চঞ্চলকে নিয়ে মুগ্ধতার বাজি

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৬, ১১:৫৮
 
সিনেমার ক্রান্তিকাল না ভ্রান্তিকাল চলছে তা বোঝা মুশকিল। কারণ গত দু-বছর ধরেই বলা হচ্ছে সামাজিক গল্পের ছবি নাকি হল পায় না। এর উল্টো পিঠে প্রশ্ন করা যেতেই পারে, তবে কি নাচ-গান, ফাইট, ফ্যান্টাসি নির্ভর ছবিগুলো কি অসামাজিক?
 
আর প্রচলিত কথা-যারা নাটক-বিজ্ঞাপন থেকে এসেছেন তাদের ছবি দেখতে দর্শকরা হলে আসেন না। অথচ কয়েকবছর আগে গিয়াস উদ্দিন সেলিমের ‘মনপুরা’, পরবর্তীতে শিহাব শাহিনের ‘ছুঁয়ে দিলে মন’, এরপর দেশজুড়ে আলোচিত নতুন আরেকটি ছবি দর্শকমন জয় করলো, সেই ছবির নাম ‘আয়নাবাজি’। চলচ্চিত্র নিয়ে সাম্প্রতিক এই তর্কে ‘আয়নাবাজি’র সাফল্য খুব জরুরি ছিল। কারণ ছবি নির্মাণের ইএসপি নির্ধারণে যে নির্মাতা ব্র্যান্ড প্রয়োজন হয় তা থেকে শুরু করে প্রচার যন্ত্র ও ক্যাম্পেইন, ডিস্ট্রিবিউশন ও প্রডিউসার সবদিক থেকেই ছবিটি ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং পরীক্ষিত।
 
ছবিটি রিলিজের আগেই এসব ভিত মজবুত থাকার কারণে ছবিটির প্রতি প্রত্যাশার মাপ আরো চড়া মূল্যের হলো যখন তা অমিতাভ রেজার প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে গণ্য হয়। দর্শক কৌতুহলের এই চাপটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ প্রচারের ঢোলে সাধারণ দর্শকরা হয়তো প্রথম সপ্তাহ অবধি হলে ঢুকবেন। কিন্তু ক্রমশ সিনেমা হল সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ঘটনা, ব্ল্যাকে টিকেট কেনার বিরল দৃশ্যের প্রত্যাবর্তন-এটা সুস্থ ধারার চলচ্চিত্রের অনবদ্য জয়। যেখানে দীর্ঘদিন পর কোনো বাংলাদেশি চলচ্চিত্র পরিবারসহ সিনেমা হলে যাওয়ার উত্সবে অংশ নিলো।
 
চলচ্চিত্রের কোনো ধারা নেই। এটা বিজ্ঞরা বলেই থাকেন। ভালো ছবি আর মন্দ ছবি। কিন্তু এ কথা কি পুরোপুরি সত্য? নিশ্চয়ই না। মালেক আফসারী, এফ আই মানিকের মতো ব্যবসাসফল ফ্যান্টাসি নির্মাতারা যে ভাষায় গল্প দেখান সেখানে আমাদের তারেক মাসুদ, মোরশেদুল  ইসলাম, গিয়াস উদ্দিন সেলিম, তৌকীর আহমেদ, মোস্তফা সারওয়ার ফারুকীরসহ মেধাবী নির্মাতারা তো একটু ভিন্ন ঢঙে তাদের গল্প দেখান। আমাদের সাধারণ দর্শক চোখ তো এই দুটিকে আলাদা করতে পারে অনায়াসেই!
 
এদের পাশাপাশি অমিতাভ রেজা তার প্রথম ছবিতে ‘আয়নাবাজি’র গল্প বলার ঢং তো নতুন এক বাঁক তৈরি করলো। যেখানে ভাষা বিকৃতির কোনো চর্চা নেই। অযথা সুড়সুড়ি দেওয়া ডায়লগ ব্যবহার করেও কলেজ পড়ুয়াদের অন্যভাবে হলে টানতে চাননি নির্মাতা। আছে স্রেফ এক নান্দনিকতার উপাখ্যান। আদি ঢাকা, সদরঘাট, পল্টনসহ আদি ঢাকার রূপরস যে এমন অনবদ্য মুগ্ধতার চোখ দিয়ে দেখা যায়, তা দেখে বলাই যায় বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে তারেক মাসুদের পর নতুন এক দৃশ্যায়ণের কবি এলেন-তার নাম অমিতাভ রেজা।
 
