'সন্ত্রাসীদের অর্থ-অস্ত্রের যোগান ও সমর্থন দেবেন না'

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১৪:৫৬
সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদীদের অর্থ ও অস্ত্রের যোগান বন্ধ এবং তাদের প্রতি নৈতিক ও বৈষয়িক সমর্থন না দিতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 
স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭১তম অধিবেশনে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সন্ত্রাসের পরামর্শদাতা, মদদদাতা ও প্রশিক্ষকদের খুঁজে বের করতে হবে। 
 
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির চিত্রও বিশ্বনেতাদের অবহিত করেন। টানা আট বার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সন্ধ্যা ৭ টা ৪০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণ শুরু করেন এবং প্রায় ২০ মিনিটের দেয়া এই ভাষণ শুধুমাত্র দেশিয় পরিমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, প্রাধান্য পেয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা, অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার আদায়, নারীর ক্ষমতায়ন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার মতো সাম্প্রতিক ইস্যুগুলো। এসেছে বিশ্বমানবতার কথা।
  
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বলেন, বর্তমান সময়ের দুটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ জঙ্গিবাদ ও সহিংস চরমপন্থা। এই চ্যালেঞ্জগুলো কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে আবদ্ধ না থেকে বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। কোনো দেশই আপাতদৃষ্টিতে নিরাপদ নয়। কোনো ব্যক্তি এদের লক্ষ্যের বাইরে নয়। আমেরিকা থেকে ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে এশিয়ায়, অগণিত মানুষ সন্ত্রাসবাদের শিকার হচ্ছে। 
 
গত ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে ভয়ংকর সন্ত্রাসী হামলা বাংলাদেশের জনগণের মনে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। 
 
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা এই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি। 
 
নিজে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে আছেন।
 
শেখ হাসিনা বলেন, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে দেশের জনগণকে সচেতন করতে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। এতে সাড়া দেওয়ার জন্য পুরো জাতির প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। সমাজের প্রত্যেক স্তর থেকে অভূতপূর্ব সাড়া মিলছে। 
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি আত্মবিশ্বাসী যে জনগণের দৃঢ়তা ও সহযোগিতায় বাংলাদেশের মাটি থেকে সন্ত্রাসীদের সমূলে উচ্ছেদ করতে সক্ষম হবেন। 
 
শেখ হাসিনা বলেন, আগামী ডিসেম্বরে গ্লোবাল ফোরাম অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (জিএফএমডি) আয়োজন করা হচ্ছে। সেখানে অভিবাসন-বিষয়ক গঠনমূলক সংলাপের প্রত্যাশা করছেন তিনি। 
 
জাতিসংঘের বিদায়ী মহাসচিব বান কি মুনের ভূমিকার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি (মুন) সব সময়ই একজন বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়নের অর্জনগুলোকে বাকি বিশ্বের জন্য ‘রোল মডেল’ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
 
শেখ হাসিনা বলেন, নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারীশিক্ষা বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপের ফল পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের নারীরা এখন উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশীদার। সব পেশায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে।
 
বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, সম্ভবত বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা, বিরোধদলীয় নেতা, স্পিকার, সংসদ উপনেতা সবাই নারী।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বায়নের এই যুগে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যদি সঠিক পন্থা অবলম্বন করা হয়, তাহলে সম্ভাবনা ও সুযোগও রয়েছে অনেক।
 
বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, এক মানবতার জন্য কাজ করার উদ্দেশ্যে আমরা সকলে এখানে সমবেত হয়েছি। মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আসুন আমরা মানবতার স্বার্থে অভিন্ন অবস্থানে উপনীত হই। বিশ্ব থেকে সংঘাত দূর করে শান্তির পথে এগিয়ে যাই। 
 
শেখ হাসিনা তার ভাষণে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা স্মরণ করে বলেন, ১৯৭৪ সালে এই মহান সাধারণ পরিষদে তিনি বলেছিলেন, শান্তির প্রতি যে আমাদের পূর্ণ আনুগত্য, তা এই উপলদ্ধি থেকে জন্মেছে যে একমাত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই আমরা ক্ষুধা, দারিদ্র, রোগ-শোক, অশিক্ষা ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য আমাদের সকল সম্পদ ও শক্তি নিয়োগ করতে সক্ষম হবো।
 
আমাদের বিশ্ব বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যখন এসকল অভিশাপ থেকে মুক্তি খুব একটা দূরে নয়। অনেক সৃজনশীল এবং প্রায়োগিক সমাধান এখন আমাদের নাগালের মধ্যে। প্রযুক্তি, নব্য চিন্তাধারা এবং বৈশ্বিক নাগরিকদের বিস্ময়কর ক্ষমতা আমাদের একটি নতুন সাহসী বিশ্ব সম্পর্কে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করছে। তবে এখনও আমাদের এই বিশ্ব উত্তেজনা এবং ভীতিকর পরিস্থিতি থেকে মুক্ত নয়। বেশ কিছু স্থানে সহিংস-সংঘাতের উন্মত্ততা অব্যাহত রয়েছে। অকারণে অগণিত মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। 
 
