আবারো উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে এসিডসন্ত্রাস। গত ৯ মাসে দেশের বিভিন্নস্থানে ৩৬টি এসিড হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে ৪২ জন এসিড দগ্ধ হয়েছেন। এরমধ্যে একজন চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। খোদ রাজধানীতেই ৯ মাসে ১১ জন এসিডদগ্ধ হয়েছেন। আক্রান্ত ব্যক্তির বেশিরভাগই নারী ও শিশু।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসিড অপরাধ দমন আইন ২০০২ এবং এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০২ বলবত্ থাকার পরেও আইন দু’টির কঠোর বাস্তবায়নের অভাবে এসিডসন্ত্রাস রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার মামলার দুর্বল তদন্ত, হামলার শিকার ব্যক্তি, তার পরিবার ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা, রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, সাক্ষীদের সাক্ষ্য প্রদানে ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণেও ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এসিড হামলার শিকার ব্যক্তি। গত ১২ বছরে এসিড হামলা মামলায় ১৪ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত একটি মৃত্যুদণ্ডের রায়ও কার্যকর হয়নি। এসিড ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবহারকারীদের সঠিক তালিকা সংরক্ষণ না থাকায় বাড়ছে এসিডের অপব্যবহার।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড এলাকার একটি বস্তি ঘরে শেলী আক্তার (২২) ও তার মা হোসনে আরা বেগম (৫৫) এসিডদগ্ধ হন। ভোররাতে ঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে শেলীর উপর এসিড ছুঁড়ে মারেন শেলীর প্রাক্তন স্বামী জাহাঙ্গীর। এতে শেলীর মুখসহ শরীরের ১৫ শতাংশ পুড়ে যায় এবং তার মায়ের ১০ শতাংশ পুড়ে যায়। এ ঘটনার পর জাহাঙ্গীরকে আসামি করে মামলা করেন শেলী। গ্রেফতারের পর জাহাঙ্গীর এসিড নিক্ষেপের কথা স্বীকারও করেছে। এ ঘটনার মাত্র দু’দিনের ব্যবধানে স্বামী সুজন মিয়ার সঙ্গে ঢাকা মিরপুর চিড়িয়াখানায় বেড়াতে এসে নাসিমা আক্তার প্রিয়া এসিড দগ্ধ হন। পরে প্রিয়াকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করানো হয়। প্রিয়ার দুই হাত ও মুখমন্ডল পুড়েছে। চিকিত্সকরা জানিয়েছেন প্রিয়ার শরীরের ৭ শতাংশ পুড়েছে। ঘটনা দুটির প্রতিবাদে ও ন্যায়বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। সেখানে নেতারা বলেছেন, বিচারহীনতার কারণেই বাড়ছে এসিড সহিংসতার ঘটনা। তারা আইনে নির্ধারিত ৯০ কার্যদিবসের মধ্যেই বিচার সম্পন্ন করার দাবি জানান।
পুলিশ হেড কোয়ার্টারসের অধীনে গঠিত এসিড অপরাধ দমন মনিটরিং সেলের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০২ থেকে ২০১৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এসিড সহিংসতার ঘটনায় সারা দেশে মামলা হয়েছে ২০১৯টি, অভিযুক্ত ৫৪১৭ জন। এর মধ্যে ৬৫৪ জন (মাত্র ১২ শতাংশ) গ্রেফতার হয়েছে। বাকি ৮৮ শতাংশ অভিযুক্ত পুলিশের ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে। পুলিশ ১২০০টি মামলায় অভিযোগপত্র এবং ৮০১টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘এসিড অপরাধ মনিটরিং সেল’ থেকে জানা যায় একই সময়, ৫৪০টি মামলার রায়ে ১৮০৯ জন অভিযুক্ত খালাস পেয়েছে। ১৮৫টি মামলার রায়ে ৩২৫ জন অভিযুক্ত আসামি সাজাপ্রাপ্ত হয়েছে। সাজার হার ৯ শতাংশ (মোট রুজু মামলা সাপেক্ষে)। মোট রায় হয়েছে ৭২৫টি মামলার। প্রদানকৃত মোট রায় বিবেচনায় সাজা প্রদানকৃত মামলার হার ২৫ শতাংশ। মোট রায় বিবেচনায় অভিযুক্তরা খালাস পেয়েছে ৭৫ শতাংশ মামলায়।
এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ১৯৯৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৩৩০৩টি ঘটনায় ৩৬৬১ জন এসিড আক্রান্ত হয়েছে। তার মধ্যে নারী ১৮৭৩ জন, পুরুষ ৯১০ জন এবং শিশু ৮৭৮ জন।
এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সেলিনা আহমেদ বলেন, আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে বিগত কয়েক মাসে এসিড সহিংসতার পরিমাণ উদ্বেগজনক ভাবে বেড়ছে। বিচারের দীর্ঘসূত্রতাই বিচারহীনতায় পরিণত হচ্ছে। ২০০২ সালে যেখানে সর্বোচ্চ সংখ্যক ৪৯৪টি ঘটনায় ৪৯৬ জন ব্যক্তি এসিড সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন, যা সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কমে আসে। গত বছর ৬৯টি ঘটনায় ৭৪ জন ব্যক্তি এসিড সহিংসতার শিকার হন। যদিও সংখ্যাটা এখনো নিম্নগামী, তারপরও আমরা চাই আর একটি মুখও যেন এসিডে ঝলসে না যায়। তিনি বলেন, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, লাইসেন্স বিহীন এসিডের ব্যবহার, এসিড ব্যবহারে অসচেতনতা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবহেলা এবং প্রশাসনের অসতর্কতার কারণেই বন্ধ করা যাচ্ছে না এসিড সহিংসতা।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি এসিড হামলাকে সন্ত্রাস আখ্যা দিয়ে বলেন, যে কোনো ধরনের সন্ত্রাস যে কোনো সময়ই বাড়তে পারে। কখন কোনটা বাড়বে সেটা বলা যায় না। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের রায় কার্যকরের ব্যাপারে তিনি বলেন, এটা উচ্চ আদালতই বলতে পারবে। ৯০ দিনে বিচার সম্পন্ন হচ্ছে না কেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কেন নির্ধারিত সময়ে বিচার হচ্ছে না এটা আদালতই ভালো বলতে পারবে। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এ ধরনের ঘটনা বাড়ার অন্যতম কারণ। আমরাও আন্তরিকভাবে চাই দেশে এসিডসন্ত্রাস শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে।
