আন্তর্জাতিক বাজারে আকরিক লোহার দরপতন

বাংলাদেশে ইস্পাত শিল্পে প্রভাব পড়বে কি?

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১৩:৫৭
 
ইস্পাত উৎপাদনে সাধারণত কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় আকরিক লোহা। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমশ নিম্নমুখি রয়েছে আকরিক লোহার দর। গত মাসে আকরিক লোহার দর উঠেছিল প্রতিটন ৬১ ডলার ৮০ সেন্ট। এই দরপতন অব্যাহত রয়েছে। গত সপ্তাহ শেষে তা নেমে এসে পৌঁছায় ৫৭ ডলার ৪০ সেন্টে। গত আগস্টে যখন দাম ৬০ ডলার ছাড়িয়েছিল তখনই বাজার বিশ্লেষকরা অনুমান করেছিলেন, দরপতন ঘটতে যাচ্ছে আকরিক লোহার। অবশ্য দর এখনও গত বছরের শেষদিকের তুলনায় বেশি রয়েছে। 
 
ব্লুমবার্গের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী আকরিক লোহার সরবরাহ বেড়েছে। আর সরবরাহ বাড়ার কারণে দর কমতির দিকে। এতে করে আকরিক লোহার শীর্ষ রফতানিকারক দেশ অষ্ট্রেলিয়ায় দাম নিম্নগামী থাকবে বলে জানা গেছে। অষ্ট্রেলিয়া থেকে জুলাইয়ে ৩ কোটি ২৫ লাখ টন এবং আগস্টে ৩ কোটি ৫৪ লাখ টন আকরিক লোহা রফতানি হয়েছে চীনে। রফতানিকারক অন্যতম দেশ ব্রাজিল ও অষ্ট্রেলিয়া থেকে ধাতুটির সরবরাহ খরচ কম হওয়ায় চীনের আমদানি বাড়ছে। যদিও বর্তমানে দেশটিতে আকরিক লোহার চাহিদায় মন্দাভাব বিরাজ করছে। ২০২০ সাল নাগাদ চীনে আকরিক লোহার চাহিদা দাঁড়াবে ১১৫ কোটি টন। সারা বিশ্বে উৎপাদিত আকরিক লোহার এক তৃতীয়াংশই আমদানি করে চীন। বিশ্বের বৃহত্তম ইস্পাত উৎপাদক এই দেশটিতে স্থানীয় চাহিদা বৃদ্ধিতে গত জুনে কারখানাগুলো বেশ ব্যস্ত সময় পার করে। তখন তাদের রফতানিও বৃদ্ধি পায় প্রচুর। বর্তমানে অবশ্য উত্পাদন গত বছরের তুলনায় কম হচ্ছে।
 
তবে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরা বলেছেন, চীনে ইস্পাতের উৎপাদন যা কমেছে তা একেবারে নগণ্য। গত জানুয়ারি-জুলাই মাস সময়ে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। গত ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিটন আকরিক লোহা গড়ে ৮৮ ডলারে বিক্রি হয়েছিল। এ সময়ে ধাতুটির গড় দাম কমেছিল ৪৭ শতাংশ। বাংলাদেশ এক সময় লৌহজাত পণ্য উত্পাদনের একমাত্র প্রতিষ্ঠান ছিল চিটাগাং স্টিল মিল। এটি চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত। ১৯৬৭ সালে এটা স্থাপিত হয়। আকরিক লোহা থেকে এই কারখানায় বিভিন্ন লৌহজাত পণ্য উৎপাদিত হতো। বেশ অনেকদিন আগেই চিটাগাং স্টিল মিলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্টিল মিলটি বন্ধ হয়ে যাবার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য স্টিল এন্ড রিরোলিং মিল চালু হয়েছে। যেখানে রড এবং লৌহজাত নানা পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। এসব স্টিল এন্ড রিরোলিং মিলে কাঁচামাল হিসেবে বিদেশ থেকে কিনে আনা পুরনো জাহাজের অংশ কেটে ব্যবহার করা হয়।
 

