ড্রেনে মিলল রাবি শিক্ষার্থীর লাশ

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০১৬, ০৯:৪৭
 
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) আবদুল লতিফ হলের ডাইনিংয়ের পাশের ড্রেন থেকে মোতালেব হোসেন লিপু নামে এক শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য লিপুর রুমমেট মনিরুল ইসলাম, বন্ধু প্রদীপ ও হলের দুই গার্ডসহ চারজনকে আটক করেছে পুলিশ।
 
নিহত লিপু গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি নওয়াব আব্দুল লতিফ হলের ২৫৩ নম্বর রুমের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন। লিপু ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার মকিমপুর গ্রামের বদর উদ্দিনের ছেলে। তিনি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন না বলে জানিয়েছেন হলের বেশ কয়েকজন আবাসিক শিক্ষার্থী।
 
লতিফ হলের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের দিকে ডাইনিংয়ের পাশে এবং হলের ১২৫ নম্বর কক্ষের জানালার পাশে ড্রেনের মধ্যে পড়ে ছিল লিপুর  লাশ। তার পরনে শুধু লুঙ্গি ছিল। এ ছাড়া তার নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল।
 
আবাসিক শিক্ষার্থীরা বলছেন, হলের ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে বা ফেলে দিলে সরু ড্রেনের মধ্যে পড়ার কথা নয়। হল সংলগ্ন পূর্ব দিকের মাঠ বা অন্য কোনো স্থানে তাকে হত্যা করে এখানে ফেলা হতে পারে। আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার জন্য কৌশল হিসেবে ঘাতকরা লাশ ফেলে যেতে পারে।
 
গণিত বিভাগের রাজিবুল ইসলাম নামে হলের ১২৫ নম্বর রুমের আবাসিক এক ছাত্র জানান, ‘আমি রাত আড়াইটা তিনটার দিকে জানালার পাশে জোরে শব্দ শুনি। ভয়ে আর জানালা খুলিনি।’ হলের ডাইনিংয়ের কর্মচারী রিনা আক্তার বলেন, গতকাল সকালে ডাইনিং খোলার পর প্রতিদিনের মতো সবকিছু পরিষ্কার করছিলাম। কিছু ময়লা হলের পিছনে ফেলতে গেলে ওই শিক্ষার্থীর লাশ পড়ে থাকতে দেখি। পরে অন্য কর্মচারীকে বললে তারা সবাই আসে।
 
লিপুর রুমমেট ও এ ঘটনায় আটক উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মনিরুল ইসলাম দাবি করেন, রাত ১০টার দিকে লিপু ভাই মাদার বক্স হলে যায়। আমি ওই সময় তাকে একবার কল দিয়েছিলাম। তিনি পরে রুমে আসবেন বলে আমাকে জানান। পরে রুমে এসে রাত ১২টার দিকে তিনি আমাকে লাইট বন্ধ করতে বলেন। আমি টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে কিছুক্ষণ পড়ার পর ঘুমিয়ে পড়ি। পরে সম্ভবত রাত ৪টার দিকে একবার দরজা খোলার শব্দ শুনি। তখন ভাবলাম তিনি হাঁটতে বের হচ্ছেন। আমি আবার ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে উঠে দেখি তিনি রুমে নাই, পরে আমি ক্লাসে চলে যাই। ক্লাসে থাকা অবস্থায় শুনি তিনি মারা গেছেন। আমি আর কিছু জানি না।
 
লিপুর বিভাগ সূত্রে জানা যায়, কিছুদিন আগে লিপু এক নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির দায়ে আটক হয়ে তিনমাস জেলে ছিলেন। পরে জামিনে মুক্তি পান। এ পরীক্ষা নিয়ে তার সাথে কারো দ্বন্দ্ব থাকতে পারে।
 
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর প্রফেসর ড. মজিবুল হক আজাদ খান বলেন, হলের এক কর্মচারী সকালে ডাইনিংয়ের পাশে লিপুর মরদেহ দেখতে পান। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সদস্য ও পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে।
 
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে আরো জানা যায়, লাশের মাথা বাম দিকে কাত হয়ে ড্রেনের মধ্যে পড়েছিল। তবে ময়নাতদন্ত শেষে বেলা তিনটার দিকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সিনিয়র প্রভাষক ডা. এনামুল হক জানান, লিপুর মাথায় ডান পাশে বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন আছে। যার কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। আর বুকের দু’পাশে দুটো হাড় ভেঙে গেছে। শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
 
রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (পূর্ব) মো. আমীর জাফর বলেন, চিকিত্সকের কাছ থেকে মৌখিকভাবে জানতে পেরেছি তার মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে, হাত ও মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এসব পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে ওই শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত শেষে আসল ঘটনা জানা যাবে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুইজন শিক্ষার্থী ও দুইজন গার্ডকে নিয়ে আসা হয়েছে।
 
নগরীর মতিহার থানার ওসি হুমায়ুন কবীর বলেন, লিপুর চাচা বশীর উদ্দিন বাদী হয়ে থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
 
বিকাল ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে লিপুর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে সন্ধ্যা ৬টার দিকে বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় তার লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান স্বজনরা।
 
লিপুর চাচা বশীর উদ্দিন বলেন, গত মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার জন্য তাকে বাসে তুলে দেই। আর কারো সঙ্গে ঝামেলায় না জড়িয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে বলি। তিনি আরো বলেন, ‘এর আগে পরীক্ষায় ধরা পড়ার পর সে বিভিন্ন ধরনের হুমকি পেয়ে আসছিল।
 
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি প্রদীপ কুমার পাণ্ডে বলেন, পুলিশ ও চিকিত্সকদের মাধ্যমে যতটুকু জেনেছি তাতে হত্যাকাণ্ড ছাড়া অন্যকিছু মনে হয়নি। এভাবে বিভাগে শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ ঘটনা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে লিপু হত্যাকারীদের শাস্তি দাবি করছি। এদিকে এ হত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছে রাবির ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা। তারা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।