যারা সংঘাত থেকে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছেন, প্রায়ই বিভিন্ন দেশ তাদের নিরাপত্তা দিতে অস্বীকার করছে। কখনও কখনও অত্যন্ত জরুরি মানবিক চাহিদা অগ্রাহ্য করা হচ্ছে অথবা সেগুলো প্রবেশে বাধার সৃষ্টি করা হচ্ছে।
 
প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রাখেন, কী অপরাধ ছিল সাগরে ডুবে যাওয়া সিরিয়ার ৩-বছর বয়সী নিষ্পাপ শিশু আইলান কুর্দীর? কী দোষ করেছিল ৫-বছরের শিশু ওমরান, যে আলেপ্পো শহরে নিজ বাড়িতে বসে বিমান হামলায় মারা বা আহত হয়েছে? একজন মা হিসেবে আমার পক্ষে এ সকল নিষ্ঠুরতা সহ্য করা কঠিন। বিশ্ব বিবেককে কি এসব ঘটনা নাড়া দিবে না?
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখে জাতিসংঘে অভিবাসী ও শরণার্থী বিষয়ক একটি ঐতিহাসিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমি আশা করি, এই সম্মেলনের ফলাফল বর্তমান সময়ে অভিবাসনের ধারণা এবং বাস্তবতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে সাহায্য করবে। অভিবাসী ও শরণার্থীদের স্বদেশ এবং গন্তব্য উভয় স্থানের জন্যই সম্ভাবনাময় পরিবর্তনের নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। 
 
বাংলাদেশ নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং নিয়মিত অভিবাসন সংক্রান্ত গ্লোবাল কমপ্যাক্ট-এর রূপরেখা প্রণয়নে সহযোগিতা করতে আগ্রহী। আগামী ডিসেম্বর মাসে আমরা গ্লোবাল ফোরাম অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (জিএফএমডি) আয়োজন করতে যাচ্ছি। এই ফোরামে আমরা অভিবাসন-সম্পর্কিত সকল বিষয়ে গঠনমূলক সংলাপের প্রত্যাশা করছি।  
 
তিনি বলেন, গত বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে আমরা একটি উচ্চাভিলাসী উন্নয়ন এজেন্ডা-টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) গ্রহণ করেছি। এই এজেন্ডার রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে পশ্চাৎপদ দেশগুলোর জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ এবং অর্থবহ অবলম্বনে রূপান্তরিত করা প্রয়োজন। এজন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে সম্মত উন্নয়ন প্রতিশ্রুতিসমূহের সঠিক বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই স্বল্পোন্নত  দেশগুলোর পক্ষে তাদের বর্তমান অবস্থান থেকে উত্তরণ সম্ভব। উদ্ভাবন এবং সম্ভাব্য সম্পদ সরবরাহ ব্যবস্থা জোরদার করতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য প্রস্তাবিত প্রযুক্তি ব্যাংককে দ্রুত কার্যকর করতে হবে। 
 
তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যেই বেশিরভাগ এসডিজিগুলোকে আমাদের জাতীয় উন্নয়ন নীতিমালায় সম্পৃক্ত করেছি। কাজের সমন্বয় ও যাচাইয়ের জন্য আমার তত্ত্বাবধানে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শ চলমান রয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষুধা, দারিদ্র, নিরক্ষরতা এবং শোষণমুক্ত স্বপ্নের 'সোনার বাংলাদেশ' প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা যে 'ভিশন-২০২১' এবং “ভিশন-২০৪১” বাস্তবায়ন করছি, তার সঙ্গে এগুলোর সম্বনয় করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, শক্তিশালী, ডিজিটাল এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। সেজন্য আমাদের সরকার উদ্ভাবনমূলক সরকারি সেবা বিতরণ, জনসাধারণের তথ্য লাভের অধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনা ও সেবা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
 
জনগণের দোরগোড়ায় ২০০ ধরনের সেবা পৌঁছে দিতে আমরা দেশব্যাপী প্রায় ৮ হাজার ডিজিটাল কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সারাদেশে ১৬ হাজার ৪৩৮টি কমিউনিটি ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মোবাইল ফোন এবং ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমেও এসব সেবা দেওয়া হচ্ছে। আগের তুলনায় আরও অধিক সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ এবং ডিজিটাল ল্যাব ব্যবহৃত হচ্ছে।
 
 
ইত্তেফাক/কেকে