টাঙ্গাইলে র্যাবের অভিযানে নিহত দুই জঙ্গির একজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল। তার নাম আহসান হাবিব শুভ (২৪)। সে ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পুলিশ কনস্টেবল আকাশ আলীকে গুলি করে পালানোর চেষ্টাকালে সহযোগী শিবির ক্যাডার হাসান আলীসহ ধরা পড়েছিল। তার লাশ পরিবার নেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। এদিকে গাজীপুর পাতারটেকে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার বেগুনগ্রামের আমিমুল এহসান অপুর লাশ শনাক্ত করেছেন তার ভাই আশিকুর রহমান। তিনি গাজীপুরে গিয়ে অপুর লাশ শনাক্ত করেন। সেই সঙ্গে পুলিশ দিলে অপুর লাশ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তার বাবা আবদুল গাফফার ও বড় ভাই আশিকুর রহমান।
রাজশাহীর গোদাগাড়িতে পুলিশকে গুলি করার ঘটনায় ওই অভিযানের নেতৃত্বে থাকা গোদাগাড়ী থানার তত্কালীন উপ-পরিদর্শক (এসআই) মেহেদি হাসান জানান, ওই দিন বিকেলে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের কশাইপাড়ায় দুইজন কনস্টেবলকে নিয়ে মোটরসাইকেলের কাগজপত্র দেখছিলেন। সন্ধ্যার একটু আগে একটি মোটরসাইকেল রাজশাহীর দিকে যাচ্ছিল। আরোহীদের থামতে সংকেত দেই। কিন্তু তারা সংকেত অমান্য করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় কনস্টেবল আকাশ আলী তাদের মোটরসাইকেলের ওপর থেকেই ধরে ফেলার চেষ্টা করেন। এ সময় চালক আহসান হাবিব শুভ কোমর থেকে পিস্তল বের করে কনস্টেবল আকাশকে লক্ষ্য করে গুলি করে। গুলি কনস্টেবল আকাশ এবং শুভ’র সহযোগী হাসান আলীর পায়ের কিছু অংশ ভেদ করে বেরিয়ে যায়। তখন পেছন থেকে আরেক কনস্টেবল তাকে জাপটে ধরেন। তখন শুভ ও হাসান একটি পিস্তল, ৭ রাউন্ড গুলি ও দুটি ম্যাগাজিনসহ ধরা পড়ে। পরে তাদের জেলে পাঠানো হয়।
নিহত জঙ্গি শুভ নওগাঁর রানীনগর উপজেলার রাজাপুর গ্রামের আলতাফ হোসেন ও আঞ্জুমান আরা বেগমের ছেলে। আর হাসান আলী চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার গোলাপবাজার গ্রামের নাসির উদ্দীনের ছেলে। শুভসহ আরেক জঙ্গি গত শনিবার টাঙ্গাইলের কাগমারা মির্জামাঠ এলাকায় র্যাবের অভিযানে নিহত হয়। দুই জঙ্গি নিহত হওয়ার পর তাদের আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে র্যাব-১২ জানিয়েছিল, তাদের দুজনের বাড়িই রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায়। কিন্তু চারঘাটে তাদের কোনো ঠিকানা পাওয়া যায়নি। পরে র্যাব জানায়, জঙ্গি আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র দুটিই ভুয়া। পরে র্যাব জানতে পারে তাদের আসল ঠিকানা।
জঙ্গি শুভ ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে অস্ত্রসহ আটক হওয়ার সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে স্নাতক তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করতো। আটক হওয়ার পর ২০১৫ সালের মে মাস পর্যন্ত রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী ছিল। কিন্তু জামিনে মুক্তির পর থেকেই সে নিখোঁজ হয়। পরে ২০১৫ সালের ৭ জুলাই তার বাবা আলতাফ হোসেন রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় জিডি (নং-৩৬৫) করেন। এ ব্যাপারে বোয়ালিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহাদত হোসেন খান বলেন, শুভকে খুঁজে পেতে বিভিন্ন স্থানে ছবি পাঠানো হয়েছিল।
রাবির ইংরেজি বিভাগের সভাপতি মাসুদ আখতার বলেন, গণমাধ্যমে শুভর ছবি দেখে তারা নিশ্চিত হয়েছেন, এই শুভই তাদের নিখোঁজ শিক্ষার্থী। অস্ত্রসহ আটক হওয়ার পর শুভ জামিন পেলেও আর ক্যাম্পাসে আসেনি। তার পরিবারের লোকজন অনেক খুঁজেও তাকে পাননি। নওগাঁর রানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শুভর বাবা একজন দলিল লেখক। শুভ নওগাঁ কে.ডি স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও নওগাঁ সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে। এরপর ইংরেজি বিভাগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। রাজশাহী যাওয়ার পরই সে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। তার ব্যাপারে এলাকার কোনো মানুষ কিছু জানেন না।
এদিকে গাজীপুর পাতারটেকে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত আমিমুল এহসান অপুর বাবা আবদুল গাফফার ও বড় ভাই আশিকুর রহমান বলেছেন, যদি প্রশাসন অপুর লাশ পরিবারের নিকট হস্তান্তর করে তাহলে গ্রামের বাড়িতে এনে তাকে দাফন করা হবে।
গত বুধবার সন্ধ্যায় অপুর বড় ভাই আশিকুর রহমানের সাথে কথা হলে তিনি জানান, মঙ্গলবার রাতে প্রথমে জয়পুরহাটের গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তা ইদ্রিস আলী মোবাইল ফোনে তার সাথে যোগাযোগ করে গাজীপুর পাতারটেকে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে আমিমুল এহসান অপুর নিহতের বিষয় নিশ্চিত করেছেন। পরে অপুর লাশ শনাক্তের জন্য তাঁকে (আশিকুর রহমানকে) গাজীপুরের জয়দেবপুর থানায় যেতে বলা হয়েছিল। ডিবি পুলিশের কথামতো ওই রাতেই জয়দেবপুর থানায় গিয়ে সেখান থেকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় অপুর লাশ শনাক্ত করতে পেরেছেন আশিকুর রহমান। তিনি আরও বলেন, পাতারটেকে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত যে সাত জনের ছবি বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছে ওই সাতজনের মধ্যে তার ভাইয়ের ছবি নেই। তবে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে নিহত জঙ্গি তৌহিদুল ইসলাম মারুফ নামে যে লাশটি আছে সেই লাশটি আমিমুল এহসান অপুর লাশ বলে তিনি সহজেই সেটি শনাক্ত করতে পেরেছেন।
অপু তার বড় ভাই আতাউর রহমানের বগুড়াস্থ ভাড়া বাসায় থেকে জলেশ্বরীতলায় কম্পিউটার সাইন্স এন্ড বিজনেস স্টাডিস ইনস্টিটিউশন (সিএসবিএসআই) নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করতো। বাবা আবদুল গাফফার বলেন, তার তিন ছেলে আতাউর রহমান, আশিকুর রহমান ও আমিমুল এহসান অপু। বড় দুই ছেলে বগুড়ায় বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। বড় ছেলের ভাড়া বাসায় থেকে আমিমুল বগুড়াতেই পড়াশুনা করতো। গত বছরের ৪ অক্টোবর বগুড়ায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে নিখোঁজ হয় অপু। সেই থেকে আর অপুর সাথে যোগাযোগ হয়নি আমার পরিবারের। তবে আমিমুল জঙ্গিদের সাথে জড়িয়ে যাওয়ার কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে এটা আমি নিশ্চিত। এ জন্য আমি বাবা হয়ে সকলের কাছে ওর হয়ে ক্ষমা চাইছি।
