সাজাপ্রাপ্ত বন্দীদের কারামুক্তির একটি প্রতিবন্ধকতা দূর হলো। সুপ্রিম কোর্ট এক নির্দেশনামায় জানিয়েছে, অর্থ দণ্ড পরিশোধের পর সাজার মেয়াদ উত্তীর্ণ বন্দীর কারামুক্তিতে বিলম্ব করা যাবে না। এর আগে অর্থ দণ্ড পরিশোধের পরেও আদালতের নির্দেশ না আসা পর্যন্ত সাজাপ্রাপ্তরা কারাগার থেকে মুক্ত হতে পারতেন না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে মামলার নথিও খুঁজে পাওয়া যেত না। তাছাড়া আদালত কেন্দ্রিক জটিলতার কারণেও অর্থ দণ্ড পরিশোধকারী বন্দীর কারামুক্তির ক্ষেত্রে অসুবিধা হতো। বিষয়টি প্রধান বিচারপতির নজরে আসলে গতকাল মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়। এর আগে সুপ্রিম কোর্টের ফুল কোর্ট সভায় এই নির্দেশনা অনুমোদন করা হয়।
ফৌজদারি মামলায় বিচারিক আদালত দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে সাজা প্রদানের পাশাপাশি অনেক সময় অর্থ দণ্ড আরোপ করে থাকে। ওই দণ্ডের অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে আদালত আসামিকে অনাদায়ে এক বছর, ছয় বা এক মাস অথবা স্বল্প মেয়াদে বিভিন্ন দণ্ড দিয়ে থাকে। মূল দণ্ড ভোগের শেষ মুহূর্তে এসে তা পরিশোধ করে থাকেন আসামির স্বজনরা। এজন্য কারা কর্তৃপক্ষ দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্বজনদেরকে বিচারিক আদালতে পাঠিয়ে থাকেন। কারণ, জরিমানা আদায় সংক্রান্ত কারাবিধির ৫৩৩ ধারায় বলা আছে, ‘কারা তত্ত্বাবধায়ক অথবা কারা পরিদর্শক জরিমানার অর্থ গ্রহণ করতে পারবেন না। এক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষ জরিমানা প্রদানের জন্য কারাবন্দীর প্রতিনিধি বা আত্মীয়-স্বজনকে জরিমানার নির্দেশ প্রদানকারী আদালতে পাঠাবেন।’ এর ফলে বন্দীদের স্বজনদেরকে অনেক সময় ভোগান্তিতে পড়তে হতো।
গত জুলাই মাসে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার পরিদর্শনকালে জরিমানা আদায়ের এই পদ্ধতি সহজ করার জন্য প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার কাছে অনুরোধ করেন আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন আহমদ। পরে প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্ট বরাবর এ বিষয়ে চিঠি লেখার জন্য আইজি প্রিজনকে পরামর্শ দেন। সেই পরামর্শ মোতাবেক কারা কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর একটি চিঠি লেখেন। ওই চিঠিতে বলা হয়, ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বন্দীরা অনেক সময় জরিমানার অর্থ পরিশোধ করতে না পেরে কারাদণ্ড ভোগ করেন। এতে কারাবাস দীর্ঘায়িত হয়। এর ফলে কারাগারের জায়গা খালি হতে সময় লাগে এবং সরকারেরও ব্যয় বাড়ে। এরপরই প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার আবু সৈয়দ দিলজার হোসেনকে সভাপতি করে ৫ সদস্যের একটি কমিটি করে দেন। ওই কমিটি প্রচলিত বিধানের পরিবর্তে জরিমানা প্রদানের বিষয়টি কিভাবে আরো সহজ করা যায়, সেই বিষয়ে সুপারিশ করেন। ওই সুপারিশ গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ফুল কোর্ট সভায় বিস্তারিত পর্যালোচনা শেষে অনুমোদন দেওয়া হয়।
