নির্বাচন কমিশন গঠনে বিএনপির সঙ্গে সংলাপ হবে না

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০১৬, ০৮:৩০
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে বিএনপির সঙ্গে সংলাপের সম্ভাবনা কার্যত নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, বিএনপি কী ধরনের নির্বাচন কমিশন চায় সেটা তো স্পষ্ট নয়। তারা কী চায় এমন নির্বাচন কমিশন, যে কমিশন অতীতে তাদের শাসনালের মতো ১ কোটি ৩১ লাখ ভূয়া ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করবে? এতো ভূয়া ভোটার থাকলে তো আর নির্বাচনের দরকার হয় না। এ ধরনের কোনো নির্বাচন কমিশন আর কেউ দেখতে চায় না। বিএনপির পরামর্শ গ্রহণ করলে তো এমন নির্বাচন কমিশন করতে হবে, যারা ভূয়া ভোটার তালিকা তৈরি করবে।
 
গতকাল রবিবার বিকালে গণভবনে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে একটি  বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সিইও’র প্রশ্নের  জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। কানাডায় অনুষ্ঠিত গ্লোবাল ফান্ডের ৫ম রিপ্লেনিশমেন্ট সম্মেলন এবং নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৭১তম সাধারণ অধিবেশনে যোগদান এবং অর্জিত সাফল্যগুলো তুলে ধরতেই এই সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
 
নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় বিএনপি ভূমিকা রাখতে চায় এবং সরকারের সঙ্গে এ ব্যাপারে সংলাপের আগ্রহ প্রকাশ করেছে- এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান জানতে প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বিএনপির আমলে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচনের কথা কী দেশের মানুষ ভুলে গেছে? তখন মাগুরা, মিরপুর ও ঢাকা-১০ এর উপ-নির্বাচনে কোনো ভোটার ভোট কেন্দ্রে যেতে পারেনি। বিএনপি কী সেই ধরনের নির্বাচন কমিশন চায়? আপনারাও (সাংবাদিক) কী সেই ধরনের নির্বাচন কমিশন চান? বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, সেই সময়ে তারা অনেক খারাপ কর্মকান্ড এবং আমাদের জেলে পাঠালে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা তৈরির মতো একটি ভাল কাজ করেছে। এখন কোন ভূয়া ভোটার তালিকায় নেই। এ জন্যই বর্তমান নির্বাচন কমিশন বিএনপির পছন্দ নয়।
 
ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন ও সংঘাতপূর্ণ অবস্থানকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই না এ নিয়ে কোন উত্তেজনা, যুদ্ধ-বিগ্রহ তৈরি হোক। এমন কিছু হলে আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবো। আমাদের উন্নয়নের চলমান অগ্রযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কাজেই এ ধরনের ঘটনা আমাদের কাম্য নয়।  
 
পাকিস্তানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং সার্কের ভবিষ্যত নিয়ে অপর এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, পাকিস্তান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশ নিয়ে নানা কথা বলেছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করেছে। এ কারণে আমরা পাকিস্তানে সার্ক সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের সঙ্গে আরো চারটি দেশ এ সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে। ৭টি দেশের মধ্যে ৪টি দেশ যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সার্ক সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান পরাজিত শক্তি। মহান মুক্তিযুদ্ধে আমরা তাদের পরাজিত করেছি। আর এ কারণেই ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, প্রত্যেক দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকে। মতভেদ ও ঝগড়-ঝাঁটি চললেও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। পরাজিত দেশ অনেক কথাই বলতে পারে। তবে তারা (পাকিস্তান) কী বললো তাতে আমাদের কী আসে যায়? 
 
সার্ক থাকার দরকার আছে কি না এবং পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে বিকল্প কোনো চিন্তা বাংলাদেশের আছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশের এককভাবে বলার কিছুই নেই, বলা উচিতও হবে না। সার্কের চেয়ারপারসন এখন নেপাল। সার্কের ভবিষ্যত কী হবে সেই সিদ্ধান্ত সবাই মিলে নিতে হবে। 
 
