ফরমালিনের অপব্যবহারের তথ্য যাচাইয়ে মাঠে নামছে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০১৬, ১৯:৪০
জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ফরমালিনের মূল কাঁচামাল প্যারাফরমালডিহাইডের অপব্যবহার তদন্তে শিগগিরই দেশব্যপী মাঠে নামছে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। প্রাথমিকভাবে প্যারাফরমালডিহাইড আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তদন্ত করা হবে। এ লক্ষ্যে একশ’ প্রতিষ্ঠানের তালিকাও তৈরি করেছে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। এসব প্রতিষ্ঠান হার্ডবোর্ড, পার্টিক্যাল বোর্ড, রং ও কেমিক্যালসহ ও অন্যান্য পণ্য তৈরির জন্য প্যারাফরমালডিহাইড আমদানি করে থাকে। আমদানি করা প্যারাফরমালডিহাইড দিয়ে পণ্য তৈরি করা হয়েছে, না কি তা খোলা বাজারে বিক্রি করা হয়েছে- তদন্ত দল তা চিহ্নিত করবে। তদন্তের জন্য ইতিমধ্যে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগকে অনুমতি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
 
শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে একটি বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বিশাল পরিমাণ প্যারাফরমালডিহাইড অপব্যবহারের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রায় ৬২৮ টন প্যারাফরমালডিহাইড খোলা বাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। এক টন প্যারাফরমালডিহাইড দিয়ে তিন টন পর্যন্ত ফরমালিক উৎপাদন করা যায়। 
 
শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের আশঙ্কা, এসব কাঁচামাল দিয়ে ফরমালিন তৈরি হয়ে থাকলে তা জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির কারণ হবে। দেশে শতাধিক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব কারখানার জন্য প্যারাফরমালডিহাইড আমদানি করে থাকে। আমদানি করা এসব প্যারাফরমালডিহাইডের একটি অংশ যদি ফরমালিন উৎপাদনে ব্যবহার হয়ে থাকে- তা হবে জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকির কারণ। বিষয়টি চিন্তা করে দেশব্যাপী একযোগে ফরমালিনের ব্যবহার সম্পর্কে অভিযান চালানোর জন্য এনবিআরের কাছে অনুমতি চায় শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। সম্প্রতি এনবিআর এ বিষয়ে অনুমতি দেয়। 
 
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান ইত্তেফাককে বলেন, তদন্তের অনুমতির অপেক্ষায় ছিলাম। শিগগিরই তদন্তকাজ শুরু হবে। ইতিমধ্যে আমদানিকারক ও সম্ভাব্য ফরমালিন ব্যবহারকারী শতাধিক প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তদন্ত শেষে কী ধরণের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে- সে বিষয়ে সুপারিশও করা হবে। 
 
তিনি বলেন, আমদানি করা প্যারাফরমালডিহাইড খোলা বাজারে বিক্রির হলে তাতে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জনস্বাস্থ্যের ইস্যুটি। এই কেমিক্যালের সঙ্গে পানি মিশ্রিত করে তিনগুণ ফরমালিনন তৈরি করা সম্ভব। এসব ফরমালিন বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় তা জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। 
অবশ্য আমদানি করা ফরমালিনের কাঁচামাল দিয়ে ঘোষিত পণ্য তৈরি করা হয় নি কিংবা তা খোলা বাজারে বিক্রি করার কাজটি সুচারুরূপে চিহ্নিত করা কষ্টসাধ্য কাজ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে এই ফরমালডিহাইড দিয়ে প্রকৃত অর্থেই ফরমালিন তৈরি হয়েছে কিনা তা বের করার বিষয়টিও সহজ নয় বলেই মনে করা হচ্ছে। এ ধরণের ফাঁকি ধরতে তদন্তকারী দলের কারিগরি কিংবা প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। 
 
তবে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, এটি পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। কোন প্রতিষ্ঠান আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে কী পরিমাণ পণ্য (বোর্ড বা অন্যান্য পন্য) তৈরি করবে তার একটি হিসাব রয়েছে। আমদানি ও তাদের উৎপাদিত পণ্যের পরিমাণ থেকে এ হিসাব বের করা সম্ভব। আবার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য থেকেও এ ধরণের হিসাব বের করা হয়ে থাকে। অতীতে এসব পদ্ধতি ব্যবহার করে একাধিক প্রতিষ্ঠানের ফাঁকি বের করা হয়েছে। 
 
তিনি বলেন, আমাদের নজর থাকবে ফরমালডিহাইডের চূড়ান্ত ব্যবহার কোথায় হয়েছে। অনিয়ম করা এ প্যারাফরমালডিহাইড যদি সমগোত্রীয় পন্য উৎপাদন কিংবা শিল্পে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা বড় উদ্বেগের বিষয় নয়। কিন্তু যদি তা খোলা বাজারে বিক্রি করে ফরমালিন তৈরি করা হয়ে থাকে, তবে তা গুরুতর বিষয়। আমরা দেখব কার কাছে বিক্রি করা হয়েছে। সেটি যদি খাদ্য পণ্য উৎপাদন কিংবা সংরক্ষণে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, সেটিই আশঙ্কার বিষয়। 
 
ফরমালিনের ব্যবহার ও এর ভয়াবহতা নিয়ে দেশব্যাপী মানুষের মধ্যে উদ্বেগ কাজ করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফল, মাছ, তরি-তরকারিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে ফরমালিনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়েছে। ফরমালিনের যথেচ্ছ ব্যবহার ঠেকাতে সরকারও নানামূখী উদ্যোগ নিচ্ছে। তবুও তা কাক্সিক্ষত মাত্রায় কমানো যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 
 
 
 
 
ইত্তেফাক/এমআই