চীনের পণ্য বর্জন করছে ভারতীয়রা

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০১৬, ০৮:৩০
 
সীমান্ত সন্ত্রাসে পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ তুলে ভারতে চীনা পণ্য বয়কটের ডাক উঠেছে। আর এতে সাড়াও পড়েছে। দীপাবলির উত্সবকে কেন্দ্র করে ভারতের বাজারে চীনা পণ্যের বিক্রি কমে গেছে। কনফেডারেশন অব অল ইন্ডিয়া ট্রেডার্স-এর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দীপাবলির বাজারে চীনা পণ্যের কাটতি ৩০ শতাংশ কমতে পারে। ভারতের বাজারে চীনে তৈরি সস্তা পটকা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, খেলনা, ঘড়ি এবং আরো নানা সামগ্রীর বেচাকেনা সারা বছরই চাঙ্গা থাকে। সস্তা হওয়ায় দিল্লিসহ অন্যান্য শহরেও চীনা পণ্যের চাহিদা বাড়তির দিকেই ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বয়কটের রব ওঠায় দিল্লির বাজারে চলতি  মৌসুমে চীনা পণ্যের বিক্রি ২০ শতাংশ কমেছে বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
 
এদিকে ভারতে চীনা দূতাবাস বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, চীনা পণ্য বয়কট করলে ভারতেরই ক্ষতি হবে। কারণ তাতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার সম্পর্ক ধাক্কা খাবে এবং ভারতে চীনা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগও মার খাবে। কিন্তু চীনের বিরাট ক্ষতি হবে না। বিবৃতিতে বলা হয়, চীনের মোট রফতানির মাত্র ২ শতাংশ আসে ভারতের বাজারে। সুতরাং ভারত পণ্য বয়কট করলে চীনের খুব বেশি কিছু যাবে আসবে না বলেও মনে করে চীন।
 
কূটনৈতিকভাবে চীন যেভাবে বারবার পাকিস্তানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, তাতে ক্ষুব্ধ ভারতবাসী। সরকারের তরফে সরাসরি চীনের উদ্দেশে কিছু বলা না হলেও, চীনা দ্রব্য বয়কটের ডাক উঠেছিল সামাজিক গণমাধ্যমে। যোগগুরু রামদেবের মতো ব্যক্তিরাও এই বয়কটের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। রাম দেব বলেছেন, চীন যেভাবে ভারতের একতা ও অখণ্ডতা বিপন্ন করার ঘৃণ্য খেলায় মেতেছে তাতে সব ভারতবাসীর উচিত তাদের জিনিস বর্জন করা। আমাদের ঘরে হনুমানজি-রামচন্দ্র-গণেশজির মূর্তিও এখন চীনে তৈরি হয়ে আসে, দিওয়ালির আলোকসজ্জাও চীনই তৈরি করে। এসব জিনিস কেনা বন্ধ করলে তবেই চীনকে বাগে আনা যাবে।
 
উরি হামলার পর পাক-ভারত উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে। সেই ঘটনার পর চীন পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়ায় ক্ষুব্ধ ভারতবাসী। কাশ্মির ইস্যুতে ভারতের বিপক্ষেও অবস্থান রয়েছে চীনের। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে অর্থনৈতিক করিডোর স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে চীনের। তাছাড়া কাশ্মিরের জঙ্গিদের সন্ত্রাসী ঘোষণা দেওয়ার বিপক্ষেও অবস্থান নিয়েছে চীন। জাতিসংঘ কর্তৃক কশ্মিরের জয়শ-ই-মোহাম্মদ দলটির প্রধান মাসউদ আজহারকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ঘোষণা দেওয়ার চেষ্টায় ভেটো দেয় চীন। ফলে ভারতীয় একাংশের মনে চীন বিরোধী মনোভাব কাজ করছে অনেক আগে থেকেই।
 
সামগ্রিক ঘটনায় চীনা পণ্য বয়কটের সামাজিক আন্দোলনেও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন প্রদেশের ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপসসহ সামাজিক মাধ্যমে চীনা পণ্য বয়কটের ক্যাম্পেইন চলছে। কয়েক মাস আগে ভারতের হিন্দুত্ববাদী সঙ্ঘ পরিবার প্রথম এই চীনা পণ্য বয়কটের ডাক দেয়, আর গত মাসে কাশ্মিরের উরি-তে জঙ্গি হামলার পর এই বয়কটের ডাকে বেশ সাড়া পড়ে। কারণ ভারতীয়দের একাংশ মনে করছেন চীন যেভাবে পাকিস্তানের পাশে দাঁড়িয়েছে তাতে চীনা পণ্য বয়কট করাই তাদের শাস্তি দেওয়ার একমাত্র পথ। ভারত সরকার অবশ্য এই বয়কটের ডাককে প্রকাশ্যে সমর্থন করেনি।
 
তবে বিশ্লেষকরা বিষয়টি দেখছেন ভিন্নভাবে। দক্ষিণ এশিয়ার সবচে বড় বাণিজ্য হয় চীন-ভারতের মাঝে। শত কোটি মানুষের দেশ ভারত চীনের ৯ম বৃহত্ রফতানি বাজারও। চীনা পণ্য বয়কটে সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়াও সম্ভব নয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চীনের সঙ্গে ভারতের প্রায় ৭১ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়েছে। এক্ষেত্রে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতির আকার ছিল ৫২ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার।
 
ভারতে চীনা দূতাবাসের ওই বিবৃতিতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ফলটা আসলে ভুগতে হবে ভারতকেই। এ ভাবে চললে ভারতে চীনের লগ্নি মার খাবে, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতাতেও ধাক্কা লাগবে। সেটা দু’দেশের মানুষের পক্ষে মঙ্গলজনক নয়।
 
চীন-ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রায় ২ হাজার বছরের পুরোন। আধুনিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক– সেটাও শুরু হয়েছে ১৯৫০ সালের দিকে। দুটি দেশই বিশ্বের বৃহত্ জনশক্তি । সেইসঙ্গে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের তালিকায়ও রয়েছে ভারত-চীন। দুদেশের মধ্যে গড়ে ওঠা ‘সিল্ক রুট’ শুধু বাণিজ্য সম্পর্কই নয়, পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গেও যুক্ত করেছে ভারতকে। যে কোনো দেশের পণ্য রফতানির জন্য ভারত একটি আকর্ষণীয় বাজার। বর্তমান সময়ে চীনের সঙ্গে ৫২ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ভারত চীনের বাজারে অশুল্ক বাধা কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চীনা পণ্য বয়কট হলে চীনে ভারতের পণ্য মার খাওয়ারও সম্ভাবনা থেকে যায়। বর্তমানে চীন হতে গৃহস্থালি পণ্য ছাড়া প্রধানত টেলিকম যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, সার, রাসায়নিক, বৈদ্যুতিক পণ্য আমদানি করছে ভারত। অন্যদিকে চীনা বাজারে ভারতের লৌহজাত, স্টিল, টিন, চামড়া, প্লাস্টিক, তুলা রফতানি করা হচ্ছে। বাণিজ্য ঘাটতি কমানোসহ ভারতে অবকাঠামোর উন্নয়নে চীনের বড় বিনিয়োগ আশা করছে ভারত। দীর্ঘমেয়াদে এই বয়কট চীনা বাণিজ্যে প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞরা।