বস্তির কিশোরীরা নিপীড়নের শিকার, নেই স্বাস্থ্যসেবা

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ০০:০৫
মা ইসলামপুর মার্কেটে পানি দেয় আর বাসাবাড়িতে ঠিকা ঝি-এর কাজ করে। বাবা ভ্যানচালায়। তারা থাকে বুড়িগঙ্গা নদীর দক্ষিণ পাড় কদমতলী এলাকায়। বড় মেয়ের দুই বছরের ছোট সে (১৩) একটু পাগলাটে ধরনের, যখন-তখন এদিক ওদিক চলে যায়। প্রতিবেশীর ছোটখাট কাজ করে দেয়। রাস্তার পাশের এক দোকানি রউফ প্রায়ই তাকে লোকচক্ষুর আড়ালে ডাকে। একদিন কলে পানি আনতে গেলে রউফ তাকে জোর করেই শরীরিক নির্যাতন করে। বাড়িতে কাউকে সে একথা বলে না। রাতে তার জ্বর আসে, প্রচণ্ড ব্যথায় ঘুমাতে পারে না।
 
মিরপুর এক নম্বর মাজার এলাকায় বাস করে দশ/এগার বছরের একদল মেয়ে। তারা জানায়, তাদের প্রতিরাতেই এলাকার ছেলে ও বয়স্ক মানুষ জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। একসাথে মাত্রাতিরিক্ত যৌন সম্পর্কের ব্যাপারে একজন জানায়, কষ্টে তখন মরে যেতে ইচ্ছা করে। পুলিশের কাছে গেলে পুলিশ তাদের উল্টো মারে। ফার্মেসিতে ওষুধের জন্য গেলে খারাপ কথা শুনতে হয়।
 
এ গেল বস্তি এলাকার জোরপূর্বক শিশু-কিশোরী ধর্ষণের কথা। আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং শিশু অধিকার ফোরামের মতে, দেশে শিশুর উপর যৌন নিপীড়নের ঘটনা বাড়ছে। তাদের প্রতিবেদন মতে, গত ছয় মাসে দুই শতাধিক শিশু ধর্ষণের ও ২৩ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটির ধারণা প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিস বিভাগের এপ্রিল মাসে শ্যামপুর ও বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় তরুণীদর নিয়ে করা গবেষণায় দেখা যায়, চায়ের দোকান, রিকশার গ্যারেজ প্রভৃতি এলাকায় অবস্থানরত যুবক ও প্রাপ্তবয়স্ক লোক মেয়েদের নির্যাতন করে। গবেষণা দলের সদস্য সহকারী অধ্যাপক মো:মাইনুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, স্কুলে না যাওয়া, খেলার মাঠ না থাকা, অবকাঠামোগত অসুবিধা -যেমন ঘরবাড়ির অবস্থা, রাস্তায় পর্যাপ্ত আলোর অভাব, সরকার এবং এনজিও যারা কাজ করছে তাদের মধ্যে সমন্বয় ও আস্থার অভাব এবং পুলিশের টাকা নিয়ে অপরাধী ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা এমন ঘটনার জন্য দায়ী। এতে স্কুল ও কর্মক্ষেত্রে থেকে ঝরে পড়ছে মেয়েরা বলে তিনি জানান। তার মতে, জেন্ডার বিষয় শিক্ষা, খেলার মাঠ, রাস্তায় পর্যাপ্ত আলো, পুলিশের সহযোগিতা ও বিচ্ছিন্নভাবে হওয়া কাজগুলোর মধ্যে সমন্বয় দরকার।
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-তত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক রাশেদা রওনক খান করাইল বস্তিবাসীর অবস্থা নিয়ে চলতি বছরের শুরু থেকে গবেষণা করছেন। তিনি গবেষণাকালে দেখেন, বস্তি এলাকার বেশিরভাগ বাবা-মা জীবিকার জন্য দিনের বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকেন। সেসময় পরিবারের মেয়ে শিশুরা প্রতিদিন একাধিকবার ধর্ষণের শিকার হয়।
 
সরকারি হিসেব মতে, ৬ লাখ ৭৪ হাজার শিশু রাস্তায় বাস করে , যাদের মধ্যে ঢাকা শহরে আড়াই লাখের বেশি। ৪ লাখের অধিক শিশু গৃহশ্রমিক হিসেবে কর্মরত। এই সকল শিশুরা নানা ভাবে যৌন শোষণের শিকার। তবে শুধু বস্তি এলাকার শিশুরাই যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে না। বাল্যবিয়ের মাধ্যমে প্রতিদিনই জোরপূর্বক ধর্ষণের শিকার হচ্ছে অনেক শিশু। সেই সাথে রয়েছে যৌন ব্যবসার অবতারণা। 
 
এ প্রসঙ্গে ব্র্যাকের হেলথ নিউট্রেশন এন্ড পপুলেশন এর পরিচালক ডা. কাওসার আফসানা ইত্তেফাককে বলেন, দেশের সর্বত্রই কিশোরীদের এই সমস্যা দেখা যায়। তাদের শরীর তৈরি হওয়ার আগে মাত্রাতিরিক্ত যৌন সম্পর্ক স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি। এমনকি জরায়ু ক্যান্সারও হতে পারে। ইনফেকশনসহ অন্যান্য সমস্যাতো আছেই। তিনি প্রত্যেক তরুণীদের জরায়ু ক্যান্সার প্রতিরোধে টিকা অবশ্যই দেওয়ার পরামর্শ দেন। এটি বিনামূল্যে সরকার দিয়ে থাকলেও প্রচারণার অভাবে অনেকেই জানে না। পাশাপাশি শিশুদের যৌন বিষয় শিক্ষা, প্রচারণা, বস্তি এলাকায় কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধিতে সরকার ও এনজিওর সম্মিলিত অংশগ্রহণ জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
 
একশন এইড’র কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীর ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের অনেক চাওয়ার পরে এমন নারী শিশুর সেবার জন্য ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার হয়েছে। শারীরিক সম্পর্ক করলে প্রচণ্ড ব্যথা আর তাতে সাড়া না দিলে প্রতিদিন স্বামীর মার খাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘন। পুলিশের কাছে গেলে হেনস্তার ভয়ে নারীরাই যেতে চান না, কিশোরীরা কিভাবে যাবে।  তিনি এই বিষয়টিতে যেমন সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন, তেমন নির্যাতনের জন্য শাস্তির ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, শিশু অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষায় আইন বাস্তবায়ন জরুরি। সেই সাথে সুবিধা বঞ্চিত এলাকায় বয়ঃসন্ধিকালের স্বাস্থ্যসেবাকে সহজ প্রাপ্য করতে হবে।
 
পুলিশের ভূমিকা প্রসঙ্গে ডিএমপি যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, নির্দিষ্ট করে অভিযোগ করলে পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বাসুদেব গাঙ্গুলি ইত্তেফাককে বলেন, সরকারের স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যেক পর্যায়ে মানুষের জন্য থাকলেও উন্নত দেশের মতো বয়ঃসন্ধিকালের স্বাস্থ্যসেবা আলাদা করে নেই। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর এই বিষয় কাজ করে।
 
মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি ইত্তেফাককে বলেন, কিশোরীদের নিয়ে কেউ কখনো ভাবতেই চাইতো না। তাদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কেউ কখনো খোলা মনে কথাও বলে না। দুটি বিষয় নিয়ে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন।
 
 
ইত্তেফাক/এএন