ভাড়াটে কয়েদি নিয়ে সমাজের চোখকে ফাঁকি দিয়ে এক হিপনোটাইজারের গল্প ‘আয়নাবাজি’। যদি কেন্দ্রিয় চরিত্রে রূপদানকারী চঞ্চল চৌধুরীর এই ঢং একটি কোরিয়ান ছবিতে পাওয়া যায়। তবে শুধু এই থিমটুকু নিয়ে নিজের মতো করে চিত্রনাট্য ও দৃশ্যায়ণে নিজের মতো করে সাজিয়েছেন গাউসুল আলম শাওন  ও অমিতাভ রেজা। বাকি সবকিছুই যে তাদের মেধাপ্রসূত! তাই এ নিয়ে নকলবাজির তর্ক খুব বেশিদূর গড়াবে না।
 
আয়নাবাজি একটি আংশিক থ্রিলার, আংশিক প্রেম আর আংশিক পারিবারিক গল্প। ছবির বাকি আলোচনা যদি করতেই হয় তবে তার সবটুকু চঞ্চল চৌধুরীকে নিয়েই লিখতে হবে। কারণ আয়নাবাজিতে চঞ্চল চৌধুরী নতুনভাবে আবিষ্কৃত হয়েছেন। এটি চঞ্চল চৌধুরী, গাউসুল আলম শাওন আর অমিতাভ রেজার দীর্ঘদিনের ভাবনার ফসল।
 
সাদামাটা ছেলের চরিত্রে মাথায় তেল আর সিঁথি দেওয়া গোবেচারা চঞ্চল চৌধুরীর সাবলীল অভিনয় অনেকেই দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু ঘটনাক্রমে বারবার চঞ্চলের যে চরিত্র বদল। বড় বড় দাগী আসামিদের বদলি আসামি হিসেবে যখন মিমিক্রি শুরু করেন আয়না চরিত্রে রূপ দেওয়া এই আন্তর্জাতিকমানের অভিনেতা তখন পর্দায় চোখ ধাঁধিয়ে বলতেই হয়-এই চঞ্চল চৌধুরীর সাথে পরিচয় ছিল না আগে বাঙালি দর্শকদের। আমরা পাশ্চাত্যের আল পাচিনো, মরগ্যান ফ্রিম্যান বা পাশের কলকাতার শ্বাশতের অভিনয় দেখে এমন ভ্রু প্রসারিত করেছি এতোদিন। আজ আয়নাবাজির চঞ্চলকে দেখে বলতেই হয় আমাদেরও আছে এমন এক বাঘা আন্তর্জাতিকমানের শিল্পী!
 
ঠোঁট-চোখ-হাঁটার আদল বা কথা বলার ঢঙে যে একজন মানুষের ভেতরে আরেক মানুষ প্রবেশ করে তা চঞ্চলের অভিনয় না দেখলে বোঝা মুশকিল। কী দারুণ আদল পরিবর্তন। তবে চঞ্চল চৌধুরীর এই আয়নাবাজির  কন্ট্রাক্টর চরিত্রে শাওনের প্রেক্ষাপটটা আরো একটু বিস্তৃত দেখালে ভালো হতো। চিত্রধারণের ক্ষেত্রে অগণিত ড্রোনশটে ঢাকার যে অসাধারণ দৃশ্য দেখানো হয়েছে তাতে সত্যিই চোখ জুড়ায়। পাশাপাশি এই মন জুড়ানো অগণিত ফ্রেম আর ছোটখাটো হিউমার মিশ্রিত সংলাপে পালিয়ে যায় আপাত সাধারণ একটি গল্পের চলন। যে ‘আয়নাবাজি' ছবির গল্পের দুর্বলতা নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় তোলাই যায়। কিন্তু সেই সব ঝড় নিমিষেই থামিয়ে স্তব্ধ করে দিয়েছে অমিতাভের দৃশ্য বর্ণনা আর চঞ্চলের অনবদ্য অভিনয়।
 
