আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলন

আনন্দমেলার অনন্য ভুবন

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৬, ১৬:৫১
উপমহাদেশের অন্যতম পুরাতন, প্রভাবশালী ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষে চলছে উৎসবের আমেজ। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের উপস্থিতিতে সরগরম থাকছে সমগ্র উদ্যান। সারাদেশের তৃণমূল থেকেও আসবে আওয়ামী লীগের সম্মানিত কাউন্সিলর এবং ডেলিগেটগণ। আয়োজনে যেন কোনো ঘাটতি না থাকে সবার সর্তক দৃষ্টি সেদিকে।
 
সম্মেলনের উৎসবমুখর বিশাল কর্মযজ্ঞে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেও অন্যরকম এক আবেশ তৈরি হয়, মন ভালো হয়ে যায়। মঞ্চ তৈরি কিংবা প্যান্ডেল নির্মাণে হাতুড়ি ঠুকার ধ্বনিও যেন এক অনির্বচনীয় মূর্ছনা তৈরি করে। সন্ধ্যার আঁধার নামতেই উদ্যানে জ্বালানো হয় লাল-নীল মরিচ বাতি। দূর থেকে মনে হয় রঙিন আলোর উৎসব। চোখ ভরে যায় আলোর উৎসবে। এ যেন এক আনন্দমেলার অনন্য ভুবন। 
 
এত আনন্দের কারণও আছে কিছু। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এমন একটি রাজনৈতিক সংগঠন যার অবদান কিংবা ঐতিহ্যের ধারেকাছেও নেই অন্যকোনো রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতার গদিতে বসে জনগণের রায় নিয়ে। আমজনতার পিঠে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে কিংবা রাতের অন্ধকারে গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বসে নাই কখনো। শুধু তাই নয়, সুস্পষ্ট গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় সম্মেলনে মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার নেতা নির্বাচন করে। আর এজন্যই সম্মেলনে নেতাকর্মীদের মধ্যে আনন্দময় পরিবেশ বিরাজ করবে এটাই স্বাভাবিক।
 
বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাস একাত্ম হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ৭ই মার্চের ভাষণ তার জ্বলজ্বলে প্রমাণ। বঙ্গবন্ধু সেই ভাষণে বলেছিলেন, “প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়, প্রত্যেক ইউনিয়নে, প্রত্যেক সাবডিবিশনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল। এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দিবো এ দেশের মানুষকে মুক্ত কওে ছাড়বো, ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” 
 
সুতরাং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বাংলাদেশের নিরীহ জনগণের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল এবং এ দেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজের জীবন দিয়ে যে স্বাধীনতা অর্জন করে তাতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-ই নেতৃত্বদান করে। কেউ যদি ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা করে তাহলে বুঝতে হবে তিনি বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রে বিশ্বাসী নন।
 
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের আগে, সময়ের তাগিদে বঙ্গবন্ধুসহ অনেক নেতাই স্বাধীন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করেছেন। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই বঙ্গবন্ধু যখন বুঝতে পারলেন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী আমাদের সঙ্গে  রাজা-গোলামের সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন তখনই ঐ পাকিস্তানীদের শোষণ ও অন্যায় আচরণ থেকে জনগণকে রক্ষা করে গণমানুষের অধিকার আদায় করতে প্রথমে ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ ও পরে ১৯৪৯ সালে মুসলিম লীগের প্রগতিশীল একটি অংশের উদ্যোগে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠা করেন। যা আজকের দিনের আওয়ামী লীগ নামে পরিচিত।
 
যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শুরু থেকেই সেই আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে আসছে। তাই আজ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাস ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, আওয়ামী লীগের ইতিহাস ৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের ইতিহাস, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলনের ইতিহাস, ৬৬’র ৬ দফা আন্দোলনের ইতিহাস, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস, ৭০’র নির্বাচনের বিপুল ব্যবধানে জয় লাভের ইতিহাস। আর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বদানের পাশাপাশি সক্রিয় অংশগ্রহণ করে অগণিত নেতাকর্মী জীবন দিয়ে এ দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছেন।
 
