বাংলাদেশের উন্নয়নে বিশ্ব ব্যাংকের জোরালো ভূমিকা চাই :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৬, ০১:০৩
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিশ্বে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ আজ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। যে কোনো ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। দেশের জঙ্গিবাদ দমনে আমরা সক্ষম হয়েছি। জঙ্গিবাদের অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ভবিষ্যতে জঙ্গিবাদ দমন কার্যক্রমকে আরো শানিত করা হবে। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট বহুবিধ দুর্যোগ ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অসামান্য সফলতা অর্জন করেছে। আর বিশ্ব ব?্যাংকের মত সংস্থার কাছ থেকে দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অর্জনের ‘প্রশংসা’ লক্ষ?্য অর্জনের চেষ্টাকে আরও বেগবান করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। গতকাল সোমবার বিকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে তিনি এ কথা বলেন। বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
 
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে অংশীদারিত্ব আরো জোরদার করার আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের উন্নয়নে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিদ্যমান অংশীদারিত্ব ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হবে। বিশ্বব্যাংক আমাদের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। আমাদের এই প্রয়াসে বিশ্বব্যাংক আরও জোরালো ভূমিকা রাখবে- এ প্রত্যাশা করছি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ অমিত সম্ভাবনার দেশ। এদেশের মানুষ অত্যন্ত সাহসী, দৃঢ়চেতা এবং পরিশ্রমী। তিনি বলেন, আমরা ইতিমধ্যে মানব-উন্নয়ন সূচকে মধ্যম ক্যাটাগরির দেশ এবং মাথাপিছু আয় বিবেচনায় নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমরা সহসাই স্বল্পোন্নত দেশের ক্যাটাগরি থেকে বেরিয়ে আসব। বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ?্যম আয়ের একটি দেশে পরিণত হবে বলে নিজের বিশ্বাসের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর প্রতিধ্বনী পাওয়া যায় বিশ্ব ব?্যাংক কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
 
শেখ হাসিনা বলেন, এগিয়ে যাওয়ার পথে আমাদের সামনে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমাদের জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাস করছেন। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের জনমিতিক সুবিধার (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) সদ্ব্যবহার করতে হবে। এ লক্ষ্যে আমরা ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বেশ কিছু হাইটেক পার্ক, সফ্টওয়্যার টেকনোলজি পার্ক প্রতিষ্ঠাসহ বেসরকারি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।
 
শেখ হাসিনা বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নির্ধারিত সময় ২০৩০ সালের পূর্বেই এসডিজি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। একটি উচ্চ-পর্যায়ের তদারকি টিম এসডিজি বাস্তবায়ন কার্যক্রম সমন্বয় ও পরিবীক্ষণ করছে। একটি মধ্যম আয়ের দেশের অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে প্রবৃদ্ধি সঞ্চারী কাঠামোগত রূপান্তরের একাধিক বৃহত্ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অপুষ্টিজনিত সমস্যামুক্ত জনগোষ্ঠী জাতীয় উন্নয়নের প্রধান সম্পদ। ১৯৯০ সাল থেকে বাংলাদেশে অপুষ্টিতে ভোগা জনগোষ্ঠীর হার ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেলেও, আর্থ-সামাজিক অন্যান্য ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধিত হয়নি। আমরা বর্তমানে দারিদ্র্যের হার ২২ দশমিক ৪ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। ২০২১ সাল নাগাদ এটি আমরা ৭ শতাংশ বা ৮ শতাংশে নামিয়ে আনতে চাই।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অসমতা দূর করতে সামাজিক নিরাপত্তা, যথোপযুক্ত কর্মসংস্থান এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১০ বছরে জাতীয় আয়ের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বৃদ্ধি পেয়ে ৭ দশমিক ০৫ শতাংশে, মূলত ৭ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে ২০১৬-২০২০ মেয়াদী ৭ম পঞ্চ-বার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছি। আমাদের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ১ হাজার ৪৬৬ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০১৪ সালে ১৪২তম স্থানে উন্নীত হয়েছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে ইতোমধ্যে প্রযুক্তি-নির্ভর আধুনিক রাষ্ট্রের কাতারে সামিল হয়েছে।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাস রিপোর্ট’ অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ১৪৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৬৪তম। অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সংক্রান্ত ৪টি সূচকেই বাংলাদেশের অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব আমাদের দেশের উন্নয়নের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হলেও, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশ এখনও বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। এরফলে, বাংলাদেশ অব্যাহতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা আশা করি, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির বাস্তবায়ন পরিবেশ সংক্রান্ত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে। জলবায়ু পরিবর্তনকে বিবেচনায় নিয়ে আমরা জলবায়ু-সহিষ্ণু অবকাঠামো নির্মাণ ও অন্যান্য উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করছি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ক্ষতি লাঘবে আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠন করেছি।
 
শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন তহবিল, বিশেষ করে ‘গ্রীন ক্লাইমেট ফান্ড’ সৃষ্টি অনেক প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে এ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহ আশানুরূপ অর্থায়ন পায়নি। এ অর্থায়ন প্রক্রিয়া সহজ করার লক্ষ্যে পদ্ধতিগত সংস্কার জরুরি। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে এ সুন্দর পৃথিবীকে দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত করার লক্ষ্যে সকলকে একযোগে কাজ করারও উদাত্ত আহ্বান জানান।
 
দারিদ্র্যবিমোচনে বাংলাদেশের অর্জন
 
চমত্কার: বিশ্ব ব্যাংক প্রেসিডেন্ট
 
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সফররত বিশ্ব ব?্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেন, মাত্র এক বছরের মধ্যে পৃথিবীতে ১০ কোটি মানুষকে অতিদারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জনকে ‘চমত্কার’ হিসেবে বর্ণনা করে কিম বলেন, এই অভিজ্ঞতা অন?্য দেশের মধ্যেও ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে নারী স্বাস্থ?্যকর্মীদের দল গড়ে তুলে বাংলাদেশে ডায়রিয়ার মত রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার কথা স্মরণ করেন কিম, যিনি নিজে একজন প্রশিক্ষিত চিকিত্সক। তিনি বলেন, দারিদ্র্যবিমোচনের জন?্য উদ্ভাবনী ধারণা প্রবর্তন যে জরুরি, তা বাংলাদেশ খুব দ্রুত অনুধাবন করতে পেরেছে। বিশ্ব ব?্যাংক প্রধান বলেন, জনগণের পেছনে বিনিয়োগ করা ঠিক ততটাই জরুরি, যতটা জরুরি অবকাঠামো ক্ষেত্রের বিনিয়োগ। তিনি বলেন, অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সেই বিনিয়োগ সম্ভব হয়েছে।
 
বিশ্ব ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট পল রোমার বলেন, এমনিতে অর্থনীতিতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ‘খুব বেশি জরুরি না হলেও’ বাংলাদেশের মত দেশের পরিস্থিতি তেমন নয়। অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে রোমার শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি মনে করিয়ে দেন, মান বজায় রাখাই আসল। সমাজে সাম?্য প্রতিষ্ঠার মধ?্য দিয়েই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, এর কোনো বিকল্প নেই। বিশ্ব ব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যানেট ডিক্সন শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্যবিমোচনে বাংলাদেশের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ?্য বাস্তবায়নে সাফল্যের কথা অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন।
 
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. মেজবাহ উদ্দীন অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী পরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বৃন্দ, মার্কিন রাষ্ট্রদূত, সংসদ সদস্যবৃন্দ, সরকারি-বেসরকারি এবং বিভিন্ন দাতা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী হাবিব ওয়াহিদ নিজস্ব সুর ও কথায় ‘এন্ড পোভার্টি’ শীর্ষক একটি ভিডিও সংগীত পরিবেশন করেন। রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে এ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে বিশ্ব ব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি তথ?্যচিত্র দেখানো হয়। 
 

ইত্তেফাক/এএন