এই প্রথম ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার সিংহেশ্বর ইউনিয়নের নিশুনিয়াকান্দা গ্রামে শামুকখোল এসেছে। প্রকৃতি পেয়েছে নতুন সম্ভার। শামুকখোল আশ্রয় নিয়েছে ওই গ্রামের শহিদুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে। জানা গেছে, শহীদুল ইসলামের বাড়িতে সারা বছর নানা ধরনের পাখি আশ্রয় নিয়ে থাকে। শামুকখোল এসেছে এবারই প্রথম।
শামুকখোল সারসজাতীয় পাখি। ভারী, লম্বা ঠোঁট। ধূসর সাদা রঙের দৃষ্টিনন্দন পাখি। দেখতে অনেকটা বক পাখির মত। শামুক ভেঙ্গে খেতে পারে বলে নাম শামুকখোল। বাংলাদেশের স্থায়ী পাখি শামুকখোল। দেশের কয়েকটি এলাকায় বাসস্থল রয়েছে এদের। কিন্তু পাখিটি এখন দুর্লভ প্রজাতির তালিকায়। সচরাচর চোখে পড়ে না। এ পাখি সকালে ঝাঁক বেঁধে আহারের সন্ধানে আশ্রয়স্থল থেকে বেরিয়ে যায়। সন্ধ্যার আগে আবার ঝাঁক বেঁধে ফিরে আসে।
আকস্মিক শীত মৌসুমে কংশ নদীর তীর ঘেঁষে একটি বাড়িতে ঝাঁকে ঝাঁকে শামুকখোল আশ্রয় নেয়। শীত পেরিয়ে গেলেও নিরাপত্তাবোধ করায় এখনো রয়ে গেছে তারা। জায়গাটি যেন তাদের জন্য অভয়ারণ্য। সেখানে অনেক শামুকখোল অবস্থান করলেও এখনো বাসা বাঁধেনি। শিমুল ও অন্য উঁচু গাছের ডালে একসঙ্গে বাস করছে।
তাদের পাখার ঝাপটা আর কোলাহলে আকাশ-বাতাস মাতিয়ে রাখে। অপরূপ শৈলী শামুকখোলের ডেরায়। সকালে সোনালী রোদ আর গোধূলির মৃদু আলোয় তাদের অবয়ব বাড়তি এক অপূর্ব সৌন্দর্যের অবতারণা ঘটায়। আশ্রয়স্থলের আশপাশে ঝাঁকে ঝাঁকে ওড়াউড়ি করে যেন ডানায় ডানায় ভোরের আলো ফোটায় ও গোধূলির আভায় সন্ধ্যা নামায়। এ দৃশ্য অমলিন।
দিনশেষে তাদের নীড়ে ফেরার দৃশ্য তাক লাগায়। মনে হয় হেলিপ্যাডে নামছে হেলিকপ্টার। নয়নাভিরাম এ দৃশ্য যে কাউকে মোহিত করে। দূর থেকে গাছে তাকালে মনে হয় ডালে ডালে বড় ফল ধরে আছে। সরেজমিনে দুইদিন গিয়ে মনোরম মাতাল করা পাখি ও প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য চোখে পড়েছে।
শামুকখোল আশ্রয় নেওয়া বাড়ির মালিক শহিদুল ইসলাম জানান, তাদের বাড়িতে পাখি বাস করে সারা বছর। এবারই প্রথম শীতে প্রচুর শামুকখোল তাদের বাড়ির বড় গাছে আশ্রয় নিয়েছে। সকালে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে গেলেও দিনশেষে আবার ফিরে আসে। এতো পরিমাণ এসেছিল যে, গাছের ডাল পাখির ভারে নুইয়ে পড়তো। বাড়ির আশপাশ পাখির মলে সাদা হয়ে যেতো। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়তো মলের। এখন শীত চলে গেলেও কয়েকশো শামুকখোল রয়ে গেছে।
কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে শহিদুল জানান, চৈত্রমাসে খাল-বিল, নদী-নালা শুকিয়ে যাওয়ায় খাদ্যাভাব দেখা দেয়। তাতে অনেক শামুকখোল অজানায় চলে গেছে।
ওই বাড়ির আব্দুল মতিন জানান, নিশুনিয়াকান্দা গ্রামের কংশ নদীর তীরে তাদের বাড়িতে সারা বছর নানা জাতের পাখি বাস করে। তারা নিজেরা কখনো পাখি ধরার লোভ করে না এবং তাড়ানোর চেষ্টাও করে না। পাখির সঙ্গে তাদের নিরীহ আচরণ। যেন পাখিগুলো তাদের পরিবারের সদস্য। তাই জন্মেছে গভীর মমত্ববোধ ও ভালোবাসা।
কেউ পাখি শিকার করতে চাইলে বাঁধা দেন তারা। নিরাপদ আশ্রয়স্থল মনে করে পাখিরা এখানে এসে অবাধ বিচরণ করে সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে মতিন। বনের পাখিকে তারা নিজের পোষা পাখিই মনে করে। বক, শালিক ও পানকৌড়ি বাসা বানিয়ে ছানা ফোটায়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াতে তাদের বাড়ি-ঘরে নিরাপদ আশ্রয় নেয় এসব পাখি। এসব পাখির নিরাপদ বিচরণ দেখে এবারই প্রথম শামুকখোল এসেছে বলে ধারণা তাদের।
বর্ষাকালে শামুকখোলের প্রজনন শুরু হয়। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস এদের প্রজননের মৌসুম।এলাকাবাসী বলছে, পাখির নিরপাদ আশ্রয়স্থল বাড়ির গৃহকর্তা সুরুজ আলী ও মৃত বাছেদ আলীর লোকজনের পাশাপাশি তারাও পাখির নিরাপত্তা দেখভাল করে। গ্রামের সবাই তাদের গ্রামে আশ্রয় নেওয়া পাখির অবাধ বিচরণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সচেতন রয়েছে। কোন চোরা শিকারি তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে শিকার করতে পারে না।
আরও পড়ুনঃ একাত্তরের গণহত্যার বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরবে জাতিসংঘ
পাখি বিশারদ আলম শাইন এই প্রতিনিধিকে বলেন, উঁচু শিমুল, আম, বট ইত্যাদি গাছে বাসা বানায় শামুকখোল। এরা ভীতু পাখি নয়। শামুক ছাড়া মাছ, ব্যাঙ খেয়ে বাঁচে। রাতে শিকার করে না। নিরাপদ হলে আজীবন কাটিয়ে দেয় একি আশ্রয়স্থলে। পৃথিবীতে দুই প্রজাতির শামুকখোল রয়েছে: এশীয় শামুকখোল, সাদা বর্ণের পাখি, পিঠ ও ডানার অংশ কালো। ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থায়ী পাখি। আফ্রিকান শামুকখোল, সম্পূর্ণ কালো বর্ণের। শামুকখোল ৩ -৫ টা ডিম পাড়ে। ৩০-৩৫ দিনে ডিম থেকে ছানা ফোটে।
ইত্তেফাক/নূহু
