রাজধানীতে একের পর এক অভিযানের মুখে আশপাশেই ঘাঁটি হিসেবে বেছে নেয় জঙ্গিরা। ফলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানের নারায়নগঞ্জ ও গাজীপুরে ১৪ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে। এদিকে গাজীপুরের পাতারটেক এলাকায় অভিযানে নিহতদের মধ্যে নব্য জেএমবির সামরিক কমান্ডার ফরিদুল ইসলাম আকাশের লাশ রয়েছে কিনা তা এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। তবে ওই অভিযানে যে সাত জঙ্গি নিহত হয়েছে ছবি প্রকাশ করে তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে পুলিশ। গতকাল রবিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিএমপি নিউজ ও ফেসবুক পাতায় নিহত সাত জঙ্গির ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। নিহত জঙ্গিদের লাশ গতকাল বিকালে গাজীপুর সদর হাসপাতাল মর্গ থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘রাজধানীর উপকণ্ঠে বর্তমানে জঙ্গিরা অবস্থান করছেন এমন তথ্য আমাদের কাছে থাকায় আমরা এসব অভিযান চালাচ্ছি। এখন থেকে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, ডেমরা, রূপগঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় নিয়মিত ব্লক রেইড চলবে। এসব জায়গায় জঙ্গিদের যেসব আস্তানা আছে তার সবগুলো খুঁজে বের করা হবে।’
গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন, পাতারটেকে নিহত সাত জঙ্গির নাম পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নিহতদের মধ্যে আকাশের লাশ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাত জনের মধ্যে এক জনেরও নাম পরিচয় জানতে পরিনি’। তবে চেষ্টা চলছে। নিহতদের স্বজনরাদের কেউই এখন পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। আমাদের পক্ষ থেকেও যোগাযোগের চেষ্টা করে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত হতে পারিনি।
একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, জেএমবির শীর্ষ নেতা (মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়া) শায়খ আব্দুর রহমান গাজীপুরের পিরুজ আলী মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছে। ফলে এই এলাকায় তার নেটওয়ার্ক খুবই শক্তিশালী ছিল। অনেকদিন পর সেই নেটওয়ার্কই সক্রিয় হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এদিকে ২০১০ সালে উত্তরায় নিজেদের লোকদের হাতে নিহত জেএমবি সদস্য রশিদুলের সঙ্গে আশুলিয়ায় নিহত আব্দুর রহমানের সম্পর্ক ছিল বলে নিশ্চিত হয়েছে র্যাব। আব্দুর রহমানের নির্দেশেই রশিদুলকে হত্যা করা হয়েছে বলে স্বীকার করেছে তার স্ত্রী।
নিহতদের পরিচয় সনাক্ত করতে লাশ ডিএনএ টেস্ট করা হবে কিনা জানতে চাইলে এসপি হারুন অর রশিদ বলেন, স্বজনরা যদি তাদের পরিচয় সনাক্ত না করে তবে অবশ্যই নিহতদের ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। ডিএএনএ পরীক্ষার মাধ্যমেই তাদের পরিচয় সনাক্ত করা হবে। নিহতদের লাশ ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ইতোমধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গে পাঠানো হয়েছে। যদিও গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢামেক মর্গে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাত জঙ্গির লাশ মর্গে পৌছায়নি। তবে মর্গ সূত্র বলেছে, বিকালে গাজীপুর সদর হাসপাতাল থেকে ঢামেকে মর্গের উদ্দ্যেশে রওনা দিয়েছে। গাজীপুরের হাসপাতালে এই সাতজনের লাশ ময়নাতদন্ত করা হয়েছে।