আওয়ামী লীগের আসন্ন জাতীয় সম্মেলনে নতুন নেতৃত্ব কেমন হবে, দলে কী ধরনের সংস্কার আনতে চান তা নিয়ে সাংবাদিকের অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দলের কাউন্সিলর ও ডেলিগেটরা যেভাবে চাইবেন, সেভাবেই আগামী নেতৃত্ব আসবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি ৩৫ বছর ধরে দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। আওয়ামী লীগ নতুন নেতা বেছে নিলে এবং আমি অবসরে যাওয়ার সুযোগ পেলে সবচেয়ে বেশি খুঁশি হবো। এ সময় সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, এমপি ও মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীর এমন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সমস্বরে নো নো বলতে থাকেন। এ সময় শেখ হাসিনা বলেন, আমি তো দলেই থাকবো। দল ছেড়ে যাচ্ছি নাতো। যদি নতুন নেতা নির্বাচিত করা হয় তাহলে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হবো। এ কথা শেষ না হতেই নেতৃবৃন্দ আবার না না বলে ধ্বনি দেন। পরে শেখ হাসিনা বলেন, সম্মেলনে কাউন্সিলরদের সঙ্গে কথা বলেই সব কিছু করা হবে।
 
শেখ হাসিনার কম্পিউটার শিক্ষক সজীব ওয়াজেদ জয়
 
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অবদান রাখায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও তার তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের ‘আইসিটি ফর ডেভেলমেন্ট এ্যাওয়ার্ড’ পুরস্কারে ভুষিত হওয়ার প্রসঙ্গ একজন সাংবাদিক তুলে ধরলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সজীব ওয়াজেদ জয় দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছেন। তথ্য প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, আর সে জন্য মা হিসেবে আমি গর্বিত। এ সময় তিনি দেশবাসীর কাছে সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্য দোয়া কামনা করেন। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার ছেলে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জন্মগ্রহণ করে। তখন আমাদের বড় দুখের সময় ছিল। একটি একতলা বাড়িতে আমাদের বন্দি রাখা হয়েছিল, তারই একটি দিনে ওর জন্ম। তারপর আল্লাহ তাকে এতো বড় করেছে। বাংলাদেশকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে এগিতে নিতে পারছে, এটাই অনেক বড় কথা। কম্পিউটার শিক্ষাসহ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ভিশন আমি সজীব ওয়াজেদ জয়ের কাছ থেকেই শিখেছি। বাংলাদেশের তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং বিকাশে জয় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে।  ।
 
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তার ৩৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনে এই প্রথম পাঁচ দিনের ছুটি কাটানোর কথাও সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ৩৫ বছরে এই প্রথম তিনি ব্যক্তিগত ছুটিতে টানা পাঁচ দিন কাটালেন। একই সঙ্গে এবারই তিনি একটানা দুই সপ্তাহের বেশি দেশের বাইরে অবস্থান করলেন।   
 
সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সম্প্রতি কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সফরকে অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের পরামর্শদাতা, মূল পরিকল্পনাকারী, মদদদাতা, পৃষ্ঠপোষক, অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহকারী এবং প্রশিক্ষকদের খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। শেখ হাসিনা বলেন, বক্তৃতায় আমি অভিবাসী ও শরণার্থী ইস্যুটিকে মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখার অনুরোধ করেছি। এছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বজুড়ে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কানাডায় সফলকালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সঙ্গে আমার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে জাস্টিন ট্রুডো বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গীবাদ বিরাধী অবস্থানের প্রশংসা করেন। এ সময় আমি কানাডার প্রধানমন্ত্রীকে জাতির পিতার আত্মস্বীকৃত খুনী নুর চৌধুরীকে যথাশিগগিরই দেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানাই। শেখ হাসিনা বলেন, বৈঠককালে জাস্টিন ট্রুডো ১৫ আগস্টে সংঘটিত মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন এবং নুর চৌধুরীকে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে তিনি সেদেশের কিছু আইনি বাধার কথা তুলে ধরেন। তবে ন্যায়বিচার নিশ্চিতপূর্বক কীভাবে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি সুরাহা করা যায় তার উপায় খুঁজে বের করার জন্য উভয় দেশের উপযুক্ত প্রতিনিধির মধ্যে বিষয়টি আলোচনা শুরু করার পক্ষে তিনি মত দেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে সফরের আমন্ত্রণ জানালে জাস্টিন ট্রুডো তা  সানন্দে গ্রহণ করেন।
 
জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিয়ে দুটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ইউএন-ইউমেন এবার আমাকে ‘প্লানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ এবং গ্লোবাল পার্টনারশীপ ফোরাম আমাকে তাদের ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ এ্যাওয়ার্ড’ পুরস্কারে ভূষিত করেছে। গত ২১ আগস্ট আমি এ দুটি পুরস্কার গ্রহণ করি। নারীর ক্ষমতায়ন এবং তাদের উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করে জাতিগঠনমূলক কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ দুটি পুরস্কার প্রদান করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জনগণকে এই পুরস্কার উত্সর্গ করেন। 
 
সাংবাদিক সম্মেলনে মূল মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন,পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম শাহরিয়ার আলম।
 
 

ইত্তেফাক/এএন