তাই অভিনয়ে ছক্কা পেটানো চঞ্চলের পাশাপাশি পার্থ বড়ুয়া তার সাংবাদিক চরিত্রে বেশ সাবলীল ঢঙে চালিয়ে নিতে চাইলেও চঞ্চল চৌধুুরীর মাস্টার স্ট্রোক অভিনয়ের পাশাপাশি কিছুটা ফিকে মনে হয় তাকে মাঝে মাঝে! পার্শ্বচরিত্রগুলো তাই অনেকটাই রিস্কি করে ফেলেছেন চঞ্চল তার অভিনয় জাদু দিয়ে। পাশাপাশি বেশ প্রকটভাবেই বোঝা যায় যে, এটি নাবিলার প্রথম ছবি। যদিও গেটআপ আর অনেকটা সাদামাটা মেকআপে পাশের বাড়ির মেয়েটির স্বরূপ উপস্থাপনাটা দারুণ দেখিয়েছেন নাবিলা। ধন্যবাদ কস্টিউম ডিজাইনার-কোরিওগ্রাফারকে। আর বারবার যিনি প্রশংসার ভেতরে থাকবেন তিনি ছবিটির চিত্রগ্রাহক ও শিল্প নির্দেশক। এমন অগণিত মুগ্ধতার সমন্বয়ের নাম আয়নাবাজি। আর খুব সাবলীল কিছু ডায়লগকে বরিশালের আঞ্চলিকতায় স্ট্যান্ডআপ কমেডি তারকা জামিল হোসেন যেভাবে উপস্থাপন করেছেন তা সত্যিই অবাক করে। এর বাইরে ছোট্ট একটি প্রেমের প্লট তৈরির চেষ্টা করেছেন নির্মাতা। তবে তা খুব প্রচ্ছন্নভাবে চঞ্চল চৌধুরীর খানিক পিছুটান দেখানোর জন্যও হতে পারে।
 
আর আইনের ফাঁক গলে এমন একটি দারুণ অপরাধ চলমান এই শহরে। তা যতটা সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেছে টোটাল টিম। তারা ইঙ্গিতে অনেককিছুই বলার চেষ্টা করেছেন, তা ভাবতে ভাবতে ভুলে যেতে হয়। নাবিলার পরিবারের অসংলগ্ন স্ক্রিপ্ট যেখানে নাবিলা তার বাবাকে নিয়ে কোনো কারণ ছাড়াই বনানী থেকে এসে আদি ঢাকায় নিবাস গড়েন। অথচ স্ক্রীপ্টের এই দুর্বলতা দু-তিনটে সিকোয়েন্স খরচ করে বলে দিলেই পারতেন নির্মাতা।
 
পাশাপাশি হিপনোটাইজার চঞ্চল চৌধুরীর কিছু ছোটখাটো দৃশ্যে চোখে পড়ার মতো ভুলগুলোয় হোঁচট খায় সমালোচক চোখ! অবশ্য তাতে মূল গল্প দেখার মুগ্ধতা মরে না! আর খেলার শেষ ওভারে বারবার বাউন্ডারি-ছক্কা পেটানোর মতো চমক দেখিয়েছেন চঞ্চল চৌধুরী তার রাজনৈতিক নিজাম সাঈদ চৌধুরী চরিত্রে। যেখানে কখনো একজন শঠ রাজনীতিবিদের বলিষ্ঠ ভিলেন, কখনো আবার তারই আয়নাবাজি রূপে ভেঙে পড়া বিভ্রান্ত এক অভিনয়শিল্পী। অন্যদিকে, ছোট্ট জেল সিকিউরিটির চরিত্রে বৃন্দাবন দাস তার কয়েকটি সংলাপেই যেন নিজের জাত চেনালেন!
 
ছবির শেষ ভাগে সেল বিভাগের একটি কক্ষে হঠাত্ নির্মাতা অমিতাভ রেজাকে অভিনেতা রূপে দেখে হলভর্তি কৌতুহলী চোখ মৃদুস্বরে বলে ওঠেন ওই যে অমিতাভকে দেখা যায়। কারণ পুরো আয়নাবাজির এই অসাধারণ গল্প বলার ঢং তো অমিতাভের চোখ দিয়েই সবাই দেখছিলেন। ছবির শেষ দিকে দৃশ্য বর্ণনা অনেক সময়ই বোঝা যায় অধিকাংশ ছবিতে। তাই ইন্ডস্ক্রল ওঠার আগেই দর্শকরা সাধারণত হল ত্যাগের প্রস্তুতি নিয়ে নেন। আয়নাবাজিতে ঘটলো উল্টো। শেষ দিকে অধিকাংশ দর্শকই সিট ছেড়ে উঠেই ছোট ছোট করে বলা গল্পে থেকে গেলেন। আর গানের আলোচনায় বলতে হয় হাবিব-অন্বেষার ‘ধীরে ধীরে যাও না সময়’ এক অনবদ্য নির্মাণ। অনম বিশ্বাসের এই অসাধারণ লিরিক দিয়েই শেষ করি, এমন মুগ্ধতার দৃশ্য-গল্পে সত্যিই সময়টা যেন খুব দ্রুত চলে যায়। এমন নির্মাণ অমিতাভ রেজা অব্যাহত রাখুক এটাই প্রত্যাশা।