 

গত প্রায় দুই দশক সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত স্টিল এন্ড রিরোলিং মিলের প্রধান কাঁচামাল সরবরাহকারী হিসেবে জাহাজ ভাঙা শিল্প দারুণ বিকাশ লাভ করে। এক সময়ে ছোট এবং মাঝারি পুঁজি বিনিয়োগকারী উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে জাহাজ ভাঙা শিল্পে বিনিয়োগ করেছিলেন। তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে পুরনো, অকেজো হয়ে পড়া জাহাজ কিনে এনে তার বিভিন্ন অংশ কেটে রিরোলিং এন্ড স্টিল মিলগুলোর কাঁচামাল হিসেবে সরবরাহ করতেন। তখন দারুণ রমরমা হয়ে উঠলেও পরবর্তী সময়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগকৃত জাহাজ ভাঙা শিল্প বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। তবে বর্তমানে দেশের বড় বড় শিল্প গোষ্ঠী এগিয়ে এসেছে স্টিল শিল্পে বিনিয়োগে। তাদের বৃহত্ বিনিয়োগে জেগে উঠেছে বাংলাদেশের স্টিল শিল্প। এখন আরো নতুন নতুন অনেক উদ্যোক্তার আগমন ঘটছে এই শিল্পে। তবে এখনও সামগ্রিক চাহিদার বিপরীতে লৌহজাত পণ্য উত্পাদন শিল্পে উত্পাদনে ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। অনেক সুউচ্চ ভবন, আবাসিক ফ্ল্যাটসহ বৃহত্ ক্ষুদ্র মাঝারি দৈর্ঘ্যের সেতু, ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজে বিভিন্ন ধরনের লোহা ব্যবহূত হচ্ছে। প্রতিবছর লৌহজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে ১০ শতাংশ হারে। আর লৌহজাত পণ্যের উত্পাদন বাড়ছে ৮ শতাংশ হারে। জাহাজ ভাঙা অংশ স্টিল এন্ড রিরোলিং মিলের প্রধান কাঁচামাল হওয়ায় বেশিরভাগ লৌহজাত পণ্য তৈরির বৃহত্ প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান চট্টগ্রাম এবং এ আশে পাশে। চট্টগ্রামের ভাটিয়ারি, সীতাকুন্ডু, ফৌজদারহাট, বাড়বকুন্ডু এলাকায় জাহাজভাঙার কাজ চলে। সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট স্টিল এন্ড রিরোলিং মিলগুলোতে কাঁচামাল সরবরাহ অনেকটাই সহজ। ইদানিং ঢাকার আশেপাশে কাঁচপুর, সোনারগাঁও শিল্প এলাকায় অনেকগুলো স্টিল এন্ড রিরোলিং মিল গড়ে উঠেছে।

 

আন্তর্জাতিক বাজারে ইস্পাত উত্পাদনে ব্যবহূত কাঁচামাল আকরিক লোহার দাম কমতে থাকায় আমাদের ইস্পাত শিল্পে তার একটা ভালো প্রভাব পড়বে অনুমান করা যায়। কারণ, আমাদের ইস্পাত শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে পুরনো জাহাজের কাটা অংশ ছাড়াও বিদেশ থেকে আমদানিকৃত আকরিক লোহা ব্যবহূত হয়। উত্পাদন ব্যয় কমে এলে স্বাভাবিকভাবে ইস্পাত কারখানায় উত্পাদিত লৌহজাত পণ্য সামগ্রীর বাজার দর হ্রাস পাবে। আগের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে লৌহজাত নির্মাণ সামগ্রী পাওয়া গেলে আবাসনখাতসহ উন্নয়ন অবকাঠামো খাতে আরো গতির সঞ্চার হবে বলে ধারণা করা যায়।