যান। মীমের অভিযোগ, আমি পর্দা করি, তারপরও রেহাই পেলাম না?
মিরপুর থেকে বাসে প্রতিদিনই অফিসে আসেন জেসলিন। একটু আধটু স্পর্শ ধাক্কা উপেক্ষা করেই চলেন। একদিন বাসের পেছন থেকে সিটের পাশ দিয়ে হাত দিয়ে বার বার তার পিঠ স্পর্শ করার চেষ্টার বিষয়টি টের পেয়ে নিজের জুতো খুলে পেটাতে শুরু করেন লোকটিকে। এ ঘটনায় কেউ কেউ তার পক্ষ নিলেও অনেকে এত ছোট ঘটনায় পেটানো ঠিক হয়নি মন্তব্য করলে জেসলিনের দুঃখটা বেড়ে যায়। পেশাগত কারণ ছাড়াও পড়াশুনা, ছেলেমেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আনা নেওয়া, চিকিত্সা, কেনাকাটা এমন অনেক কারণে প্রতিদিন ঘরের বাইরে গিয়ে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন নারীরা। নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের জন্য নারীর ঘরের বাইরে আসতে হবে। এর কোনো বিকল্প নাই। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াচ্ছে জিডিপির আয়তন। কিন্তু নারীদের নিরাপত্তা কোথায়?
সিডও কমিটির প্রাক্তন চেয়ারম্যান অধ্যাপক সালমা খান ইত্তেফাককে বলেন, বিবিএস সার্ভে মতে, জীবিকার জন্য বেরিয়ে আসা অনেক শ্রমিক অনুকূল পরিবেশের অভাবে ঝরে পড়ে। দেখা যায়, তিন বছরে দেশের শ্রমবাজারে নারী শ্রমিকের প্রবেশ কমেছে ২.৫ শতাংশ। ২০১১ সালে শ্রম বাজারে নারী শ্রমিক ছিল ৩৬ শতাংশ, যা ২০১৩ সালে এসে দাঁড়ায় ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশে। এই অবস্থায় ঢাকা শহরের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কিছু এলাকার গার্মেন্টস শ্রমিকসহ পেশাজীবী ৫০ জন নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের মধ্যে ৪৬ জন নারীকেই নানাভাবে যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। মাত্র চারজন নারীকে এমন অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়তে হয়নি।
রাজধানীর মানিকনগর থেকে হেটে গুলিস্তানে গার্মেন্টস-এ কাজ করতে আসেন তানিয়া, মীম, আশিয়া মর্জিনা। তারা বাসে উঠে অনেক সময় জায়গা পান না। কন্ডাক্টর গায়ে হাত দেয়, আবার মহিলা সিট নাই বলে তাদের নিতেও চায় না।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারিয়ান নুসরাত মুমু জানান, তারা এমনভাবে ধাক্কা দেয় কিংবা স্পর্শ করে প্রতিবাদ করাও যায় না। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদিকা নূর বলেন, বাসের কন্ডাক্টর, হেলপারও কম যায় না। তারা সংরক্ষিত ১০টি সিটের বাইরে মেয়েদের বসতে দিতে চায় না। মনে হয় ঐ সিটগুলোর ওপর এখন লিখতে হবে নারী-পুরুষ সকলের জন্য।
এই সকল বিষয়ে আইনের ব্যবস্থা সম্পর্কে ব্যারিস্টার সারা হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, সরকারের আইন আছে। কিন্তু শুধু আইনে কাজ হচ্ছে না। আইনে বলা আছে, যৌন হয়রানি, শ্লীলতাহানি করা যাবে না। কিন্তু প্রতিদিনই নারী এমন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এই নির্যাতন বন্ধে সরকারকে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন এই আইনজীবী।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সভাপতি আয়শা খানম বলেন, অর্থনৈতিক, সামাজিক প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করে আমাদের মেয়েরা আজ দেশের প্রবৃদ্ধির আয়তন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। তাদের যৌন নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত হওয়ার নয়। তারপরও হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, এই সমস্যা সমাধানে দ্বিপাক্ষিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন জরুরি। যেমন- আইনগুলোর বাস্তবায়ন, দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে হটলাইন ১০৯২১ কার্যকর করা।
পুলিশের ভূমিকা প্রসঙ্গে ডিএমপি যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, অনেকের ধারণাই থাকে পুলিশ সহযোগিতা করবে না। এমন নানা কারণে পুলিশকে এড়িয়ে চলে মানুষ, যা ঠিক নয়। তবে অনেক পুলিশ আছে যারা এই বিষয়টি আমলে আনে না। কিন্তু অবস্থা পরিবর্তনে সচেতন হতে হবে নারীকে, কোনো পুলিশ আমলে না নিলে তার ঊর্ধ্বতন কর্তার কাছে যেতে হবে। অবশ্যই নারীকে অভিযোগ করতে হবে এবং যে তাকে সহযোগিতা করবে না তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, পুলিশকে নারীবান্ধব করার প্রশিক্ষণের বিষয়ে তার মন্ত্রণালয় থেকে একাধিকবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে এবং এ বিষয় কাজ চলছে। তিনি বলেন, নারীদের সাহায্যার্থে হেলপ লাইনটি কাজ করছে, তবে জনসংখ্যার তুলনায় লোকবলের অভাব থাকায় সবাইকে সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, টোল ফ্রি হেলপ লাইনটি (১০৯২১) সবার কাছে পৌঁছে দিতে আগামী বছর পাঠ্যবইয়ের পেছনে এবং বাসের দেয়ালে লিখে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ইত্তেফাক/এএন