র্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লে. কর্ণেল আবুল কালাম আজাদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘রাজধানীর আশপাশে জঙ্গিদের যেসব আস্তানা রয়েছে সেগুলো খুঁজে বের করার কাজ চলছে। যখনই যে আস্তানার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে সেখানেই অভিযান চালানো হচ্ছে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে র্যাবের এই ধরনের অভিযান অব্যহত থাকবে।’ তিনি বলেন, গাজীপুরের হাড়িনালায় র্যাবের অভিযানে নিহত দুই জঙ্গির আস্তানা থেকে উদ্ধার করা ল্যাপটপে জঙ্গিদের নামের হাল নাগাদ তালিকা ও হামলার ছকসহ জঙ্গি নেটওয়ার্কের বিভিন্ন তথ্য রয়েছে। নব্য জেএমবির অন্যতম অর্থদাতা আবদুর রহমানের আস্তানা থেকেও মিলছে জঙ্গি অর্থায়নের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। খুব শিগগিরই আরও জঙ্গি ও জঙ্গির অর্থদাতারা গোয়েন্দা জালে ধরা পড়বে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন।
পরিচয় সনাক্ত করতে ছবি প্রকাশ :গতকাল ডিএমপি নিউজে বলা হয়, গত ৮ অক্টোবর গাজীপুরের পাতারটেকে পুলিশের সাথে জঙ্গিদের গুলি বিনিময়কালে ৭ জঙ্গি নিহত হয়। জঙ্গি অভিযান ও তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে আমরা দেখেছি যে জঙ্গিরা বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্ন স্থানে একাধিক ভিন্ন ভিন্ন নাম ব্যবহার করে থাকে। তদন্তের স্বার্থে তাদের প্রকৃত পরিচয় জানা জরুরি। যদি কেউ তাদের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে জানেন তাহলে ডিএমপি’র ফেসবুক পেজের ইনবক্স, হ্যালো সিটি অ্যাপস অথবা গাজীপুর জেলা পুলিশকে অবহিত করাতে অনুরোধ করা হলো।
র্যাবের অভিযানে নিহতদের পরিচয় নিয়েও ধোঁয়াশা: গত শনিবার পাতারটেকে গোয়েন্দো পুলিশের অভিযানের সময় র্যাবের অভিযানেও গাজীপুরের হরিলাল পাশ্চিমপাড়ার লেবুবাগান এলাকার অপর একটি বাড়িতে সন্দেহভাজন দুই জঙ্গি এবং টাঙ্গাইল সদরের কাগমারা গ্রামে অপর এক আস্তানায় র্যাবের অভিযানে আরো দুজন নিহত হয়। তাদের লাশও ঢাকা মেডিক্যাল মর্গে পাঠানো হবে। এই চারজনের পরিচয় সম্পর্কে এখনো নিশ্চত নয় র্যাব।
র্যাব সূত্র মতে, একইদিন রাতে ঢাকার উপকণ্ঠ আশুলিয়ার একটি বাড়িতে অভিযানের সময় একটি বাড়ির পাঁচতলা থেকে নিহত হয়েছে অপর এক ব্যক্তি। র্যাব দাবি করছে, নিহত ব্যক্তির নাম আব্দুর রহমান আয়নাল (৩০)। সে নব্য জেএমবির প্রধান অর্থদাতা। অভিযানের সময় আব্দুর রহমানের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে ৩০ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। ওই অভিযানে আব্দুর রহমানের স্ত্রী সন্তানদেরও আটক করা হয়। পরবর্তীতে র্যাব আব্দুর রহমানের স্ত্রী শাহানাজ পারভীন ওরফে রুমিকে আসামি করে এবং গ্রেপ্তার দেখিয়ে আশুলিয়া থানায় একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিয়েছে। র্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রুমা বলেছে, তার স্বামীর মাধ্যমেই জঙ্গিদের কাছে অর্থ যেত। রুমার সঙ্গে তার এক মেয়ে ও দুই ছেলেও রয়েছে র্যাবের হেফাজতে।
শাহনাজ ৮ বছর আগে বাড়ি ছাড়ে : আমাদের পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও) সংবাদদাতা জানান, জেএমবি’র নব্য অর্থ জোগানদাতা নিহত আব্দুর রহমানের স্ত্রী ও জেএমবি’র সক্রিয় সদস্য শাহনাজ পারভীন রুমির সাথে তার বাবার বাড়ির লোকজনের কোন যোগাযোগ নেই আট বছর। গতকাল দুপুরে ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী চন্দরিয়া গ্রামে শাহনাজের বাবা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমানের বাড়িতে গেলে এ তথ্য জানিয়ে তার মা সফুরা বেগম বলেন, প্রায় ৮ বছর আগে শাহনাজ চন্দরিয়া কলেজ থেকে এইচএসপি পাস করে। সে সময় তার বিয়ের প্রস্তাব এলে সে চাকুরীর নাম করে বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় চলে যায়। এর পর ঢাকায় পরিবারের অজান্তে বিয়ে করে। তারপর থেকে তার সাথে কোন যোগাযোগ নেই। মেয়ে গ্রেফতার হয়েছে এবং তার স্বামীর মৃত্যুর খবর রোববার লোকমুখে শুনেছি। কোনদিন জামাইকে তারা দেখেননি বলে জানান। এলাকাবাসী জানায়, সে নিয়মিত নামাজ পড়ত। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির জানান, শাহনাজের পিতা আব্দুর রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধা। তেমন স্বচ্ছল না হলেও এলাকায় ভাল মানুষ হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। তার মেয়ে বাড়ি ছেড়ে গিয়ে এরকম হবে এটা ভাবা যায় না। শাহনাজ এখন র্যাবের হেফাজতে রয়েছে।
