শহীদ মিনারে মানুষের ঢল। সবাই ভালোবাসা জানাতে এসেছিলেন ফুল হাতে নিয়ে। শোকে ভারী হয়ে উঠেছিল বাংলার আকাশ। শত শত মানুষ দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করে তার কফিনে রেখে গেছেন ফুলের তোড়া। বলেছেন, তোমাকে আমরা ভুলবো না। বলেছেন, এভাবে চলে যেতে নেই সব্যসাচী।
প্রিয় লেখককে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে সকাল থেকেই শহীদ মিনার এলাকায় মানুষের ঢল নামে। এ সময় সৈয়দ হকের বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী এবং গুণমুগ্ধ মানুষ ভিড় করেন শহীদ মিনারে। হাতে হাতে গোলাপ, রজনিগন্ধা। সবাই যেন ফুলে ফুলে ছেয়ে দিনে চান প্রিয় লেখকের কফিন।
সারাজীবন মানুষের জন্যই ছিল তার সকল কাজ। বিরামহীনভাবে যে মানুষটি অকাতরে বিলিয়েছেন ভালোবাসা আজ তিনি নীরব। তার নিথর দেহ শোকে কাতর তুলেছে পুরো দেশকে। বুধবার হাসপাতাল থেকে শহীদ মিনার, শহীদ মিনার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জামে মসজিদ সেখান থেকে কুড়িগ্রাম সবখানে মানুষের ঢল নেমেছিল প্রিয় লেখককে একবার দেখার জন্য। তোমাকে ভালোবাসি - কথাটি একবার বলবার জন্য।
‘মানষ আসতে আছে যমুনার বানের লাহান/ মানষ আসতে আছে মহররমে ধূলার সমান/ মানষ আসতে আছে ছিপ ডিঙা শালতি ভেলায়/ মানষ আসতে আছে লাঠি ভর দিয়া ধুলা পায়/ মানষ আসতে আছে বাচ্চাকাচ্চা -বৌ-বিধবা বইন’/ মানষ আসতে আছে আচানক বড় বেচইন (পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়)
কবির লেখার মতোই শহীদ মিনারে মানুষের ঢল থামছিল না। স্রোতের মতো মানুষ এসেছে শহীদ মিনারে। কবিকে শ্রেষ শ্রদ্ধা জানাতে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের শ্রদ্ধা জানানোর পর মানুষের ঢল নামে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। দেশের অন্যতম প্রধান কবিকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর দৃশ্য সব্যসাচী লেখকের লেখার কথাই মনে করিয়ে দেয়।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সৈয়দ শামসুল হকের শ্রদ্ধানুষ্ঠানের আয়োজন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। তার স্মরণে সেখানে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। খোলা হয় শোক বই। সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে বাদ জোহর তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাকে হেলিকপ্টারে করে তার গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রাম নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।
কুড়িগ্রামে জানাজার আগে কবিপুত্র দ্বিতীয় হক বলেন, জলেশ্বরী আজ তোমার ছেলেকে ফিরিয়ে এনেছে তোমার কাছে। হূদয়ের কাছে, ভালবাসার কাছে। প্রিয় জন্মভূমির কাছে। আমি গর্বিত। বারা প্রতি মানুষের ভালবাসা দেখেও গর্বে বুক ভরে গেছে। অধমার এ মাটিতে শায়িত হতে পেরে খুব খুশি হয়েছেন। কুড়িগ্রামবাসীকে ধন্যবাদ।
এর আগে বেলা সোয়া ১১টায় সৈয়দ হকের মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে আসা হয়। সেখানে ১১টা ২৬ মিনিটে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ কবির কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে সব্যসাচী এ লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তাঁর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদিন, বীর বিক্রম ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব সাজ্জাদ হোসেন ও প্রটোকল অফিসার খোরশেদ আলম। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার এডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া, সাবেক ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলী কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান এ লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বাংলাদেশ সরকারের একাধিক মন্ত্রী এবং সাংসদ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আসেন। আসেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরাও। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি, সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, নারী ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকী, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এডভোকেট সাহারা খাতুন, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এভোকেট শামসুল হক টুকু, সাংসদ অপু উকিল, সনজিদা খাতুন এমপি প্রমুখ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরমধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষে যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের পক্ষেও দীপু মনির নেতৃত্বে অন্যান্য নেতৃবৃন্দ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পক্ষে সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা এমপি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দ, গণতন্ত্রী পার্টি নেতৃবৃন্দও শ্রদ্ধা জানান।
