বর্তমানে বিলুপ্তির পথে নওগাঁর ঐতিহাসিক ভবানীপুর জমিদার বাড়ি। প্রকৃতির অনিন্দ্য নিকেতন ভবানীপুর জমিদার বাড়ি অপরুপ সৌন্দর্যে নয়নাভিরাম। তার রুপশোভা বিস্তার করে কালের নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক উজ্জ্বল ভাস্কর্য। সৃষ্টি আর ধ্বংসে এগিয়ে চলছে পৃথিবী। কেউ সৃষ্টিতে আবার কেউ ধ্বংসের খেলায় মত্ত। আবার কারোর দায়িত্বহীনতায় কালের গহব্বরে সমাহিত হচ্ছে ঐতিহাসিক অতীত।
আত্রাই ছোট যমুনা নদীর তীরবর্তী মনোরম পরিবেশের ভবানীপুর জমিদার বাড়িটি এলাকার মানুষের কাছে ভবানীপুর রাজবাড়ি বলেই বেশি পরিচিত। এ জমিদার বাড়িটি নওগাঁ শহর হতে মাত্র ২৪ কিলোমিটার দক্ষিণে আত্রাই উপজেলার এক নং শাহাগোলা ইউনিয়নের ভবানীপুর বাজার সংলগ্নে অবস্থিত। অযত্ন ও অবহেলায় এ জমিদার বাড়িটি কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে।
জমিদার গির্জাশঙ্কর চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার পুত্র প্রিয়শঙ্কর চৌধুরী জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করে জমিদারিত্ব পরিচালনা করতে থাকেন। জমিদার প্রিয়শঙ্কর চৌধুরীর স্ত্রীর নাম ছিল লাবন্য প্রভা চৌধুরানী। তাদের ছিল ছয় ছেলে ও ছয় মেয়ে। জমিদার প্রিয়শঙ্কর চৌধুরীর আমলে জমিদারির ব্যাপক বিস্তারও ঘটে। তিনি ভবানীপুর জমিদার বাড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধি, নাট্যশালা নির্মাণ ও প্রজা সাধারণের সুপেয় পানীয় জলের কষ্ট দূরীকরণের জন্য রাজ প্রাসাদের পার্শ্ববর্তী এলাকায় অনেক পুকুর খনন করেন।
১৯১০ সালে জমিদার পরিবারের উদ্যোগে একটি স্কুল স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে স্কুলটির নাম জমিদার প্রিয়শঙ্কর চৌধুরীর বাবা গির্জাশঙ্কর চৌধুরীর নামকরণে ভবানীপুর জিএস উচ্চ বিদ্যালয় নামকরণ করা হয়। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি হওয়ার পর ১৯৬৮ সালের দিকে জমিদার প্রিয়শঙ্কর চৌধুরী স্ব-পরিবারে কলকাতা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে জমিদারের চতুর্থ পুত্র প্রতাপশঙ্কর চৌধুরী কলকাতা যাওয়ার ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন স্থানীয় অনেকেই। পরে জমিদার প্রিয়শঙ্কর চৌধুরী পুত্রকে রেখেই কলকাতাতে পাড়ি জমান। পরবর্তীতে প্রিয়শঙ্কর চৌধুরী তার স্ত্রী ও এক ছেলে এক মেয়েকে নিয়ে হাতিয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে ২০০৫ সালের ১৪ ফেব্রয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে তার পুত্র অভিজিত্ চৌধুরী এই জমিদার বাড়ির এক প্রাসাদের জরাজীর্ণ ভবনে বসবাস করে আসছেন। কালের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে জমিদারের সুবিশাল অট্টালিকা। জমিদারির আমলে এ রাজবাড়ির মূল ফটকের গেটে ছিল দুইজন নেপালী প্রহরী।
আজও প্রাসাদগুলোর দেয়াল দেখে বোঝা যায় রোমান কায়দায় স্তম্ভগুলো জমিদারদের রুচির পরিচয় বহন করে। জমিদার বাড়িতে সবমিলিয়ে কয়েকটি আঙিনা এবং অসংখ্য ঘর ছিল। প্রাসাদে ছিল জমিদার বাড়ির তিনটি নিজস্ব মন্দির দুর্গা মন্দির, গুপিনাথ মন্দির, বাসন্তি মন্দির। যেখানে পুরো বছরের জন্য একজন স্থায়ী পুরোহিত নিয়োজিত ছিল। সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালানো হতো প্রতি সন্ধ্যায়। শোনা যেতো শঙ্খের ধ্বনি যা কালের বির্বতনে আজ জনমানবহীন শ্মশানে পরিণত হয়েছে। জমিদার বাড়িটিতে এখনো সান বাঁধানো একটি কুয়ার অস্তিত্ব রয়েছে।
ইত্তেফাক/এএন