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালের ১৫আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে যখন বাংলাদেশ লক্ষ্যচ্যুত হয়, এর কয়েক বছর পর ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হয়ে দেশের গরীব-দুঃখী মানুষের ভাগ্য ফেরাতে অশ্রুসজল চোখে দেশে ফিরেন জাতির পিতার সুযোগ্য তনয়া, দেশরত্ন শেখ হাসিনা। ৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, পরবর্তীতে ভাত ও ভোটের আন্দোলন এবং সর্বশেষ ১/১১তে অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে গণমানুষের দল আওয়ামী লীগ। ২০০১-২০০৬ সময়কালে বাংলাদেশ ছিল জঙ্গিদের অভয়ারণ্য কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার জঙ্গি দমন করে সুনাম কুড়িয়েছেন বিশ্বব্যাপী। বিশ্বদরবারে বাঙালি জাতিকে দিচ্ছেন সম্মানের জায়গা। বাংলাদেশে একমাত্র আওয়ামী লীগই হচ্ছে একমাত্র সরকার, যারা সরকার গঠন করলে দেশের গরীব-দুঃখী জনগণ কিছু অন্তত পায়, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
 
তবে আজকের এই আওয়ামী লীগের অবস্থান এক দিনে তৈরি হয়নি। তিলতিল করে গড়ে তোলা হয়েছে। এর জন্য যেমন কষ্ট করেছেন বঙ্গবন্ধু নিজে তেমনি কষ্ট করে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের ৭১তম অধিবেশনে যোগ দিয়ে এসে গণভবনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আমি গত ৩৫ বছরে মাত্র ৫ দিন ছুটি নিয়েছি। তাও সেই ৫ দিনের প্রতিদিনে ২ ঘণ্টা করে অফিসিয়াল কাজ করেছি।” এই হলো দেশের জন্য জননেত্রীর ত্যাগ। তিনি দেশের উন্নয়নের জন্য দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
 
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটিতে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ্য করেছেন, “কোথাও হল বা জায়গা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত হুমায়ুন সাহেবের রোজ গার্ডেনের বাড়িতে সম্মেলনের কাজ শুরু হয়েছিল।” সেই সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু মাত্র ২৯ বছর বয়সে কারান্তরীণ অবস্থায় যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। প্রতিষ্ঠার ৪ বছরের মধ্যেই সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি হন দলের সাধারণ সম্পাদক। এ পদেই কেটে যায় ১৩টি বছর। সংগঠনের প্রতি নিজের মেধা আর শ্রমের সবটুকু ঢেলে দিয়েছেন তিনি। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি থেকে একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। বইটিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, “আমি মনে করেছিলাম, পাকিস্তান হয়ে গেছে। সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নাই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে, যার একটা সুষ্ঠু ম্যানিফেস্টো থাকবে।” এই ছিলো আওয়ামী লীগ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর চিন্তা।
 
আজ প্রতিষ্ঠার প্রায় ৬৭বছর পর বঙ্গবন্ধুর কাজের সঙ্গে তাঁরই কন্যা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার কথার মধ্যে আশ্চর্য মিল দেখা যায়। গত কয়েক দিন আগে বঙ্গবন্ধু কন্যা দলের একটি সভায় এ বলেছেন, “বঙ্গবন্ধু চারা রোপণ করেছিলেন। সেটা মহীরুহ হয়েছে।” যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে, সেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশ। পরপর দুইবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বাংলাদেশকে নিয়ে যাচ্ছেন উন্নয়নের চূড়ান্ত শিখরে। 
 
আওয়ামী লীগ সরকারের গত সাড়ে ৭বছরে যে উন্নয়ন হয়েছে তা শুধু উন্নয়নকর্মীদের জন্য গবেষণার বিষয় হয়নি, বিশ্বনেতাদের কাছেও বাংলাদেশ হয়েছে উন্নয়নের রোলমডেল। বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী দেশগুলোও বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগ সরকারকে সমীহ করে চলছে। ঠিক যেন সুকান্তের কবিতা।
 
এবারের ২০তম জাতীয় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু পরিবারের ৬জন সদস্য কাউন্সিলর হয়েছেন। এই ৬জনকেই অভিনন্দন! বঙ্গবন্ধুর পরিবারের হাত ধরে এগিয়ে যাক বঙ্গবন্ধুর মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত সোনার বাংলাদেশ। পৌঁছে যাক অনন্য উচ্চতায়। উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন সফল ও সার্থক হোক।
 
 
 
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