র্যাবের দাবি অনুযায়ী, আব্দুর রহমানের বাবার নাম আব্দুল্লাহ। গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরার কুশখালী। সে গ্রামের নিন্ম মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তার দুই স্ত্রীও জেএমবির নারী ইউনিটের সদস্য। দ্বিতিয় স্ত্রীর রুমি ও তিন সন্তানকে নিয়ে সে আশুলিয়ার বাসায় থাকত। প্রথম স্ত্রী এক মেয়েকে ও দ্বিতীয় স্ত্রীর দুই ছেলেকে তার কাছেই রাখত।
তবে আব্দুর রহমান সম্পর্কে জানতে সাতক্ষীরা পুলিশ তৃণমূল পর্যায়ে তদন্ত শুরু করেছে। গত শনিবার রাত থেকে গতকাল পর্যন্ত সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী গ্র্রাম কুশখালিতে গিয়ে পুলিশ বাড়ি বাড়ি খোঁজ নিয়েও আব্দুর রহমান নামে র্যাবের অভিযানে নিহত কাউকে পায়নি। তবে র্যাব তার নাম পরিচয় জানতে পারলেও স্থানীয় থানা পুলিশ এখনও তার সঠিক পরিচয় সম্পর্কে তথ্য পায়নি। সাতক্ষীরা সদর থানার উপপরিদর্শক দেলোয়ার হোসেন জানান, আব্দুর রহমান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া না গেলেও কুশখালির এক ভ্যানচালক পাওয়া গেছে। তার নাম আবদুলাহ। তার ছেলের নাম রাকিবুল ইসলাম (২৪)। আবদুর রহমান নামে তার কোনো ছেলে নেই বলে তিনি জানিয়েছেন। নিজ গ্রামের মক্তবে লেখাপড়া করে ভ্যান চালাতো রাকিবুল। বিএনপি সমর্থক পরিবারটির সদস্য রাকিবুল হেফাজতে ইসলামে যোগ দেয়। সে এলাকায় খানিকটা দুর্ধর্ষ বলে পরিচিত ছিল। তার বিরুদ্ধে গত ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির ঘটনাবলীর পর একাধিক নাশকতার মামলা রয়েছে।
এদিকে ঢাকার রূপনগরে পুলিশের অভিযানে নিহত নব্য জেএমবির সামরিক কমান্ডার সাবেক সেনাকর্মকর্তা জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী জেবুন্নাহারকে খুঁজছে পুলিশ। একমাস আগে আজিমপুরে যে ‘জঙ্গি আস্তানায়’ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়েছিল, সেখানেই অন্য জঙ্গি ও তাদের পরিবারের সঙ্গে দুই সন্তানকে নিয়ে ছিলেন জেবুন্নাহার। তবে অভিযানের চারদিন আগে সেখান থেকে সরে যান বলে পুলিশের ভাষ্য। তাকে পাওয়া গেলে নিষিদ্ধ সংগঠনটির অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলবে বলে ধারণা পুলিশ কর্মকর্তাদের। পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. ছানোয়ার হোসেন বলেন, ‘জেবুন্নাহারকে আমরা খুঁজছি।’
টাঙ্গাইলে দুই জঙ্গি নিহত হওয়ার ঘটনায় মামলা : আমাদের টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইলে র্যাবের অভিযানে দুই জঙ্গি নিহত হওয়ার ঘটনার গত রবিবার মধ্যরাতে সদর থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা হয়েছে। র্যাব-১২ সিপিসি ৩ এর ইন্সপেক্টর মাহবুবুর রহমান বাদি হয়ে দায়ের করা এই মামলায় নিহত দুই জঙ্গিসহ অজ্ঞাতনামা সাতজনকে আসামী করা হয়েছে। এদিকে নিহত দুই জঙ্গির ইতিপূর্বে পাওয়া পরিচয় ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে বলে জানান র্যাব কমান্ডার মহিউদ্দিন ফারুকী। নিহত দুই জঙ্গির লাশ টাঙ্গাইল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে রয়েছে।
পাতারটেকের বাড়ির মালিকের স্ত্রী ও ভাই আটক : আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গাজীপুর শহরের নোয়াগাঁও পাতারটেকের জঙ্গিদের বাসার মালিকের স্ত্রী ও ভাইকে আটক করেছে পুলিশ। রবিবার রাতে জয়দেবপুর ও কালীগঞ্জ থানার পুলিশ এলাকায় যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে। শনিবার সকালে নোয়াগাঁও পাতারটেকের বাড়িটিতে পুলিশের অভিযানের পর তারা কালীগঞ্জে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, আটককৃতরা হলেন বাড়ির মালিক সৌদি প্রবাসী সোলায়মান সরকারের স্ত্রী সালমা বেগম (৩২) ও তার বড় ভাই ওসমান সরকার (৪৮)। ওসমান সরকার জাঙ্গালিয়া গ্রামের আবদুল মজিদ সরকারের ছেলে। তিনি পাতারটেক ওই দোতলা বাড়িটির দেখাশোনা করতেন।
ইত্তেফাক/এএন