গতকাল সুপ্রিম কোর্টের জারি করা সার্কুলারে বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতির গোচরীভূত হয়েছে যে সাধারণত অর্থ দণ্ডসহ কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীরা বিধি অনুযায়ী দণ্ড ভোগ করাকালীন মেয়াদ শেষ হওয়ার কাছাকাছি সময়ে অথবা শেষ হওয়ার পর তাত্ক্ষণিকভাবে অর্থ দণ্ড পরিশোধে আগ্রহী হন। বিদ্যমান জেল কোড এর বিধান অনুযায়ী কারা কর্তৃপক্ষ বরাবর অর্থ দণ্ড সরাসরি পরিশোধের সুযোগ না থাকায় সাজাপ্রাপ্ত অধিকাংশ বন্দীর প্রতিনিধি বা নিকট আত্মীয়দের পক্ষে আদালতে গিয়ে অর্থদণ্ড পরিশোধ করা সহজসাধ্য হয় না। অনেক ক্ষেত্রে আইনজীবীর শরণাপন্ন হতে হয়। মামলার নথি তাত্ক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় না। ক্ষেত্রভেদে ঊর্ধ্বতন আদালতে নথি পাঠানোর কারণে তা সংশ্লিষ্ট আদালতে সংরক্ষিত থাকে না। এসব কারণে সহজে অর্থদণ্ড পরিশোধ করা সম্ভব হয় না।
আবার দণ্ডপ্রদানকারী আদালত থেকে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি দূরবর্তী ভিন্ন কোনো জেলার কোনো কারাগারে আটক থাকলে বা তার আত্মীয়-স্বজন দূরে বসবাস করলে অর্থ দণ্ড পরিশোধ কষ্টসাধ্য, সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। এসব জটিলতার কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বন্দীরা সময়মতো অর্থ দণ্ড পরিশোধ করতে না পেরে অতিরিক্ত কারাদণ্ড ভোগ করেন। সরকারের ব্যয় বাড়ে এবং কারাগারে বন্দীর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। এ কারণে কোনো আদালত কর্তৃক কারাদণ্ড ও অর্থ দণ্ড একত্রে আরোপ করা হলে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির প্রতিনিধি অথবা নিকট আত্মীয় সংশ্লিষ্ট আদালতের পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অথবা সোনালী ব্যাংকে (রায় প্রদানকারী আদালত যে জেলায় অবস্থিত সেই জেলার বা জেলার কারাগারে আসামি অবস্থান করছেন সেই জেলার ব্যাংকে) ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা দিতে পারবেন। এরপর ট্রেজারি চালানের কপি কারাবন্দী যে কারাগারে দণ্ডভোগ করছেন সরাসরি সেই কারা কর্তৃপক্ষের নিকট দাখিল করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কারা কর্তৃপক্ষ ট্রেজারি চালানটি প্রাপ্তির পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে অনলাইনে/টেলিফোনের মাধ্যমে চালনটির সঠিকতা এবং সাজা পরোয়ানায় উল্লেখিত অর্থদণ্ডের পরিমাণ যাচাই করবেন। এক্ষেত্রে আরোপিত সমুদয় অর্থ দণ্ড পরিশোধ করা হয়েছে মর্মে সন্তুষ্ট হলে বিধি মোতাবেক কারাবন্দীকে মুক্তি প্রদান করবেন। এছাড়া অর্থ দণ্ড পরিশোধ ও কারাবন্দীর মুক্তি প্রদানের বিষয়টি বিচারিক আদালতকে অবহিত করবেন। জারিকৃত সার্কুলার আইজি প্রিজন, দেশের সকল জেলা ও দায়রা জজ, মহানগর দায়রা জজ, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং সিনিয়র জেল সুপার, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিসহ সকল জেলা বারে পাঠানো হয়েছে। এদিকে প্রধান বিচারপতির এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বিচারপ্রার্থী জনগণ ও কারাবন্দীরা।
হাইকোর্টের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার (প্রশাসন ও বিচার) সাব্বির ফয়েজ ইত্তেফাককে বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের মুক্তি প্রদানের বিষয়টি সহজ করতেই এই সার্কুলার জারি করা হয়েছে। এর ফলে বন্দীরা খুব দ্রুত অর্থ দণ্ড পরিশোধ করে কারামুক্তি লাভ করতে পারবেন।
ইত্তেফাক/এএন
