অভিবাসন সমস্যা নিয়ে বিশ্বনেতাদের আরো দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রজেক্ট সিন্ডিকেট ডটওরগে প্রকাশিত এক উপ-সম্পাদকীয়তে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তার লেখা এই কলামে বলেন, অভিবাসী নেয়ার অনেক সুবিধার বিষয়ে আমরা জানি। কিন্তু সম্প্রতি সংগঠিত ভাগে ও সহযোগিতার ভিত্তিতে অভিবাসন না হওয়ায় আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগর সহ বেশ কিছু অঞ্চলে তীব্র সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু এই বছর ভুল ভাবে অভিবাসনের চেষ্টা করে মারা গেছেন ৪ হাজার ৩০০ জন মানুষ। এর মধ্যে শুধু ভূমধ্যসাগরেই মারা গেছেন ৩ হাজার ২০০ জন। এ ছাড়াও বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী আন্দামান সাগরে কয়েক হাজার মানুষ কোন তীরে তাদের নৌকা থেকে নামতে না পেরে সাগরেই আটকা পড়ে থাকে অথবা তারা মানব পাচারকারীদের বন্দিতে পরিণত হয়।
তিনি বিশ্বনেতাদের আহ্বান জানিয়ে বলেন, জাতিসংঘ ভুক্ত দেশগুলোর সরকার প্রধানদের উচিত বিষয়টি নিয়ে ভাবা এবং এবারের সাধারণ অধিবেশনে অভিবাসন ও শরণার্থী সমস্যার সমাধানের পন্থা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা।
তিনি বলেন, বিশ্বনেতাদের উচিত এই বিষয়ে তাদের দৃঢ় সমর্থন প্রদান করা। সেই সঙ্গে অভিবাসন ও শরণার্থী সমস্যা মোকাবেলায় জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুনের প্রস্তাব অনুসারে ২০১৮ সালে আন্তঃসরকারী কনফারেন্স হওয়া উচিত।
এ সময় তিনি বলেন, প্রতিটি দেশের সরকার সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক অভিবাসন প্রক্রিয়ার একটি নীতিমালা তৈরি করতে পারে। এটি হতে পারে অভিবাসন প্রক্রিয়াকে সঠিক পথে পরিচালনার উপায়। সেই সঙ্গে প্রতিটি দেশের উচিত তার অভিবাসান প্রত্যাশী নাগরিকদের শিক্ষিত করে তোলা।
প্রধানমন্ত্রী তার লেখায় জানান, কোন দেশের সরকার যখন কার্যকরভাবে অভিবাসনে ব্যর্থ হয়, তখন সেখানে সৃষ্টি হয় পাচারকারীর। তারা মানবপাচার থেকে শুরু করে সংগঠিত অপরাধও পরিচালনা করে। এর ফলে অভিবাসন প্রত্যাশী, অভিবাসন প্রত্যাশীর দেশ এবং এই অভিবাসীরা যেই দেশে অবৈধ পথে যায়, তারা প্রত্যেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'গ্লোবাল ফোরাম অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট'-এর বর্তমান প্রধান হিসেবে বাংলাদেশ যে সকল বিষয় জেনেছে তা সবাইকে জানাতে আমরা আগ্রহী। কিন্তু অভিবাসন ক্ষেত্রে নতুন এক ব্যবস্থাপনা তৈরি করা হলে তা পুরাতন সকল ধরণের অভিবাসন চুক্তির ক্ষেত্রে সমস্যা করতে পারে। তাই বিশ্বনেতাদের উচিত বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে কাজটি না করে সকল বিষয় বিবেচনায় এনে বৈশ্বিক একটি আইন তৈরি করা। আমাদের সৌভাগ্য 'ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন' (আইওএম) জাতিসংঘের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরো যুগোপযোগী করার ক্ষেত্রে আইএমও বড় ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।
অভিবাসন প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জাতিসংঘ ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে চলতি চুক্তিগুলোর মাধ্যমেই বাস্তবায়ন সম্ভব বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এটি সম্ভব হবে ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন, ২০১৫ সালে হওয়া আদ্দিস আবাবা অ্যাকশন এজেন্ডা, স্বাস্থ্য গত ঝুঁকি হ্রাসে ২০১৫ সালে গঠিত সেন্টাই ফ্রেম ওয়ার্ক এবং ২০১৩ সালের 'হাই লেভেল ডায়লগ অন ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এর ডিকলারেশনের মাধ্যমে।
অভিবাসনকে একটি বহুমুখী সমস্যা আখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি সমাধানে সমন্বিত প্রয়াস প্রয়োজন। তিনি বলেন, দেশ ও এনজিওগুলোকে এই সমস্যা সমাধানে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।
কার্যকর অভিবাসন ব্যবস্থাপনার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান ও আইনি কাঠামো প্রয়োজন বলে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে দেশগুলোর মধ্যবর্তী স্বার্থগত বিভিন্ন দ্বন্দ্বের সমাধান করা যাবে।তিনি বলেন, প্রতিটি দেশের সার্বভৌম অধিকার নিজ দেশের সীমানাকে রক্ষা করা। কিন্তু সেই ক্ষেত্রে অভিবাসন প্রত্যাশী বা শরণার্থীদের মানবিক অধিকার, তাদের ইচ্ছা, ভাল একটি জীবন সন্ধানের অধিকারের সমন্বয় কিভাবে সম্ভব, তা আমাদের ভাবতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বশেষে লেখেন, ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডার মূল লক্ষ্য সকল দেশ যেন তাদের দায়িত্ব এবং সেই সঙ্গে তাদের উন্নয়নকে ভাগ করে নিতে পারে। আমি মনে করি সময় হয়েছে বিশ্ব নেতাদের নতুন করে ভাবার। কিভাবে অশিক্ষাকে দূর করে বিশ্বব্যাপী সমন্বিত উন্নয়ন সম্ভব। প্রজেক্ট সিন্ডিকেট ডটওরগ।
ইত্তেফাক/আরএ