কবির কফিনে আরও শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) পক্ষে প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ, নজরুল ইনস্টিটিউটের পক্ষে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের পক্ষে সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক হারুণ হাবীব, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারোয়ার আলী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, কবি আনিসুল হক, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ ও সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি ড. মুহাম্মদ সামাদ, সাধারণ সম্পাদক কবি তারিক সুজাত, কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, কবি হালিম আজাদ, কবি আসলাম সানী প্রমুখ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ম. হামিদ, গণসঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীর, প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী, সংস্কৃতি সচিব আকতারী মমতাজ, অধ্যাপক আনোয়ার সোসেন, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক বিশ্বজিত্ ঘোষ, অভিনেতা ঠান্ডু রায়হান, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের নেতা আবু ওসমান চৌধুরী, তথ্য সচিব গোলাম মরতুজা আহমদ, মুক্তিযোদ্ধা ফাউন্ডেশনের পক্ষে অধ্যক্ষ কাজী দেলোয়ার হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন গাজী, বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক হারুন-অর-রশিদ, ঢাকা থিয়েটারের পক্ষে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, কবি মোহন রায়হান, শিল্পকলা একাডেমির পক্ষে মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী, জাতীয় জাদুঘরের পক্ষে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান শিল্পী হাশেম খান, কথা সাহিত্যিক রশীদ হায়দার, চলচ্চিত্রকার মোরশেদুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের পক্ষে শিল্পী নিসার হোসেন, আবুল বারক আলভী ও শিশির ভট্টাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মিজানুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, শিল্পী রথীদ্রনাথ রায়, মৃনাল কান্তি রায়, সাংবাদিক আবেদ খান, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী বুলবুল মহলানবীশ, শিল্পী নবীতা ঘোষ, কথা সহিত্যিক অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, কথা সহিত্যিক আবুল হাসনাত, সাংবাদিক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, এ্যাটর্নী জেনারেল এ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, নির্বাহী সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান, বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরির্দশক একেএম শহীদুল হক, জাতীয় প্রেসক্লাবের পক্ষে সভাপতি শফিকুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম চৌধুরী, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির পক্ষে পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পক্ষে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকের, সারা জাকের, আতাউর রহমান, চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামান, দৈনিক ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত প্রমুখ।
বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে), ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি (ঘাদানিক), বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, ঢাকা মহানগর উত্তর ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ, ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী, নৃত্যকলা কেন্দ্র, ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদ, আর টিভি, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, দৈনিক ইত্তেফাক, এফবিসিসিআই, ঢাকা পদাতিক, বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদ, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, জাতীয় কবিতা পরিষদ, স্রোত আবৃত্তি সংসদ, ঢাকা থিয়েটার, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার, আওয়ামী সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ যুবমৈত্রী, বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ, বাংলাদেশ হিন্দু- বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, পূজা উদযাপন কমিটি, কপিরাইট অফিস, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ জাসদ, জয়বাংলা সাংস্কৃতিক ঐক্যজোট, স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদ (স্বাচিব), বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি), জাতীয় যুব দল, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্র, জাতীয় পরিবেশ মানবাধিকার কেন্দ্র, ,বাংলাদেশ স্বেচ্ছাসেবক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ, গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদ, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, আবৃত্তি একাডেমি, উজান, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, বাংলাদেশ যুব মৈত্রী, অঙ্কুর প্রকাশনী, বটতলা নাট্যদল, ১৯৭১ সালে ভারতে ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ, প্রাচ্যনাট, বঙ্গবন্ধু শিক্ষা গবেষণা পরিষদ, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল), খেলাঘর, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড কবির মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
সকালে কবির মরদেহ ইউনাইটেড হাসপাতালের হিমঘর থেকে প্রথমে সকাল ১০টা ১০মিনিটে চ্যানেল আই ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম জানাজায় সৈয়দ শামসুল হকের ছেলে সৈয়দ দ্বিতীয় হক, নায়করাজ রাজ্জাক, চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, চ্যানেল আইয়ের বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ, কবি আসাদ চৌধুরী, নাট্য ব্যক্তিত্ব আবুল হায়াত, নায়ক রাজ্জাকের ছোট ছেলে সম্রাট, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা অংশগ্রহণ করেন। এরপর বাংলা একাডেমির ফেলো সৈয়দ হকের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তাঁর মরদেহ বেলা ১০টা ৪৫ মিনিটে একাডেমির নজরুল মঞ্চে রাখা হয়। বাংলা একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এবং ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে একাডেমির সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বাংলা একাডেমি থেকে সোয়া এগারোটার দিকে তার মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হয়। সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সেখান থেকে দুপুর একটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে দ্বিতীয় জানাজার নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ঢাবি উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। পরে তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে দুপুর ২টায় কবির মরদেহ কুড়িগ্রামে তার গ্রামের বাড়ি জলেশ্বরীতে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশে তেজগাঁও পুরান এয়ারপোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়। তেজগাঁও এয়ারপোর্ট থেকে ২টা ২১ মিনিটে হেলিকপ্টার তার গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওয়া দেয়। কবির মরদেহের সঙ্গে সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানক, জাতীয় কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তারিক সুজাত, কবির সহধর্মিনী সৈয়দা আনোয়ারা হক, পুত্র দ্বিতীয় সৈয়দ হক, মেয়ে ও মেয়ের স্বামীসহ পরিবারের লোকজন যান।
কবি স্মরণে পহেলা অক্টোবর শনিবার বিকেল ৪টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নাগরিক শোকসভার আয়োজন করেছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট।
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণে সব্যসাচী
শ্রদ্ধা জানাতে এসে সবাই স্মরণ করলেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের অবদানকে। ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সৈয়দ শামসুল হক অনেক কিছু করেছেন কিন্তু তিনি সর্বান্তকরণে একজন সাহিত্যিক ছিলেন। সাহিত্যের প্রতি তীব্র অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করেছেন। চূড়ান্ত পর্যায়ের নিবেদন ছিল সাহিত্যের প্রতি। কবিতা, গদ্য, কাব্যনাটক- সব শাখায় ভাষা, নির্মাণশৈলীতে নতুনত্ব এনেছেন। জীবন থেকে অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করে তা সাহিত্যে প্রয়োগ করেছেন। তাঁর মেধা তো অসাধারণ এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন শ্রম। একেবারেই সময় নষ্ট করেননি। লেখার প্রতি এই ভালবাসাই তাকে এই অনন্য উচ্চতায় নিয়ে এসেছে।
অধ্যাপক আহমেদ কবির বলেন, সৃজনশলি সাহিত্যিকদের মধ্যে তাঁর আসন সবার ওপরে। বাংলা সাহিত্যে আধুনিক চর্চার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন।
রামেন্দু মজুমদার বলেন, রবীন্দ্রনাথের পরে বিভিণ্ন ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন সৃষ্টিশীল কাজ সৈয়দ শামসুল হকের মত আর কারো নেই। যেখানে হাত দিয়েছেন সোনা ফলিয়েছেন তিনি। কাব্যনাট্য যে মানুষকে জাগাতে পারে, আন্দোলনে যে প্রেরণা যোগাতে পারে তা সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্যগুলো প্রমান রেখেছে।
নাসিরউদ্দিন ইফসুফ বলেন, তার মৃত্যু সমাপ্তি নয়, যুগ যুগ ধওে তাঁর সৃস্টিসম্ভার আমাদের অনুপ্রাণিত করবে। তিনি রাজনীতির সঙ্গে সাহিত্য সম্পৃক্ত করেছেন। তার উচ্চমার্গীয় সাহিত্য, কবিতা, নাটক আন্দোলনের মঞ্চে উচ্চারিত হয়েছে। ম্লোগানের মত মিছিলে, স্বৈরাচরবিরোধী আন্দোলনে ব্যবহূত হয়েছে। কিন্তু তা শিল্পমানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তিনি লেখায় নতুন নতুন শব্দ যুক্ত করেছেন নতুন নতুন আঙ্গিক সৃষ্টি করেছেন কিন্তু আধুনিক সমসাময়িক বিশ্বসাহিত্য থেকে পিছিয়ে যাননি। লেখায় স্বকীয় চরিত্র নিয়ে সাহিত্যেও প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর অসাধারন বিচরণ। তাঁর লেখার গঠণপ্রক্রিয়া, দৃষ্টিভঙ্গী বৈজ্ঞানিক কিন্তু আবেগবর্জিত নয়।
কবি আবুল হাসনাত বলেন, তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ৩৫ বছরের। সংবাদে সাহিত্য সম্পাদক থাকার সময় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’। এছাড়া ‘হূত্কলমের টানে’ আর ‘কথা সামান্য’ তো অসম্ভব জনপ্রিয় লেখা ছিল। বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ শামসুল হক যে ভাষা নির্মাণ করেছিলেন তাকে অবলম্বন করেই আগামি দিনগুলোতে বাংলা সাহিত্যের ভুবন বিকশিত হবে। এই ভাষা নির্মানে শুধু গদ্যে নয় প্রতিটি শাখায় তিনি সেটা করেছেন। কবিতায়, কাব্যনাট্যেও তিনি নতুন ভাষা দিয়েছেন।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, বিচিত্র প্রতিভার অধিকারী। তিনি নেই এর জন্য শোক করবো। তবে তিনি যা রেখে গেছেন সেই রচনাসম্ভারকে আমার অনুসরণ করবো। তাঁর স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের রচনা সামনে এগিয়ে যাওয়ার পাথেয় হয়ে থাকবে।
কবি মুহাম্মদ সামাদ বলেন, সৃজনশীল সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরে পুরোধা ব্যক্তিত্ব বুদ্ধদেব বসু এবং সৈয়দ শামসুল হক। সাহিত্যের শিক্ষকও বটে। তাকে হারানো মানে জাতির অভিভাবককে হারানো।
কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা বলেন, পরিপূর্ণ মানুষ ছিলেন কবি সৈয়দ শামসুল হক। বাঙালির হাজার বছরের বিবর্তনের ইতিহাস তার কবিতায়, গদ্যে, নাটকের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে।
কবি আনিসুল হক বলেন, তাঁকে আমি শিক্ষক হিসাবে মান্য করি। সৈয়দ হকের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমি লেখক হতে চেয়েছি। সৈয়দ শামসুল হকের লেখা পড়লে সেই মানুষ বদলে যেতে বাধ্য। তার লেখার শক্তি এমনই যা মানুষের মনে শিল্প-সংস্কৃতি ও শুভচেতনা ছড়িয়ে দেয়।
কবি সাজ্জাদ শরিফ বলেন, আমার রেনেসাঁর কথা শুনেছি কিন্তু বাঙালি রেনেসাঁর মানুষ হিসাবে সৈয়দ শামসুল হককে দেখেছি। জেনেছি সেই মানুষরা কেমন হয়। সৃষ্টিশীলতার স্ফূর্তি যে তিনি কুভাব েপ্রকাশ করেছেন। কত নতুন নতুন ফর্ম যে সৃষ্টি করেছেন সৃষ্টির আনন্দে — খুব বিস্ময়ের।
নিজ শহর কুড়িগ্রামেই শায়িত হলেন কবি
সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের শেষ ইচ্ছা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী তাঁর শেষ বিশ্রামের জন্যে শেষ ঠিকানা জন্মস্থান নিজ শহর কুড়িগ্রামেই শায়িত হয়েছেন। জন্মভুমির টানেই কুড়িগ্রামে ফিরে এলেন কবি সৈয়দ শামসুল হক। গতকাল বুধবার শেষ বিকেলে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ লাখো মানুষ তাঁর জানাজায় অংশ নেন। নামাজে জানাজা শেষে কুড়িগ্রাম সরকারী কলেজের প্রধান ফটকের পাশে বিকেল ৫টার দিকে সব্যসাচি লেখক সৈয়দ শামসুল হককে সমাহিত করা হয়। এর আগে বিকাল চারটায় সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নুর, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানক, কবিপত্নি আনোয়ারা সৈয়দ হক, একমাত্র পুত্র দ্বিতীয় সৈয়দ হকসহ নিকট আত্নিয়রা হেলিকপ্টারে করে লাশ নিয়ে কলেজ মাঠে অবতরণ করেন।
এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবি সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃবৃন্দ ও কর্মকর্তাগণ এবং সর্বস্তরের মানুষ কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর মধ্যে ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক মোঃ জাফর আলী, জেলা প্রশাসক খান মোঃ নুরুল আমিন, জেলা ও দায়রা জজ ওএইচএম ইলিয়াস হোসেন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তবারক উল্লাহ, সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আমিনুল ইসলাম মন্ডল, জেলা বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবু বকর সিদ্দিক, জেলা জাসদের ইমদাদুল হক এমদাদ, জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মাহবুবুর রহমান মোবিন, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম টুকু, জেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতি আব্রাহাম লিংকন, প্রেস ক্লাবের সভাপতি মমিনুল ইসলাম মঞ্জু, সম্মিলিত জোটের আহ্বায়ক শ্যামল ভৌমিক, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সাধারন সম্পাদক দুলাল বোস ও সরকারি কলেজের উপাধাক্ষ্য মীর্জা মোঃ নাসির উদ্দিনসহ।